আশ্রয়ণ প্রকল্পে ব্যর্থতা কার

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৫ এএম

গৃহ ও ভূমিহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের অনেক ঘর বিক্রি ও বেদখল হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্প  শুরু হয়েছিল ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন, সেন্ট মার্টিনে।  দুই কানি (৮০ শতক) জমিতে ৫টি লম্বা শেড নির্মাণ করে তাতে পুনর্বাসন করা হয় ৫০টি পরিবারকে। তিনটি টিউবওয়েল আর তিনটি ল্যাট্রিন ছিল সুযোগের সহায়ক। গত ২৮ বছরে, সেই গৃহহীনদের খোঁজ নেয়নি কর্র্তৃপক্ষ। তখন নতুন নতুন আশ্রয়ণ বাড়ি/ঘর নির্মাণ করে গৃহহীনদের মধ্যে দলিল করে দিলেও, তাদের কজন সেখানে বাস করছেন? কিছু প্রাপক ভাড়া দিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। আবার কিছু লোক অসাধুদের চক্করে পড়ে,  বিক্রি করে দিচ্ছেন আশ্রয়ণের সম্বল। চকরিয়া উপজেলার ৮৭৪ ঘরের ৪০ শতাংশ হাতবদল হয়েছে। ২০২৪ সালের ৯ জুন কক্সবাজার জেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত জেলা ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন পর্যন্ত জেলার টেকনাফ, উখিয়া, সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলাতে দুই কক্ষবিশিষ্ট ৪ হাজার ৬৬৪টি পাকা ঘর হস্তান্তরের মাধ্যমে ১ হাজারের বেশি দরিদ্র পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু সেন্ট মার্টিনবাসীর কপালে জোটেনি একটি ঘর। কারণ, ঘর তৈরির জন্য দ্বীপের কোথাও খাসজমি ছিল না। নানা অজুহাতে, দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্পটি সংস্কারও করা হয়নি।           

‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্পের লক্ষ্য ভালো। এতে কোনো সন্দেহ নেই। বিশেষ করে, বাস্তুচ্যুত ও গৃহহীন মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার এই প্রকল্প জনমুখী। কিন্তু প্রকল্প শুরু হলেও, তার দেখভাল করার জন্য স্থানীয় কর্র্তৃপক্ষ মোটেও সচেতনতার পরিচয় দেয়নি। আবার মানুষের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে কী কী পদক্ষেপ নিতে হবে, তা নিয়েও কারও মাথাব্যথা যেন ছিল না। ফলে এটি একটি মুখরোচক প্রকল্প হিসেবে রয়ে গেছে। অথচ খাসজমিতে প্রকল্প প্রতিষ্ঠা এবং বরাদ্দপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের মধ্যে তা দলিল করে দিয়ে ক্ষমতায়নের যে পথটি নির্মিত হয়েছিল, তা এখন মুখ থুবড়ে পড়ার জোগাড়। বিক্রি যারা করেছেন, তারা অন্যত্র জমি ও বাড়ির মালিক হওয়ায় রাজনৈতিক সূত্রে আশ্রয়ণের ঘর-জমি পেয়েছিলেন। তাই তারা সুযোগ বুঝে বিক্রি করেছেন। দেশ রূপান্তর জানাচ্ছে, চকরিয়ার রাজধানীপাড়ার মো. করিম বলেছেন তার অন্যত্র ঘরবাড়ি থাকায় তিনি এটা বিক্রি করেছেন। প্রশ্ন হলো, ভূমিহীন নয় এমন মানুষ কেন ও কীভাবে ঘর পেয়েছিলেন? বিগত ১৬ বছরে আওয়ামী লীগ সরকার যে তাদের লোকদের মধ্যে আশ্রয়ণের ঘর বরাদ্দ দিয়েছিল, তার নতুন করে প্রমাণ দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

২০২৪-এর ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সন্ত্রাসীরা হুমকি দিয়ে বাসিন্দাদের তাড়িয়ে দিয়ে ঘরগুলো গুঁড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের জমির মালিকানা দাবি করে, সেখানে ব্যক্তিমালিকানার সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রকল্পে থাকা অসহায় গৃহহীন পরিবারগুলো আবার ঘরছাড়া হয়ে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী স্থানীয় প্রশাসন। সরকারি জমিতে আশ্রয়ণ হয়েছিল। কিন্তু সেই জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন হয় কীভাবে? আবার যারা এখন ভূমির মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ড টানিয়েছেন, তা কি প্রশাসনের চোখে পড়েনি? গৃহহীনের আশ্রয়কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও, প্রশাসন কোনো ভূমিকা নেয়নি। কেন? তাহলে কি স্থানীয় প্রশাসন এই দখলের সঙ্গে পরোক্ষে ইন্ধনদাতা? সরকার চায়, বাস্তুচ্যুত মানুষদের আশ্রয় দিয়ে সমাজে একটি ন্যায় ও কল্যাণকে প্রতিষ্ঠিত করতে। তৃণমূলের কৃষক সমাজকে, নানারকম কল্যাণকর প্রণোদনা কার্ড দিয়ে সেই সমতার একটি পথ তৈরি হতে যাচ্ছে। আশ্রয়ণ প্রকল্প দারিদ্র্যবিমোচনে ও কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির একটি প্রকল্প। কিন্তু তাকে লালন করতে হলে, সমাজের দুষ্ট রাজনৈতিক মানুষদের লালসা রাজনৈতিকভাবে দমন জরুরি। সরকারকে এটা মনে রাখতে হবে। আর প্রশাসনকে বুঝতে হবে, গরিবদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সামাজিক আন্দোলন আশ্রয়ণ প্রকল্প তা যেন ব্যর্থ না হয় এবং তাকে সম্মানের সঙ্গে টিকিয়ে রাখা আমাদের দায়িত্ব।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত