শুরুতেই হোঁচট খেল ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ

আপডেট : ১২ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১০ এএম

জ্বালানি তেল সরবরাহে কিউআর কোডভিত্তিক ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরুর এক দিনের মাথায় তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে জ্বালানি বিভাগ বলছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্ভারে সক্ষমতার অভাবে সাময়িক জটিলতা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে বিআরটিএর দাবি, সফটওয়্যারটির নিরাপত্তা প্রশ্নে সেবাটি বন্ধ রেখে এটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। সরকারের দুই প্রতিষ্ঠান নিজেদের পক্ষে এমন ভিন্নধর্মী বক্তব্য দিলেও শুরুতেই ডিজিটাল এই পদ্ধতিটি হোঁচট খাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভোগান্তিতে পড়েছেন মোটরসাইকেলচালকরা। তবে দ্রুতই এ সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশজুড়ে জ্বালানি তেল নিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা আর নৈরাজ্য চলছে।  তেল নিতে মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টার পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, স্বচ্ছ ও ফিলিং স্টেশনগুলোতে শৃঙ্খলা আনতে বৃহস্পতিবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় ডিজিটাল সিস্টেমটি চালুর ঘোষণা দেয়।

ওই দিন দুটি ফিলিং স্টেশনে এ পদ্ধতি চালুর ঘোষণার পর গতকাল শনিবার ঢাকার আরও পাঁচটি ফিলিং স্টেশন যুক্ত হয়েছে তালিকায়। আজ রবিবার থেকে মোট সাতটি ফিলিং স্টেশনে ফুয়েল পাস অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ করার কথা রয়েছে। সেই সঙ্গে এই পাম্পগুলোতে অ্যাপ ছাড়া জ্বালানি তেল নিতে পারবেন না মোটরসাইকেলচালকরা সেই ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।

শুক্রবার থেকে ঢাকার তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ও আসাদগেটের সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে অ্যাপের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু হয়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) উদ্যোগে তৈরি এ ব্যবস্থায় ‘কিউআর কোড’ স্ক্যান করে নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি তেল নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

গতকাল শনিবার সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অ্যাপধারীদের জন্য পৃথক লাইন করা হয়েছে, যেখানে একজন মোটরসাইকেলচালক এক হাজার টাকা পর্যন্ত তেল নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। আর যারা অ্যাপ ডাউনলোড বা ফুয়েল পাসের জন্য নিবন্ধন করেননি, তাদের দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল।

তবে গতকাল থেকে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় দেখা যায় জটিলতা। চালকদের কেউই নিবন্ধন করতে পারছিলেন না। ফুয়েল পাসের জন্য নির্ধারিত ওয়েবসাইটটি ছিল অকার্যকর। সকালের দিকে সাইটটিতে প্রবেশ করা গেলেও নিবন্ধন করা যাচ্ছিল না। আর রাত ৯টার দিকে প্রবেশের পর সাইটটিতে একটি নোটিস দেখা যায়। তাতে লেখা জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের কাজ চলায় এটি সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রয়েছে।

সোনার বাংলা ফিলিং স্টেশনে চালকদের সহায়তার জন্য আল্টারিওর ইঞ্জিনিয়ারিং নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছিলেন। অনলাইনে নিবন্ধন করতে না পেরে অনেকেই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা সবাইকে অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন।

পাম্পটিতে তেল নিতে আসা মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা আসফাক-ই-ইলাহি জানান, ‘দুদিন ধরে তেল নিতে না পেরে মোটরসাইকেল বন্ধ হয়ে গেছে। সকালে অনলাইনে গিয়ে নিবন্ধন করার সময় জটিলতার মুখে পড়ি। এখন এখানে এসেও সমাধান হলো না।’

সিস্টেমটি শুরুতেই যদি এভাবে হোঁচট খায়, তাহলে সামনে কী হবে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়ে আরেক মোটরসাইকেলচালক জীবন আহসান বলছিলেন, এমনিতেই তেল নিয়ে ভোগান্তির শেষ নেই। এখন কী আবার নতুন ভোগান্তি পোহাতে হবে? ভালোভাবে যাচাই-বাছাই না করে সরকার কেন এই পদ্ধতি চালু করল?

 স্বেচ্ছাসেবকদের একজন আল্টারিওর ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইউসুফ জানালেন, এই অ্যাপটি বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত। নিবন্ধনকারী যখন তার মোটরসাইকেলের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অন্যান্য তথ্য দেবেন, তখন সেটি সেখানে যাচাই-বাছাই হবে। কিন্তু বিআরটিএর সার্ভার জটিলতার কারণে এখানে সমস্যা হচ্ছে।

 যোগাযোগ করা হলে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের উপসচিব (পরিকল্পনা-২ অধিশাখা ও পরিকল্পনা-৪ শাখা) আছমা আরা বেগম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন এ পদ্ধতিতে খুবই ভালো সাড়া মিলছে। শুক্রবার রাত পর্যন্ত ৫১ হাজার মোটরসাইকেলচালক নিবন্ধন করেছেন। হঠাৎ করে চাপ বেড়ে যাওয়ায় বিআরটিএর সার্ভারের সীমাবদ্ধতার কারণে কিছুটা জটিলতা তৈরি হয়। তা ছাড়া পরীক্ষামূলক এ সিস্টেমটি আরও কতটা ভালো করা যায়, ব্যবহারকারীদের ‘ফিডব্যাক’ কেমন, সে বিষয়গুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সাময়িক নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। আশা করছি, শিগগির সার্ভারের সক্ষমতা বাড়িয়ে এটি কার্যকর করা হবে।’

‘মূলত কী কী সমস্যা হতে পারে, সেটি জানার জন্যই পরীক্ষামূলকভাবে এ সেবা চালু করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মোটরসাইকেলচালকরা এ সুবিধা পাবেন। পর্যায়ক্রমে অন্য যানবাহনের ক্ষেত্রেও পদ্ধতিটি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, ’ যোগ করেন তিনি।

তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মীর আহমেদ তারিকুল ওমর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখানে আমাদের সার্ভার বা সাইটের কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। মূলত এটি চালুর পর এ সিস্টেমের নিরাপত্তাঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি গঠন করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি। তারা এটি পরীক্ষা করার পর ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার পরই আবার সেবাটি উন্মুক্ত হবে। আশা করছি আগামীকাল (আজ) থেকেই মানুষ আবার নিবন্ধন করতে পারবে।

এ বিষয়ে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মহাপরিচালক মো. তৈয়ুবুর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির একজন পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটি একটি সফটওয়্যার। যার মাধ্যমে মানুষ ৫-১০ লিটার তেল নেবে। এটিতে তো ঝুঁকির কিছু থাকার কথা নয়।

জ্বালানি বিভাগ বলছে, ডিজিটাল এ পদ্ধতির মাধ্যমে একজন ব্যক্তি দিনে একাধিকবার তেল নিতে পারবেন না। কারণ প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত কিউআর কোড স্ক্যান করলেই বোঝা যাবে তিনি কবে কতটুকু তেল নিয়েছেন। ফলে ইচ্ছামতো তেল নিয়ে মজুদ করার সুযোগ নেই।

কিন্তু সব পাম্পে এই সিস্টেম চালু না হওয়ায় কেউ ফুয়েল পাসের মাধ্যমে একবার তেল নিয়ে একই দিন অন্য পাম্পে গিয়ে বাড়তি তেল নিলেও সেটি ঠেকানোর আপাতত সুযোগ নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন মনে করেন উদ্যোগটি ভালো। এতে সংকট পুরোপুরি না কাটলেও জ্বালানি তেল সরবরাহে একটা শৃঙ্খলা আসবে এবং তাতে দুর্ভোগ কমবে কিছুটা। তবে সরকার পাম্পগুলোতে যতটুকু তেল দেওয়ার কথা বলছে তা দিচ্ছে কি না, সেই বিষয়টি এখানে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি অ্যাপটি যাতে ‘স্মুথলি’ কাজ করে তা তদারকি করাও গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব পাম্পে অ্যাপে মিলবে জ্বালানি : গতকাল শনিবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ঢাকার আরও পাঁচটি পাম্প আগের তালিকায় যুক্ত করেছে। এগুলো হলোমহাখালীর গুলশান সার্ভিস স্টেশন, শাহবাগের মেঘনা মডেল পাম্প, নিকুঞ্জ এলাকায় নিকুঞ্জ মডেল সার্ভিস সেন্টার, কল্যাণপুরে খালেক সার্ভিস স্টেশন এবং আসাদগেটের তালুকদার ফিলিং স্টেশন।

আজ রবিবার থেকে এসব পাম্পে মোটরসাইকেলচালকরা শুধু ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপের মাধ্যমেই পেট্রোল-অকটেন নিতে পারবেন বলে জানানো হয়েছে।

জ্বালানি বিভাগ জানায়, বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে তেল বিতরণের কারণে ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে। পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও একই ব্যক্তি বারবার লাইনে দাঁড়িয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত জ্বালানি সংগ্রহ করায় অনেক সময় কৃত্রিম সংকট দেখা দেয়। এই ডিজিটাল সিস্টেমটি চালু হলে বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অটোমেশন ও রিয়েল-টাইম মনিটরিংয়ের আওতায় আসবে।

কর্মকর্তারা আশা করছেন, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা বাড়বে, অনিয়ম ও অপচয় কমবে এবং সংকটে কার্যকরভাবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনা করা যাবে।

সেবা মিলবে যেভাবে : নতুন এ সিস্টেমটি বিআরটিএর কেন্দ্রীয় ডেটাবেসের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। ফলে নিবন্ধিত যানবাহনের সঠিক তথ্য যাচাই করে জ্বালানি দেওয়া সম্ভব হবে। ডিজিটাল এ পদ্ধতিতে সেবা পেতে প্রথমে গুগল প্লে স্টোর থেকে ফুয়েল পাস নামের অ্যাপটি মুঠোফোনে ইনস্টল করে নিতে হবে। এর পর অ্যাপে প্রবেশ করে ফোন নম্বর ভেরিফাই করতে হবে। ফুয়েল পাসের জন্য আবেদন করতে গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র, গাড়ির ব্লু-বুক বা স্মাটকার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, সচল ফোন নম্বর এবং পাসপোর্ট সাইজের ছবি। সব শেষ পাসওয়ার্ড দিয়ে রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।

যাদের স্মার্টফোন নেই, তারা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে কিউআর কোডটি প্রিন্ট করে নিতে পারবেন। সব ধরনের বৈধ কাগজপত্রের প্রয়োজন হওয়ায় নিবন্ধনবিহীন কোনো মোটরসাইকেলচালকের জ্বালানি তেল কেনারও সুযোগ থাকবে না।

ফিলিং স্টেশন মালিকরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাদের বরাদ্দ এন্ট্রি দিয়ে ভোক্তাদের কাছে জ্বালানি বিতরণ করতে পারবেন। চালক তার কিউআর কোড স্ক্যান করে নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী জ্বালানি নিতে পারবেন ও নিজের ব্যালেন্স দেখতে পারবেন।

কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সারা দেশে প্রতিদিন কী পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ ও বিতরণ হচ্ছে, তা রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে।

ভারত থেকে ডিজেল আমদানি : ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রেলহেড অয়েল ডিপোতে শুক্রবার মধ্যরাতে আট হাজার টন ডিজেল এসে পৌঁছেছে। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপক কাজী মো. রবিউল আলম জানিয়েছেন, আগামী ১৭ এপ্রিল আরও পাঁচ হাজার টনের একটি চালান আসার কথা রয়েছে। চলতি এপ্রিলে এই পাইপলাইনের মাধ্যমে মোট ৪০ হাজার টন জ্বালানি আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত