আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ঘিরে কোচিং সেন্টার বিতর্ক নতুন নয়। সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষামন্ত্রীর কোচিং সেন্টার ‘শতভাগ বন্ধ’ করার ঘোষণা এই পুরনো বিতর্ককে সামনে নিয়ে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে এই সিদ্ধান্ত কি সত্যিই শিক্ষাব্যবস্থাকে সুস্থ করবে, নাকি এটি মূল সমস্যাকে আড়াল করার একটি পথ? প্রথমেই স্বীকার করতে হবে, কোচিং সেন্টারের অস্বাভাবিক বিস্তার একটি বাস্তব সমস্যা। দেশের শহর থেকে গ্রাম সব জায়গায় ব্যাঙের ছাতার মতো কোচিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে শিক্ষার চেয়ে ফলাফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রবণতা শিক্ষাকে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে রূপান্তর করেছে, যেখানে ‘ভালো নম্বর’ পাওয়াই মূল লক্ষ্য, জ্ঞান অর্জন নয়। প্রশ্ন হলো, কোচিং সংস্কৃতির জন্ম কেন? কোনো সমাজে হঠাৎ করে এমন একটি নির্ভরশীলতা তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে কাঠামোগত সমস্যা। বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষাদানের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। অনেক শিক্ষক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিলেবাস শেষ করতে পারেন না, অনেকে আবার বড় ক্লাস সাইজের কারণে প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি প্রয়োজনীয় মনোযোগ দিতে পারেন না। একজন শিক্ষকের কাছে যখন ৬০-৭০ জন শিক্ষার্থী থাকে, তখন ব্যক্তিগতভাবে দুর্বল শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে শিক্ষার্থীরা বাধ্য হয়ে কোচিং সেন্টারের দিকে ঝুঁকে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা। বাংলাদেশে শিক্ষা অনেকাংশেই ‘পরীক্ষায় ভালো ফল’ নির্ভর। এই কাঠামোয় শিক্ষার্থীরা এমন একটি সহায়ক ব্যবস্থার খোঁজ করে যা তাদের প্রশ্নপত্রের ধরন, সম্ভাব্য প্রশ্ন, শর্টকাট টেকনিক ইত্যাদি শেখায়। কোচিং সেন্টারগুলো ঠিক এই জায়গাটিতেই নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তারা শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় সফল হওয়ার কৌশল শেখায়, যা অনেক সময় স্কুলের পাঠদানে অনুপস্থিত থাকে। ফলে, কোচিং সেন্টার শুধু সমস্যা নয় এটি একটি উপসর্গ। মূল রোগটি লুকিয়ে আছে, শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে।
শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল দুর্বল শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো বর্তমান অবকাঠামো ও জনবল দিয়ে কি এটি সম্ভব? শিক্ষকদের ওপর ইতিমধ্যে রয়েছে প্রশাসনিক চাপ, পরীক্ষার দায়িত্ব, ক্লাস নেওয়ার চাপ। এর মধ্যে আলাদাভাবে প্রতিটি দুর্বল শিক্ষার্থীর জন্য সময় বের করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক শিক্ষকের বিরুদ্ধে স্কুলে পুরোপুরি না পড়িয়ে, কোচিংয়ে বিস্তারিত পড়ানো প্রবণতার অভিযোগ রয়েছে। এই সমস্যাটি কেবল কোচিং বন্ধ করে সমাধান করা যাবে না; বরং এটি একটি নৈতিক ও প্রশাসনিক সংস্কারের বিষয়। ইতিহাস বলছে, কোনো কিছু হঠাৎ করে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হলে তা অনেক সময় আরও অনিয়ন্ত্রিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে। যারা আর্থিকভাবে সক্ষম, তারা ব্যক্তিগত টিউটর রাখবে; আর দুর্বল ও দরিদ্র শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়বে। এখানে সামাজিক বৈষম্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কোচিং সেন্টার অনেক শিক্ষার্থীর জন্য একটি ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরি করে, যেখানে তারা অতিরিক্ত সহায়তা পেতে পারে। যদি এটি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়, তাহলে ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা পাবে, আর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কোচিং সেন্টার বন্ধ করা হবে কি হবে না এই প্রশ্নের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, কীভাবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় যেখানে কোচিংয়ের প্রয়োজনই ধীরে ধীরে কমে আসে। বাস্তবতা হলো, কোনো সমস্যার ‘নিষেধাজ্ঞা’ দিয়ে স্থায়ী সমাধান হয় না; বরং প্রয়োজন হয় কাঠামোগত, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কার। তাই সমাধান হতে হবে বহুস্তরীয়, দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবভিত্তিক। প্রথমত, শ্রেণিকক্ষকেই হতে হবে শিক্ষার মূল কেন্দ্র। আজকের বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থী মনে করে‘স্কুল গেলে কিছুটা বুঝি, কিন্তু কোচিং না করলে পুরোটা আয়ত্ত হয় না।’ এই ধারণাটিই বদলাতে হবে। এ জন্য শিক্ষকদের পাঠদানের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা জরুরি। কেবল বই পড়ে শোনানো নয়, বরং উদাহরণ, আলোচনা, প্রশ্নোত্তর, এমনকি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্লাসকে আকর্ষণীয় করতে হবে। শিক্ষক যদি শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীর কৌতূহল জাগাতে পারেন, তাহলে কোচিংয়ের প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলভিত্তিক সহায়কব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ‘রিমিডিয়াল ক্লাস’ বা অতিরিক্ত সহায়তা সেশন চালু করা যেতে পারে, যেখানে নির্দিষ্টভাবে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে কাজ করা হবে। এতে করে শিক্ষার্থীরা আলাদা করে কোচিং খোঁজার প্রয়োজন অনুভব করবে না। এটি শুধু শিক্ষাগত সহায়তাই দেবে না, বরং শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাসও বাড়াবে। তৃতীয়ত, শিক্ষকদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে কিন্তু সেটি যেন শাস্তিমূলক না হয়ে উন্নয়নমূলক হয়। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, কিছু শিক্ষক কোচিংয়ে বেশি গুরুত্ব দেন, কারণ সেখানে আর্থিক লাভ বেশি। এই প্রবণতা কমাতে হলে শিক্ষকদের বেতন, প্রণোদনা ও কর্মপরিবেশ উন্নত করতে হবে। একইসঙ্গে একটি স্বচ্ছ মনিটরিং সিস্টেম থাকতে হবে, যেখানে দেখা যাবে শিক্ষক ক্লাসে কতটা কার্যকরভাবে পড়াচ্ছেন।
চতুর্থত, পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। যতদিন পর্যন্ত ‘নম্বর’ই সবকিছুর মাপকাঠি থাকবে, ততদিন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা শর্টকাট খুঁজবে আর কোচিং সেই শর্টকাটের একটি বড় মাধ্যম হয়ে থাকবে। তাই মূল্যায়ন পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে যেমন প্রজেক্ট, প্রেজেন্টেশন, ক্লাস পার্টিসিপেশন, ক্রিটিক্যাল থিংকিং ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা মুখস্থের বাইরে গিয়ে বুঝে শেখার দিকে আগ্রহী হবে। পঞ্চমত, কোচিং সেন্টারকে পুরোপুরি বন্ধ না করে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আনা যেতে পারে। সরকার চাইলে লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করতে পারে, যেখানে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ না করলে কোনো কোচিং পরিচালনা করা যাবে না। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ, অতিরিক্ত ফি নিয়ন্ত্রণ, এবং একই শিক্ষক স্কুল ও কোচিংয়ে একই শিক্ষার্থীকে পড়ানোর বিষয়ে নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। এতে করে অনিয়ম কমবে এবং শিক্ষার্থীরা শোষণের শিকার হবে না। ষষ্ঠত, অভিভাবকদের মানসিকতাও পরিবর্তন করা জরুরি। অনেক অভিভাবক মনে করেন, ‘কোচিং না করলে ভালো ফল সম্ভব নয়।’ এই ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে, তার শেখার প্রক্রিয়াকে বোঝা এবং সহযোগিতা করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষাকে একটি প্রতিযোগিতা নয়, বরং একটি বিকাশের যাত্রা হিসেবে দেখতে হবে। কোচিং সেন্টার তখনই কমে যাবে, যখন শিক্ষার্থীরা অনুভব করবে ‘আমার স্কুলই আমার জন্য যথেষ্ট।’ সেই আস্থা তৈরি করাই হওয়া উচিত, মূল লক্ষ্য। নিষেধাজ্ঞা নয়, বিশ্বাস ও মানোন্নয়নই পারে শিক্ষাব্যবস্থাকে সত্যিকারের সুস্থ ও টেকসই পথে নিতে।
লেখক : শিক্ষক ও কলাম লেখক