ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এতটা সহজে শেষ হচ্ছে না। পাকিস্তানে মধ্যস্থতা চেষ্টার একদিন আগেই ব্রিটিশ আর্মির সাবেক কর্মকর্তা রবার্ট ক্যাম্পবেল বলেছিলেন যুদ্ধটা আসলে ‘রিলোডিং’ হচ্ছে। তার কথার প্রমাণও মিলেছে এরই মধ্যে। টানা ২১ ঘণ্টার ব্যর্থ আলোচনা শেষে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বিমানে চড়েছেন দেশে ফেরার জন্য। যাওয়ার আগে তিনি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার কারণ হিসেবে ‘পরমাণু সমৃদ্ধকরণ’ বিষয়টিকে উল্লেখ করেন। অর্থাৎ, পরমাণু প্রশ্নে ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। অবশ্য পাকিস্তানের মধ্যস্থতা নিয়ে আগে থেকেই সংশয় প্রকাশ করেছিল একাধিক পক্ষ। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের মধ্যকার দ্বন্দ্ব মেটাতে যে পরিমাণ কূটনৈতিক সক্ষমতা দরকার, তা ইসলামাবাদের নেই। কারণ, দেশটিকে নিজের পক্ষেই মধ্যস্থতা করতে লবিং নিয়োগ করতে হয়। ফলে ইসলামাবাদের আলোচনা যে ব্যর্থ হতে যাচ্ছে, তা আগেই অনুমেয় ছিল; অন্তত অপ্রত্যাশিত ছিল না।
ইসলামাবাদে এই ব্যর্থতার ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে কয়েকটি অস্বস্তিকর বিকল্প চলে এসেছে। একটি হলো তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনা চালিয়ে যাওয়া। এরই মধ্যে জে ডি ভ্যান্স ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। ব্যর্থ আলোচনার পরও উভয় পক্ষের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে সিএনএন। আরেকটি বিকল্প হলো, যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে ফের যুদ্ধের দামামা বাজানো। যুদ্ধের কারণে এরই মধ্যে বিশ্বে জ্বালানি সংকট শুরু হয়েছে। ফের যুদ্ধ শুরু হলে এই সংকট আরও দীর্ঘ হবে। পাশাপাশি বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি সরবরাহকারী রুট হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চলতে পারে দীর্ঘ যুদ্ধ। হোয়াইট হাউজের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপ ঘোষণা করার ব্যাপারে তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। একই সঙ্গে কূটনৈতিক ‘ব্যাকডোর’ দিয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চলমান থাকতে পারে। তবে যে পথই বেছে নেওয়া হোক না কেন, প্রতিটি পথের সঙ্গে জড়িয়ে আছে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ও রাজনৈতিক ঝুঁকি।
ইসলামাবাদে ২১ ঘণ্টার আলোচনায় কী কী বিষয়ে কথা হয়েছে, সে বিষয়ে ভ্যান্স বেশি কিছু বলেননি। তবে ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ইরানের কাছে একটি ‘টেইক ইট অর লিভ ইট’ ধরনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে চিরতরে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে বাধ্য করা। কিন্তু ইরান সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। ভ্যান্স সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা খুব পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছি আমাদের সীমারেখা কোথায়; কোন বিষয়গুলোতে ছাড় দিতে পারি। তারা আমাদের শর্ত গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ এই দিক থেকে আলোচনাটি ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে জেনেভায় যে অচলাবস্থার মধ্যে শেষ হয়েছিল, তার সঙ্গে খুব একটা ভিন্ন নয়। গত এক মাস ধরে ট্রাম্প বারবার একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। আর সেটি ছিল; যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির বিশাল প্রদর্শন দেখলে ইরান শেষ পর্যন্ত তাদের অবস্থান পরিবর্তন করবে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, এই অভিযানে ১৩ হাজারেরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
কিন্তু ইরানিদের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা হলো যুক্তরাষ্ট্র যত অস্ত্রই ব্যবহার করুক না কেন, তারা তাদের অবস্থান থেকে সরে আসবে না। ইসলামাবাদে সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেও সেই দৃঢ়তা ফুটে ওঠে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন ইরান যুদ্ধকে ভয় পায় না। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘আমাদের প্রিয় প্রবীণ, স্বজন এবং নাগরিকদের বড় ধরনের ক্ষতি আমাদের প্রতিক্রিয়াকে আরও দৃঢ় করেছে। ইরানি জাতির স্বার্থ ও অধিকার রক্ষার বিষয়ে আমরা আগের চেয়ে আরও অটল। তবে হ্যাঁ, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বদলাতে পারে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ইরানের সঙ্গে জটিল ও দীর্ঘ আলোচনায় জড়িয়ে পড়ার ভয় কাজ করছে। ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, তিনি এই সংঘাতে বিজয়ী হয়ে বেরিয়ে এসেছেন। তাই তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের ভাষায় ইরানের উচিত সরাসরি ‘আত্মসমর্পণ’ করা।
কিন্তু অতীতে ঘটনাপ্রবাহ এমন ছিল না। তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শেষ বড় চুক্তিটি হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়। ওই চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে দুই বছর সময় লেগেছিল। সেই চুক্তিতে একাধিক সমঝোতা ছিল। যেমন ইরানকে সীমিত পরিমাণ পারমাণবিক মজুদ রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ধীরে ধীরে তাদের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০৩০ সালের পর ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি অনুযায়ী অনুমোদিত যেকোনো পারমাণবিক কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। জে ডি ভ্যান্স যে অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছেন, সেটি মূলত ফেব্রুয়ারির শেষের আলোচনায় দেখা একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি। ওই আলোচনা শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে ইরানে হামলার নির্দেশ দিতে প্ররোচিত করেছিল। সেই সময় ইরান প্রস্তাব দিয়েছিল যে, তারা কয়েক বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিত রাখতে পারে। কিন্তু তারা তাদের প্রায় বোমা মানের ইউরেনিয়ামের মজুদ ত্যাগ করবে না বা নিজেদের ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষমতা স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেবে না। ইরানের দৃষ্টিতে, এটি তাদের বৈধ অধিকার। কারণ, তারা পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির স্বাক্ষরকারী দেশ, যেখানে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, এটি একটি স্পষ্ট সংকেত। স্টিভ উইটকফের ভাষ্য ইরান সব সময় পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির একটি সম্ভাব্য বিকল্প খোলা রাখতে চায়, যদিও তারা বাস্তবে সেই বিকল্প ব্যবহার নাও করতে পারে।
বর্তমানে ট্রাম্পের প্রধান চাপের হাতিয়ার হলো; আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করার হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা। কারণ, দুই সপ্তাহের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি শেষ হবে ২১ এপ্রিল। তবে যুদ্ধ পুনরায় শুরু করার হুমকি দিলেও এটি ট্রাম্পের জন্য খুব কার্যকর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়। গত সপ্তাহে ট্রাম্প মূলত যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিলেন বিশ্বের তেলের ২০ শতাংশ সরবরাহ হারানোর ফলে সৃষ্ট চাপ কমানোর জন্য। এই পরিস্থিতি গ্যাসোলিনের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিচ্ছিল এবং সার, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় হিলিয়ামসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি করছিল। সম্ভাব্য কোনো চুক্তির আশা দেখা দেওয়ায় বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। কিন্তু আবার যুদ্ধ শুরু হলে বাজার সম্ভবত পড়ে যাবে, ঘাটতি আরও বাড়বে এবং এরই মধ্যে ৩ দশমিক ৩ শতাংশে পৌঁছে যাওয়া মূল্যস্ফীতি প্রায় নিশ্চিতভাবেই আরও বাড়বে। আর এখানেই সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি সামনে আসে; হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা। ইরান তাদের আলোচনার বিবরণে এই বিষয়টিকে সবার আগে রেখেছে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার বিষয়টি আলোচনায় ছিল না। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই ইরান তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনৈতিক অস্ত্র হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
বর্তমানে এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের অন্যান্য দাবির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্রকে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইরানের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথম দাবিটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং দ্বিতীয় দাবিটি ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে। তবে শর্ত, ইরান চুক্তির নিজস্ব অংশ বাস্তবায়ন করবে। ভ্যান্সের এই সফর একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে। উভয় পক্ষই মনে করছে তারা প্রথম দফার লড়াইয়ে বিজয়ী হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে তারা বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ব্যবহার করে ইরানের ওপর বড় আঘাত হেনেছে। আর ইরান মনে করছে, তারা সেই আঘাত সহ্য করে টিকে থাকতে পেরেছে। তবে ফলাফল হলো; কোনো পক্ষই আপস করার মানসিকতায় নেই।
