রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ, বিশেষ করে পহেলা বৈশাখ বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক। এই উৎসবকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসে বৈশাখী মেলা। যা শুধু আনন্দের নয়, বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও ঐতিহ্যবাহী শিল্পেরও এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রাজবাড়ীও এর ব্যতিক্রম নয়।
দিবসটি উপলক্ষে রাজবাড়ী জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে রাজবাড়ী শহিদ খুশি রেলওয়ে মাঠে তিন দিনব্যাপী লোকজ মেলার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন পৃথকভাবে উদযাপন করবে দিনটি। এই মেলা উপলক্ষ্যে ব্যস্ত সময় পার করছে রাজবাড়ীর পালপাড়ার মৃৎশিল্পীরা। মেলায় বিক্রয়ের জন্য পালপাড়ায় তৈরি হয়েছে হাঁড়ি-পাতিল, ফুলদানি, পুতুলসহ নানা ধরণের মাটির শৌখিন সামগ্রী। এখন রঙ তুলির মাধ্যমে সেসসব জিনিসের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করছেন শিল্পীরা।
মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৈশাখ উপলক্ষ্যে চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময় থেকেই শুরু হয় তাদের নিরলস প্রস্তুতি। তবে এখন আর আগের মতো যেমন মেলা হয় না আবার মাটির জিনিসপত্র তৈরি করতে বেড়েছে খরচ। বাজারে এখন প্লাস্টিকের জিনিসের সয়লাব হওয়ায় তাদের মাটির তৈরি জিনিসের কদর কমেছে। এ কারণে অনেক শিল্পী তাদের পেশা পরিবর্তন করেছে। এখন হাতে গোনা কয়েকজন তারা এসব জিনিস তৈরি করছেন।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার বরাট ও দাদশী ইউনিয়নের কয়েকটি পালবাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি ঘরে ঘরে যেন একেকটি ছোট কারখানা। কেউ নদীর পাড় বা জমি থেকে উপযুক্ত মাটি সংগ্রহ করছেন। কেউ সেই মাটি পরিশোধন করে নরম ও ব্যবহারযোগ্য করে তুলছেন। এরপর চাকার ওপর কিংবা হাতে দক্ষতার সঙ্গে গড়ে তুলছেন খেলনা, হাঁড়ি-পাতিল, মাটির ব্যাংক, ফুলদানি, শোপিসসহ নানান শৌখিন সামগ্রী। কোথাও কোথাও মাটির তৈরি জিনিসগুলো রঙ করে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রেখেছেন। আবার কেউ কেউ শেষ সময়ে সেগুলো রঙ করছেন।
সদর উপজেলার দাদশী ইউনিয়নের মৃৎশিল্পী জিতেন্দ্র নাথ মাটির তৈরি তালের ব্যাংক রঙ করছিরেন। তিনি বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন খেলনা ও ব্যাংক তৈরি করেন। এক সময় তার বড় ভাইও তার সঙ্গে এই কাজ করতেন। তবে এখন মাটির এসব জিনিস তৈরি করতে তাদের খরচ অনেক বেড়েছে। এখন আর আগের মতো মাটি পাওয়া যায় না। রঙের দাম বেড়েছে দ্বিগুণ। কিন্ত বাজারে কম পয়সায় প্লাস্টিকের জিনিসপত্র পাওয়া যাওয়ায় এসবের চাহিদাও এখন কমে এসেছে। তাই অল্প পরিমাণে কিছু জিনিস তিনি তৈরি করেছেন। সেগুলো রাজবাড়ী মেলায় বিক্রি করবেন।
ভরত পাল নামে আরেক শিল্পী বলেন, বৈশাখ মাসে অনেকেই গণেশ পূজা করেন। তিনি এই পূজা উপলক্ষ্যে গণেশের প্রতিমা তৈরি করেছেন। এখন শেষ সময়ে সেগুলোর কাজ চলছে। সারা বছর তেমন কাজ থাকে না। বৈশাখ উপলক্ষ্যে কাজ কিছুটা বেড়েছে।
রাজবাড়ী লেখক পাঠক কেন্দ্রের সভাপতি কবি নেহাল আহমেদ বলেন, মৃৎশিল্প শুধু একটি পেশা নয়, এটি বাঙালির সংস্কৃতি। ইতিহাস ও শিকড়ের সঙ্গে এটি গভীরভাবে জড়িত। আধুনিকতার ছোঁয়ায় প্লাস্টিকের তৈরি পণ্যের সহজলভ্যতা ও কম দামের কারণে ক্রমেই কমে যাচ্ছে মাটির জিনিসের চাহিদা। ফলে অনেক মৃৎশিল্পীই পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন। শত শত বছরের এই শিল্প যেন ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবুও আশার কথা, বৈশাখী মেলাকে কেন্দ্র করে এখনও কিছুটা হলেও এই শিল্প কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়। মানুষ যেন মাটির তৈরি পণ্যের প্রতি আবার আকৃষ্ট হয়, এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি সহায়তা, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা এবং মানুষের সচেতনা।
