বৈশাখের স্বপ্নছোঁয়া অনুভূতি

‘এসো হে বৈশাখ,/নবীন প্রভাতে

নতুন আলোকে/আঁধার মুছিয়া দাও।’

 জীবনানন্দ দাশ

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫১ এএম

প্রতিবছরে আসে বাংলা বছর। শুরুর মাস বৈশাখ। কিন্তু আজ থেকে প্রায় ১৫শ বছর আগে এই বাংলা কেমন ছিল? ইতিহাস বলে বাংলা রাজত্ব মূলত প্রাচীন জনপদ বৌদ্ধ পাল ও হিন্দু সেন রাজবংশ, মুসলিম সুলতানি-মুঘল এবং ঔপনিবেশিক শাসনের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়েছে। প্রাচীন যুগে ভাগীরথীর পূর্বদিকে ‘বঙ্গ’ ও পশ্চিমে ‘রাঢ়’ জনপদ ছিল। ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে তুর্কি বিজয়ের মাধ্যমে বাংলায় সুলতানি আমল শুরু হয়। এরপর ১৬শ শতকে মুঘল আমলে ‘সুবাহ বাংলা’ হিসেবে সম্পদশালী প্রদেশে পরিণত হয় বাংলা। মুঘল সম্রাট বাবর এবং হুমায়ূন ছিলেন প্রকৃত মধ্যএশীয়। বাদশা হুমায়ূন ১৫০৮ সালের ৬ মার্চ আফগানিস্তানের কাবুলে জন্মগ্রহণ করেন। আবার আকবর ছিলেন অর্ধেক ইরানি। কারণ, মা হামিদা বানু বেগম ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত। জাহাঙ্গীর ছিলেন একজন অর্ধ রাজপুত এবং আংশিক পারস্যদেশীয়। মুঘল সম্রাটরা ১৬ শতকের শুরু থেকে ১৯ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ভারতীয় উপমহাদেশে মুঘল সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত করে।

সম্রাট আকবরের আমলে কর আদায়ের সুবিধার জন্য বৈশাখ মাস থেকে বঙ্গাব্দ গণনা শুরু। এটি কৃষিনির্ভর বাংলার খাজনা পরিশোধ, হালখাতা ও উৎসবের মাস। ‘বিশাখা’ নক্ষত্রের নামানুসারে বৈশাখ মাসের নাম হয়েছে। কালের প্রবাহে পহেলা বৈশাখ এখন বাঙালির অন্যতম অসাম্প্রদায়িক উৎসব। এই দিনটি দেশে জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে। সে হিসেবে বলা যায়, এটি বাঙালির সর্বজনীন লোকউৎসব। কিন্তু আমাদের দেশে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়েছিল পুরান ঢাকার মুসলিম মাহিফরাস সম্প্রদায়ের হাতে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, নেপাল, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনামে ১৪ এপ্রিলে বর্ষবরণ উৎসব পালন করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে, ইউনেস্কো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক আয়োজিত উৎসব শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। বাংলা সন-তারিখ নিয়ে আমাদের আগ্রহ কম। আর ঐতিহ্যতো দূরের কথা। এই অনীহার মূল কারণ সম্ভবত লুকিয়ে আছে প্রাতিষ্ঠানিক ও পারিবারিক শিক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় কর্মপদ্ধতিতে।

ইতিহাস বলছে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সন এক ধরনের সৌর পঞ্জিকা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে সূর্য মেষ রাশিতে প্রবেশের দিনকে বাংলা বছরের প্রথম দিন ধরা হয়। একসময় নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ ‘আর্তব উৎসব’ তথা ‘ঋতুকালীন উৎসব’ হিসেবে পালিত হতো। তখন এর মূল তাৎপর্য ছিল কৃষিকাজ। কারণ, প্রাযুক্তিক প্রয়োগের যুগ শুরু না হওয়া পর্যন্ত কৃষকের ঋতুর ওপর নির্ভর করতে হতো। কয়েকজন ঐতিহাসিক বাঙ্গলা দিনপঞ্জি উদ্ভবের কৃতিত্ব আরোপ করেন সপ্তম শতকের রাজা শশাঙ্কের ওপর। পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর এটিকে রাজস্ব বা কর আদায়ের উদ্দেশ্যে পরিবর্তিত করেন।

ভারতবর্ষে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কৃষিপণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায়, কৃষি ফলনের সঙ্গে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খাজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হত। মূলত খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা আনার জন্য মুঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন। তিনিই প্রাচীন বর্ষপঞ্জিতে সংস্কার আনার আদেশ দেন। এরপর জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় থেকেই। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে ‘বঙ্গাব্দ’ বা ‘বাংলা বষর্’ নামে পরিচিত হয়। শামসুজ্জামান খান ও নীতিশ সেনগুপ্তের মতে, বাংলা দিনপঞ্জির উদ্ভব পরিষ্কার নয়। শামসুজ্জামানের মতে, “একে বাংলা সন বা সাল বলা হতো, যা যথাক্রমে আরবি ও ফারসি শব্দ। এটা নির্দেশ করছে যে, এটি প্রথম কোন মুসলিম রাজা বা সুলতান দ্বারা প্রচলিত হয়েছে।” অন্যদিকে সেনগুপ্তের মতে, এর ঐতিহ্যগত নাম হচ্ছে বঙ্গাব্দ । বাংলা সনের মূল নাম ছিল তারিখ-এ-এলাহী। মোগল সম্রাট আকবর ১৫৮৫ সালে তার রাজত্বকালের ২৯তম বর্ষের ১০ কিংবা ১১ মার্চ এক ডিক্রি জারির মাধ্যমে তারিখ-এ-এলাহী প্রবর্তন করেন। সিংহাসনে আরোহণের পর তিনি একটি বৈজ্ঞানিক, কর্মোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য বর্ষপঞ্জি প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। যেখানে দিন ও মাসের হিসাব যথাযথ থাকবে। বাংলা সনের জন্ম হয় সম্রাট আকবরের রাজস্ব আদায়ের আধুনিকীকরণের প্রেক্ষাপটে। তারিখ-এ-এলাহীর ১২ মাসের নাম ছিল কারবাদিন, আর্দি, বিসুয়া, কোর্দাদ, তীর, আমার্দাদ, শাহরিয়াার, আবান, আদার, দে, বাহমান ও ইসফান্দিয়ার। কারও পক্ষে আসলে নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হচ্ছে না কখন এবং কীভাবে এসব নাম পরিবর্তিত হয়ে বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ, ভাদ্র, আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ, ফাল্গুন ও চৈত্র হয়েছে। ধারণা করা হয়, ১২টি নক্ষত্রের নাম নিয়ে পরবর্তীতে নামকরণ করা হয়েছে বাংলা মাসের। বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জায়ীস্থা থেকে জ্যৈষ্ঠ, শার থেকে আষাঢ়, শ্রাবণী থেকে শ্রাবণ, ভদ্রপদ থেকে ভাদ্র, আশ্বায়িনী থেকে আশ্বিন, কার্তিকা থেকে কার্তিক, আগ্রায়হন থেকে অগ্রহায়ণ, পউস্যা থেকে পৌষ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন এবং চিত্র থেকে চৈত্র।

বাংলাদেশে ১৯৬৬ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত হওয়া ১৯৬৬ সালের একটি কমিটিতে পুরনো বাংলা দিনপঞ্জিকে সংশোধিত করা হয়। এখানে প্রথম পাঁচ মাসকে ৩১ দিন, বাকি মাসগুলোকে ৩০ দিন বানানো হয়। প্রতি অধিবর্ষে ফাল্গুন মাসে ৩১ দিন ধার্য করা হয়। ১৯৮৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশে এই দিনপঞ্জি গ্রহণ করা হয়। এরপর জাতীয় দিনপঞ্জির সূচনা ও প্রতিবছর নববর্ষ ১৪ এপ্রিলেই হচ্ছে। বৈশাখী উৎসবের আনন্দ আয়োজন মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখ সকালে শোভাযাত্রাটি বের হয়ে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় চারুকলা অনুষদে এসে শেষ হয়। এই শোভাযাত্রায় গ্রামীণ জীবন এবং আবহমান বাংলাকে ফুটিয়ে তোলা হয়। বানানো হয় বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণীর প্রতিকৃতি। ১৯৮৯ সাল থেকে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা পহেলা বৈশাখ উৎসবের একটি অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে পালিত হচ্ছে।

সাংস্কৃতিক আন্দোলনের পাশাপাশি রাজনৈতিক আন্দোলনে পহেলা বৈশাখ এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তৎকালীন আইয়ুব সরকারের আমলে রবীন্দ্রসংগীত, তথা বাঙালি সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতার প্রতিবাদস্বরূপ বৈশাখের প্রথম দিনে ছায়ানট রমনা বটমূলে নববর্ষ পালনের আয়োজন করে। এরপর ক্রমশ এ অনুষ্ঠান বিপুল জনসমর্থন লাভ করে। এর ফলে স্বাধীকার আন্দোলনের চেতনায় পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নীতিবিরুদ্ধ ও বাঙালি আদর্শ লালনে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় বাংলা নববর্ষ পালিত হতে থাকে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সংস্কৃতি অঙ্গনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়।

চৈত্রসংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে তিন পার্বত্য জেলায় উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয়-সামাজিক উৎসব ‘বৈসাবি’ আনন্দমুখর পরিবেশে পালিত হয়। বৈসাবি হলো পাহাড়িদের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ উৎসবকে চাকমারা ‘বিজু’, মারমারা ‘সাংগ্রাই’ এবং ত্রিপুরারা ‘বৈসুক’ বলে আখ্যা দিলেও গোটা পার্বত্য এলাকায় তা ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত। বাংলা নববর্ষ শুধুমাত্র বিনোদনের উৎস নয়, বরং বাঙালি জাতির শত-সহস্র বছরের পুনঃজাগরণের প্রতীতি। সর্বস্তরের বাঙালির জীবিকার দ্যোতনার বৈশাখী মেলা, সরবে আলিঙ্গন করে নতুন বছরকে। বিগত মলিন বছরের ভস্মের মধ্যেই অঙ্কুরোদগম হয় নতুন বছরের। ভিন্ন অনুপ্রেরণা নিয়ে মাটির সোঁদা গন্ধে আমরা যেন হারিয়ে যাই, ভিন্ন কোনো আবেগে। যেখানে নেই কোনো জাতি, বর্ণ, গোষ্ঠী।

হৃদয়ে জাগ্রত থাক সেই স্বপ্নছোঁয়া সুতল অনুভূতি। চেতনায় থাকুক আমরা মানুষ, আমরা বাঙালি। ভালোবাসি সোনার বাংলাদেশ। স্বাগত বৈশাখ, ১৪৩৩।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত