ঢাকা জেলায় ঢুকছে পূর্বাচল

আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

ঢাকা জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে পূর্বাচল নতুন শহরকে। ফলে প্রশাসনিক জটিলতা থেকে মুক্তি পাবে ওই এলাকার মানুষজন। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এ প্রকল্পের মূল কাজ শেষ হলেও এখনো পুরোপুরি বসবাসের উপযোগী হয়নি। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি নাগরিক সেবা ব্যবস্থা, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠেনি।

ভৌগোলিক অবস্থান তিন জেলায় বিভক্ত হওয়ায় পূর্বাচলে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা হ-য-ব-র-ল অবস্থায় আছে। নামজারি, ট্রেড লাইসেন্স, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, বিচারিক ব্যবস্থা সবখানে এর প্রভাব পড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য পূর্বাচলকে তিন জেলার রশি টানাটানি থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজউক।

গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ১৬টি মৌজাকে পাঁচটি মৌজায় রূপান্তরিত করে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতি নিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এবং ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাবও করা হয়েছে। এ ছাড়া পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপে পানি সরবরাহ করার কাজ চলছে। স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট করার জন্য ঢাকা ওয়াসা কাজ করছে।

সব মিলিয়ে পূর্বাচলকে বাসযোগ্য করতে যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে পারলে ওই এলাকায় ব্যাপকভাবে আবাসনের সৃষ্টি হবে। প্লট মালিকরাও বাড়ি করবেন এবং বসবাসের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হবে। এতে মূল ঢাকার ওপর আবাসনের চাপ কিছুটা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এরই মধ্যে রাজউক থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ে কিছু প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাবগুলো আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় পাস হওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও আইন মন্ত্রণালয়ের আনুষঙ্গিক কাজ শেষে সরকার পূর্বাচলকে চূড়ান্তভাবে ঢাকা জেলায় অন্তর্ভুক্ত করবে। এটি বাস্তবায়িত হলে প্রশাসনিক ও বিচারিক সেবায় শৃঙ্খলা আসবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং সরকারি সেবা সহজ হবে।

৩২ বছর পেরিয়ে গেলেও পরিকল্পিত এ নতুন শহরটিকে বাসযোগ্য করতে পারেনি রাজউক। নিরাপত্তা, নাগরিক সেবা এবং প্রশাসনিক জটিলতায় অনেকেই বাড়ি করে বাস করতে পারছেন না। প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে আলাদা সিটি করপোরেশন ও অন্যান্য সেবা সংস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ভেস্তে গেছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নামে প্লট বরাদ্দ দিলেও এখনো কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। তাই প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের পাশাপাশি নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, পূর্বাচলকে নতুন শহর হিসেবে গড়ে তোলার ব্যাপারে রাজউক আন্তরিক ছিল না। সেখানে বসবাসের পরিবেশ গড়ে না ওঠার জন্য জেলা বা সিটি করপোরেশনের অধীনে আনা বড় সমস্যা নয়।

তিনি বলেন, সেখানে ইউটিলিটি সার্ভিস গড়ে না তুলে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে। এ টাকা দিয়ে ইউটিলিটি নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে মানুষ বসবাস করতে পারত। সেখানে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাসপাতালের নামে শুধু প্লট নেওয়া হয়েছে। ৩২ বছরে কোনো ধরনের নাগরিক সুবিধা গড়ে ওঠেনি। সরকারের উচিত এখানে নজর দেওয়া।

৫ মৌজা করার প্রস্তাব

পূর্বাচলে গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ জেলার ১৬টি মৌজা পড়েছে। এটি ঢাকা জেলার অধীন করে পাঁচটি মৌজায় রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্বাচল-১ থেকে পূর্বাচল-৫ পর্যন্ত পাঁচটি মৌজার অধীনে ৩০টি সেক্টরকে পুনর্বিন্যস্ত করা হবে।

প্রকল্পের লে-আউট নকশায় ৩৮ দশমিক ৬০ শতাংশ জমি রাখা হয়েছে আবাসিক প্লটের জন্য। সড়ক ও ফুটপাতের জন্য ২৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, প্রশাসনিক ও ইউটিলিটি কাজে ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ক্রীড়া-পার্ক-বনায়নে ১১ দশমিক ২০ শতাংশ এবং লেক ও খালের জন্য ৭ দশমিক ৬০ শতাংশ জমি রাখা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চার থানা ও ছয় ফাঁড়ি

পূর্বাচলের প্লট মালিকরা বলছেন, সেখানে তারা বাড়িঘর করে থাকতে চান। কিন্তু নিরাপত্তার অভাবে বাড়ি নির্মাণ করতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে। এ বিবেচনায় সেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সম্প্রতি আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে পূর্বাচল নতুন শহরকে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সে আলোকে চারটি থানা, ছয়টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪০টি পুলিশ বক্স করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও হাসপাতাল চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে পূর্বাচলের আইনশৃঙ্খলার জন্য সদর দপ্তরে একটি প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন একটি অপরাধ বিভাগ, একটি গোয়েন্দা বিভাগ, একটি ট্রাফিক বিভাগ, একটি পাবলিক অর্ডার ম্যানেজমেন্ট বিভাগ (পিওএম), একটি পরিবহন বিভাগ, একটি পুলিশ লাইনস, দুটি অপরাধ অঞ্চল (জোন), চারটি থানা, ছয়টি ফাঁড়ি ও ৩০টি পুলিশ বক্স করা হবে। এ জন্য মোট ৭ হাজার ৩২৫ জনের জনবল কাঠামো চাওয়া হয়েছে।

আলাপকালে রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পূর্বাচল নতুন শহরকে বাসযোগ্য করার প্রশাসনিক সব কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে আমরা রাজউক থেকে সব কাজ শেষ করে মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছি। মন্ত্রিপরিষদের বৈঠকে অনুমোদন হলে প্রজ্ঞাপন জারি হবে।’

তিনি বলেন, মানুষ যাতে নিরাপদে ও স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করতে পারে, সেজন্য সব ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি। বসতি গড়ে উঠলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত