এক সময় বৈশাখ এলেই গ্রামবাংলা যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেত। পুরোনো বছরের সব ক্লান্তি ভুলে নতুন বছরকে বরণ করার প্রস্তুতি চলত ঘরে ঘরে, হাটে-বাজারে। বৈশাখ মানেই ছিল হালখাতার আয়োজন, দোকানে দোকানে মিষ্টি বিতরণ, আর গ্রামজুড়ে বসত প্রাণচঞ্চল মেলা। ছোট-বড় সবার অংশগ্রহণে সৃষ্টি হতো এক উৎসবমুখর পরিবেশ। বাংলা নববর্ষের অন্যতম আকর্ষণ ছিল হালখাতা আর গ্রামীণ মেলা। তবে সময়ের পরিবর্তনের বৈশাখের চিরচেনা সেই অনেকটাই বদলে গেছে।
জানা গেছে, ব্যবসায়ীরা বছরের প্রথম দিনে পুরোনো হিসাব চুকিয়ে নতুন খাতা খুলতেন। ক্রেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো, আপ্যায়নে দেওয়া হতো মিষ্টি । এ যেন শুধু লেনদেনের বিষয় ছিল না, বরং ক্রেতা ও ব্যবসায়ীর সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার এক সামাজিক আয়োজন। দোকানগুলো রঙিন কাগজ, ফুল আর আলপনায় সাজানো হতো। নতুন খাতার প্রথম পাতায় লেখা হতো ‘শুভ হালখাতা’, যা ছিল নতুন বছরের শুভ সূচনার প্রতীক।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে এক সময় নতুন বছরে ব্যবসায়ীরা ঐতিহ্যবাহী বৈশাখের হালখাতার আয়োজন করতেন। বিভিন্ন এলাকায় ক্রেতাদের চিঠির মাধ্যমে দাওয়াত জানানো হতো। একই সঙ্গে বসে মিষ্টিমুখ আর খোশগল্পে মেতে উঠতেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। পাইকারি ব্যবসায়ীরা তাদের খুচরো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সকল বকেয়া হিসাব মিটিয়ে নতুন করে লেনদেনের সূচনা করতেন। কিন্তু কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যের সেই হালখাতা এখন বিলীন। বাঙালি ঐতিহ্যের সেই হালখাতা এখন বদলে গেছে। ইংরেজি বছরের হিসাবে দুইবার বকেয়া পরিশোধে হালখাতা করা হয়। বোরো-আমন মৌসুমে ধান কাটা মাড়াই শেষে পুরনো হিসাব মিটিয়ে নতুন করে হিসাব শুরু হয়। ফলে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্যে ভাটা পড়েছে।
শুধু বৈশাখের হালখাতা নয়, ভাটা পড়েছে বৈশাখী উৎসবেও। একসময় বৈশাখ মানেই ছিল গ্রামবাংলার মাঠজুড়ে মেলা, নাগরদোলা, বাঁশির সুর আর লোকজ গানের আসর। পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবে মেতে উঠত সকল শ্রেণি পেশার মানুষ। এখন সেই রঙিন দৃশ্য ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিচ্ছে। নতুন প্রজন্মের জীবনযাত্রা বদলেছে, আর সেই বদলের ঢেউয়ে অনেক ঐতিহ্যই হারিয়ে যাচ্ছে নীরবে।
তবে বর্তমানে উপজেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠন বর্ষরণের ধারা টিকিয়ে রাখছে।
গ্রামবাংলার বৈশাখী মেলাও ছিল মানুষের আনন্দের বড় উৎস। মেলায় পাওয়া যেত মাটির খেলনা, বাঁশের তৈরি সামগ্রী, কাঠের আসবাব, নানান পিঠা-পুলি ও মিষ্টান্ন। শিশুদের জন্য থাকত নাগরদোলা, পুতুলনাচ, বায়োস্কোপ কিংবা জারিগান-বাউলগানের আসর। নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর—সবাই মেলায় এসে মিলিত হতো এক আনন্দঘন পরিবেশে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্রত, পূজা-পার্বণ ও লোকজ আচার-অনুষ্ঠান বৈশাখকে করে তুলত আরও বৈচিত্র্যময়।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৈশাখের সেই চিরচেনা চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় হালখাতার প্রচলন কমে এসেছে। অনেক দোকান এখন আর আগের মতো হালখাতা আয়োজন করে না। অনেকে ডিজিটাল হিসাব-নিকাশে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় ঐতিহ্যবাহী খাতার ব্যবহারও কমেছে। একইভাবে গ্রামীণ মেলার সংখ্যাও আগের তুলনায় কমে গেছে। কোথাও কোথাও ছোট আকারে আয়োজন হলেও সেই আগের মতো উৎসবের জৌলুস আর চোখে পড়ে না।
তবে, সাংস্কৃতিক কর্মীরা মনে করেন যে নগরায়ণ, প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাপন এবং মানুষের ব্যস্ততা এসব পরিবর্তনের বড় কারণ। আগের মতো পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধনও কিছুটা শিথিল হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে লোকজ উৎসবগুলোর ওপর। তবুও এখনও কিছু এলাকায় বৈশাখের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। স্থানীয় উদ্যোগে ছোট ছোট মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও লোকজ আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
সুন্দরগঞ্জ বাজারের কাপড় ব্যবসায়ী বারেক মজুমদার বলেন, একসময় বৈশাখ মাসের প্রথমদিন আমরা হালখাতা করতাম। মহাজনের বকেয়া পরিশোধ করতে যেতাম। সেখানে মিষ্টি খাওয়ানো হতো। এটা আমাদের ঐতিহ্য ছিল, কিন্তু সবকিছু আধুনিক হওয়ায় পুরনো রেওয়াজ হারিয়ে গেছে।
বামনডাঙ্গা বন্দরের ব্যবসায়ী আজিম উদ্দিন ভান্ডারি বলেন,পহেলা বৈশাখে সব ব্যবসায়ী হালখাতার আয়োজন করতেন। লাল খাতায় নতুন করে লেনদেনের মাধ্যমে নতুন বছরের হিসাব শুরু হতো। দেনা পাওনার হিসাব শেষে সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করা হতো।
আব্দুল হামিদ নামে বাজারের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা ছোটবেলায় দেখেছি পাইকারি মহাজনরা পহেলা বৈশাখে হালখাতার চিঠি দিতো। বাবা সে সময় হালখাতা করতে আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। বাংলা সালের নতুন তারিখে মিষ্টিমুখ করিয়ে পুরনো হিসাব মিটিয়ে নতুন করে লেনদেন শুরু করতেন। কিন্তু এখন সবকিছু বদলে গেছে, সেই সঙ্গে আমাদের ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, আমার বাবা যখন বেঁচে ছিলেন তখন দেখতাম পহেলা বৈশাখে হালখাতার আয়োজন করতেন। ছোট-বড় ব্যবসায়ী মিলে একটা উৎসব হতো। কিন্তু এখন আমরা সিজন অনুযায়ী হালখাতার আয়োজন করি।
সাংষ্কৃতিককর্মী আব্দুর রহিম বাদল বলেন, ঐতিহ্যবাহী আয়োজনগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। এখন হাতেগোনা দুই-এক জায়গায় বৈশাখী উৎস পালিত হচ্ছে। কিন্তু আগের চিরচেনা সেই বাঙালি উৎসব চোখে পড়ে না।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর তুজিন ওয়াদুদ বলেন, সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছুই বদলে গেছে। একসময় যে বৈশাখী উৎসব ছিল গ্রামবাংলার প্রাণ। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ব্যস্ততা আর আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে অনেক ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতিতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে।
তিনি বলেন, আধুনিকতার প্রভাবে অনেক পুরোনো আচার-অনুষ্ঠান কমে গেলেও এখনও দেশের কিছু জায়গায় হালখাতার ঐতিহ্য টিকে আছে। ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের অংশগ্রহণে সেখানে এখনও নতুন বছরের হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পুরোনো সেই সংস্কৃতির আভাস পাওয়া যায়।