উত্তর-পশ্চিম ইরানের বিস্তীর্ণ সমভূমি এখন বসন্তের পরশে রঙিন। বরফশুভ্র পাহাড়ের পাদদেশে কাঠবাদাম গাছে ফুটেছে সাদা ফুল। এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির সুযোগে মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে, নিজ জন্মভূমিতে ফিরতে শুরু করেছেন অনেক ইরানি। তবে এই স্বস্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে গভীর অনিশ্চয়তা আর প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে দীর্ঘস্থায়ী কোনো সমঝোতা কি আদৌ সম্ভব?
তুরস্ক সীমান্ত পার হওয়ার অপেক্ষায় থাকা একজন বয়স্ক ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, ‘ছেলের কাছে তুরস্কে এক মাস ছিলাম।’ কনকনে শীতের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি গত পাঁচ সপ্তাহের ভয়াবহ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে বলেন, ‘আমার শহরে ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমান হামলায় মূলত সামরিক লক্ষ্যবস্তুকেই আঘাত করা হয়েছে, বেসামরিক অবকাঠামো বা ঘরবাড়ি নয়।’ দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আর মাত্র সাত দিন বাকি।
তবে সবার অভিজ্ঞতা এক নয়। মাথায় স্কার্ফ পরা এক বৃদ্ধার চোখেমুখে দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। তিনি বলেন, ‘আমি কিছুটা ভীত।’ জনাকীর্ণ আবাসিক এলাকায় শেলের আঘাত এবং রাস্তায় বাসজি আধা-সামরিক বাহিনীর টহল তাকে শঙ্কিত করে তুলেছে। ঊর্ধ্বপানে তাকিয়ে তিনি বিড়বিড় করে বলেন, ‘সবই আল্লাহর হাতে।’
তরুণ প্রজন্মের ভাবনা ভিন্ন। লাল রঙের পাফার জ্যাকেট পরা এক তরুণী দৃঢ়তার সাথে বলেন, ‘এই যুদ্ধবিরতি টিকবে না। ইরান কখনোই হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেবে না।’
তুরস্কের কাস্টমস পেরিয়ে ইরানে প্রবেশের পর এক ব্যক্তি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রসঙ্গে বলেন, ‘ট্রাম্প ইরানকে শান্তিতে থাকতে দেবেন না; তিনি আমাদের গিলে খেতে চান।’ তেহরান যাওয়ার দীর্ঘ পথে প্রতিটি সেতুর দিকে তাকালে ট্রাম্পের হুমকির কথা মনে পড়ে। বিমানবন্দরগুলো বন্ধ থাকায় সড়কপথই এখন একমাত্র ভরসা।
গত বুধবার ট্রাম্প পুনরায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, তিনি ইরানের প্রতিটি সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র মাত্র এক ঘণ্টায় ধ্বংস করে দিতে পারেন। তবে তিনি যোগ করেছেন, ‘আমরা সেটি করতে চাই না।’ বর্তমানে তাবরিজ থেকে তেহরান যাওয়ার মূল সেতুটি গত সপ্তাহের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের এবড়োখেবড়ো গ্রাম্য পথ দিয়ে যাতায়াত করতে হচ্ছে।
বেসামরিক অবকাঠামোয় এই হামলার কড়া সমালোচনা করছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের দাবি, তারা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতেই আঘাত হানছে। পথে তাবরিজের উপকণ্ঠে ইরানি বিপ্লবী গার্ডের (আইআরজিসি) একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যারাক দেখা গেছে, যার ধ্বংসস্তূপের ওপর একটি বিশাল পতাকা টাঙানো রয়েছে।
পথের ধারের শত বছরের পুরনো সরাইখানায় থামলে ইরানের হাজার বছরের সমৃদ্ধ সভ্যতার আঁচ পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান ইরান বদলে গেছে। ২০২২-২৩ সালের 'নারী, জীবন, স্বাধীনতা' আন্দোলনের প্রভাব এখনো স্পষ্ট। অনেক নারী এখন স্কার্ফ ছাড়াই চলাফেরা করছেন। কঠোর পর্দা আইন বলবৎ থাকলেও তারা আর পেছনের দিকে ফিরতে রাজি নন।
তবে বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর অগ্রাধিকার এখন ভিন্ন। মহাসড়কগুলোতে ১৯৭৯ সালের বিপ্লব পরবর্তী তিন সর্বোচ্চ নেতার ব্যানার ঝুলছে: আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এবং তার উত্তরসূরি ও পুত্র মোজতবা খামেনি। মোজতবা সেই হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে এবং তারপর থেকে তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। শোনা যাচ্ছে, তিনি পর্দার আড়াল থেকে দেশের নতুন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কৌশল প্রণয়নে ভূমিকা রাখছেন।
গত বুধবার ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের মধ্যে ২১ ঘণ্টা ব্যাপী রুদ্ধদ্বার বৈঠকের বিস্তারিত তথ্য সামনে এসেছে। ভ্যান্স একে যুক্তরাষ্ট্রের 'সর্বশেষ ও সেরা প্রস্তাব' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে জানিয়েছেন, তেহরান যুদ্ধের অবসান, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের দাবি স্পষ্ট ইরানকে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে হবে, উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নিতে হবে, হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং হামাস-হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে।
তেহরান ২০ বছরের পারমাণবিক কার্যক্রম স্থগিতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছে। ৪৪০ কেজি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের বদলে তারা তা লঘু করার প্রস্তাব দিয়েছে। এদিকে ট্রাম্পের কঠোর অবরোধ সত্ত্বেও ইরান নতি স্বীকারের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং ইরানি কমান্ডার আলী আব্দুল্লাহি হুমকি দিয়েছেন, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগরে তারা যে কোনো রপ্তানি-আমদানি বন্ধ করে দিতে পারেন।
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির বর্তমানে তেহরানে রয়েছেন মধ্যস্থতার চেষ্টা ত্বরান্বিত করতে। হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট নিশ্চিত করেছেন যে, ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানোর গুঞ্জনও শোনা যাচ্ছে।
ওয়াশিংটন মনে করছে সরাসরি যুদ্ধের ভয়াবহ পর্যায় হয়তো পার হয়েছে। কিন্তু সাধারণ ইরানিদের জীবন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়। হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটানো অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ দমন, বৈদেশিক যুদ্ধ এবং ইন্টারনেটের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের পর তারা এখন শুধু ভাবছে—কোনো চুক্তি কি আদৌ তাদের জীবনে পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে আসবে?
সূত্র: বিবিসি