বনমালী বনমালা দুলায়ে

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৭:৫০ এএম

গানটির গীতিকার ও সুরকার দীন শরৎ [১৮৮৭-১৯৪১]। ভক্তিমূলক এ গানে শ্রীকৃষ্ণকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘বনমালী’ বলে। বিরহিণী রাধা বিলাপ করে শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, শ্রীকৃষ্ণ যেন পরজনমে রাধা হয়ে জন্ম নেন। আর রাধা জন্ম নেন শ্রীকৃষ্ণ হয়ে। তাহলে তিনি উপলব্ধি করতে পারবেন রাধার মনোবেদনা।

বনমালীকে নিয়ে আমারও মনোবেদনার কমতি নেই। দুবছর আগে গ্রীষ্মের সময়ে সিলেট শহরের খাদিমনগরে শুকতারা রিসোর্টে ছিলাম। রিসোর্টের পরিবেশটা বেশ মনোরম। টিলার ওপর ঝোপজঙ্গলের প্রাকৃতিক পরিবেশ দিয়ে সাজানো। ব্যালকনিতে বসে দূরের পাহাড় আর আকাশ দেখা যায়। নিচের ঢালে নানারকম পাহাড়ি গাছের বন। বৃষ্টির পর সে বনের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে নানারকম বনফুলের ছবি তুলছিলাম। বন দোপাটি, পশমি ডুমুর, মনকাঁটা, টকআতা, কুলাঞ্জন, মাকড়িশাল-এ রকম কত যে দুর্লভ গাছপালা সে জঙ্গলে! বৃষ্টিভেজা সে জঙ্গলে কর্দমাক্ত মাটিতে পা ফেলে পাহাড়ি ঢালে হাঁটাই মুশকিল। এ গাছ সে গাছ ধরে ধরে হাঁটছি। হাঁটতে হাঁটতেই সে জঙ্গলের ভেতর পেয়ে গেলাম বনমালীকে। এ বনমালী শ্রীকৃষ্ণ না, বনের ফুল।

ঝোপালো গাছের ডালে ডালে শোভা পাচ্ছে সাদা সাদা তারার মতো ছোট ছোট ফুল। চিনতে পেরে ছবি তোলায় মনোযোগ দিলাম। হঠাৎ টের পেলাম, পায়ে কি যেন সুড়সুড়ি দিচ্ছে, একটু জ¦ালাপোড়াও করছে। ট্রাউজার তুলতেই দেখি একটা চিনে জোঁক। পায়ের গোড়ালির ওপর আঠার মতো লেগে আছে। রক্ত চুষে ঢোল। জোঁকটাকে হাত দিয়ে টেনে ছাড়ালাম কিন্তু রক্ত পড়া বন্ধ হলো না। অগত্যা দু চারটা ছবি তুলেই ফিরে এলাম। এই বেদনাটুকুতেই শেষ হলে কষ্ট ছিল না। মনোবেদনা হলো ঢাকায় ফিরে যখন ছবি নামাতে বসলাম। ভুল করে ডিলিট বাটনে চাপ পড়ায় সব ছবি মুছে গেল! মনমরা হয়ে কয়েক দিন কাটল। বিশেষজ্ঞদের কাছে গিয়েও ছবিগুলো আর উদ্ধার করা গেল না।

এ বছর ৪ঠা বৈশাখ সকালবেলায় মিরপুরে জাতীয় উদ্ভিদ উদ্যানের ভেতর হাঁটতে হাঁটতে আবার সেই বনমালীর দেখা পেলাম। প্রধান রাস্তা থেকে পদ্মপুকুরের দিকে যেতে চিড়িয়াখানার সীমানা প্রাচীরের কোলে অনেকগুলো গাছ। বৈশাখী হাওয়ায় দুলছে এলোমেলো ডালপালা। ডালে ডালে ফুটে আছে বনমালী ফুল। কিছু ফুল ফলে পরিণত হয়েছে। ফলগুলো ঠাসাঠাসিভাবে ছোটবড় গুটির মতো দলা ধরে রয়েছে। পাকলে সবুজ ফলগুলোর রং বদলে হয়ে যাবে নীলচে-সাদা, শেষে কালো। ফুল দেখতে তারার মতো। পাঁচটি পাপড়ি, সরু ও খাটো সবুজাভ সাদা নলাকার পুষ্পনল দিয়ে ফুলগুলো পুষ্পমঞ্জরিতে গাঁথা রয়েছে। বাতাসে ভাসছে ফুলের হালকা ঘ্রাণ। ফুলের মধু খেতে বেশ কিছু পিঁপড়া ঘুর ঘুর করছে পুষ্পমঞ্জরির ওপর। পরের সপ্তাহে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের শালবনে গিয়েও পেলাম বনমালীর দেখা।

রুবিয়েসী গোত্রের বনমালী ফুলের আরও একটা চমৎকার বাংলা নাম পেলাম বইয়ে দারুহরিদ্রা। দারু মানে কাঠ আর হরিদ্রা মানে হলুদ। জানা গেল বনমালীগাছের কাষ্ঠল শিকড় থেকে হলুদ রং তৈরি করা যায়। সে রং দিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও পুরোহিতরা প্রাচীনকালে নাকি কাপড় রং করে গেরুয়া বসন বানাতেন। কোনো কোনো দেশে ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী গাছের বাকল থেকে লাল, চকলেট ও বেগুনি রং তৈরি করা হয়। সেসব রং দিয়ে সুতি, রেশম ও পশমি বস্ত্র রঙানো যায়। বনমালীর আরও কিছু নাম পেলাম বনহরিদ্রা, বনশাক, হলদিরুক, পানডোগী, পান্দুকি, রং গাছ, শালি মরিচা ইত্যাদি।

বনমালীর ইংরেজি নাম ঘধৎৎড়ি ষবধভ সড়ৎরহফধ। বৈজ্ঞানিক নাম (গড়ৎরহফধ ধহমঁংঃরভড়ষরধ)। এটি ননিফলের সহোদর। বনমালী বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গুল্ম। পাতা গভীরভাবে শিরাযুক্ত, কিনারা মসৃণ, অগ্রভাগ সুচালো। ফুল দেখতে কিছুটা কুন্দ বা জুঁই ফুলের মতো। গ্রীষ্ম-বর্ষায় ফুল ফোটে। বনমালী দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তথা আমাদের দেশি গাছ। বুনো পরিবেশে প্রাকৃতিকভাবে যেখানে জন্মে সেখানেই ছড়িয়ে পড়ে। তবে কবিরাজরা ঠিকই চেনেন এ গাছ। জন্ডিস, মূত্রনালির প্রদাহ, মাথাব্যথা, জ্বর, বদহজম, ডায়রিয়া ও সংক্রমণের চিকিৎসায় এ গাছের বিভিন্ন অংশ ব্যবহার করা হয়। ঔষধিগুণের জন্য এর ফল কখনো কখনো রান্নার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, পাতা সিদ্ধ করে খাওয়া হয়। লেখার শেষে এসে বনমালীকে নিয়ে কাজী নজরুল ইসলামের একটি গান মনে পড়ছে ‘বনে চলে বনমালী বনমালা দুলায়ে!/তমালে কাজল-মেঘে শ্যাম-তুলি বুলায়ে ॥’

লেখক : কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত