বন্ধ কারখানা চালুর উদ্যোগ

আপডেট : ০৫ মে ২০২৬, ০৭:৫২ এএম

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের অংশ হিসেবে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারসহ বিভিন্ন সময়ে বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বন্ধ কারখানার তালিকা নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে কোন কারখানাগুলো দ্রুত চালু করা যায়, সেসবের তালিকা করা হচ্ছে। বস্ত্র ও পাটকলগুলোকে আবার সচল করার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার।

আগামী এক বছরের মধ্যে ৫০টি বন্ধ পাট ও বস্ত্রকল পুনরায় চালু করা হবে। বন্ধ কল-কারাখানা চালু করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ব্যক্তি নয়, বরং প্রকৃত শিল্প মালিকদের, ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার নির্দেশও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বন্ধ হয়ে যাওয়া কল-কারখানা পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য বেকার জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির শক্তিশালীকরণ। প্রধানমন্ত্রী বন্ধ শিল্প-কারখানা চালু করতে বিশেষ তহবিল গঠন করে দ্রুত কারখানা সচলের নির্দেশ দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় তার নির্দেশ পালনে কাজ করছে।’

গত ২ ফেব্রুয়ারি খুলনার খালিশপুরে প্রভাতী স্কুল মাঠে নির্বাচনী জনসভা করেন তারেক রহমান। সভায় স্থানীয় বিএনপি নেতারা বন্ধ কল-কারখানা চালু করার আবেদন জানান। তারা জানিয়েছিলেন, খুলনার খালিশপুর শিল্পাঞ্চল। আওয়ামী লীগ সরকার সেখানকার জুট মিলগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় শ্রমিকরা বেকার হয়ে পড়েছেন। এগুলো চালু করলে খুলনায় প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।

গত ১ মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে শ্রমিক দলের উদ্যোগে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অংশ নেন। সে সময় বিগত কয়েক বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া কল-কারখানা পুনরায় সচল করার কথা জানান তিনি। তিনি বলেন, ‘সরকার বেশ কিছু ব্যবস্থা ও পরিকল্পনা নিয়েছে। বন্ধ কল-কারখানা পর্যায়ক্রমে চালু করা হবে।’ 

বিএনপির শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক দলের নেতারা দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘১ মে শ্রমিক দলের সমাবেশে আমরা বন্ধ কল-কারখানা খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়েছিলাম। তারই প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা আশা করছি, প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি পূরণ করবেন।’ শ্রমিক দলের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবার আগে জুট মিলগুলো চালু করা হবে। খুলনার বন্ধ পাটকলগুলো আগে চালু করা হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য সেক্টরের বন্ধ কারখানা চালু করা হবে।’

গতকাল সোমবার বাংলাদেশ সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বন্ধ কল-কারখানার বর্তমান অবস্থা ও করণীয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বন্ধ থাকা সরকারি কল-কারখানাগুলোতে যারা আন্তরিকভাবে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান জটিলতা দূর করা জরুরি।’

বৈঠকে উপস্থিত একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে দীর্ঘ সময় লাগে, যা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমিয়ে দেয়। বিভিন্ন দপ্তর থেকে অনুমতি নেওয়ার জটিলতাও বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এ প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ ও সময়োপযোগী করার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, যেসব মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের অনুমোদন অপরিহার্য নয়, সেগুলোকে অনুমোদন প্রক্রিয়া থেকে বাদ দিতে হবে। বন্ধ থাকা সরকারি কল-কারখানায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে ঋণপ্রাপ্তি সহজ করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ারও নির্দেশ দেন তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্প উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম জাহিদ হাসান ও বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) চেয়ারম্যান কবির উদ্দিন সিকদারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এদিকে ঢাকায় ওসমানী মিলনায়তনে ডেপুটি কমিশনারদের সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিল্প, বাণিজ্য এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, ‘৫০টি বন্ধ পাট ও বস্ত্রকল আগামী এক বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পুনরায় চালু করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে পর্যালোচনা বৈঠকে ২৫টি পাটকল ও ২৫টি বস্ত্রকল পুনরায় চালুর বিষয়ে অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বেশ কয়েকটি পাট ও বস্ত্রকল বেসরকারি খাতে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।’

তিনি বলেন, ‘এর মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ সৃষ্টি হবে। চলতি বছরেই আরও ছয়টি কারখানা পুনরায় চালু করা হবে।’

সচিবালয়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া সংশ্লিষ্ট এক মন্ত্রী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার পক্ষ বিগত বছরগুলোতে বন্ধ হওয়া কল-কারখানা চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। কোন কারখানা দ্রুত সচল করা সম্ভব, তা যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিয়মিত পর্যালোচনা সভা হচ্ছে। বন্ধ কারখানা শুধু সরকারি ব্যবস্থাপনায় নয়, বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিয়েও খোলার বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মূল লক্ষ্য বেকার শ্রমিকদের পুনরায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, কারখানাগুলো চালু হলে পুরনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।’ 

২০০১-২০০৬ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার রুগ্ন শিল্প রাজনৈতিক বিবেচনায় দলীয় লোকদের দিয়েছিল। তবে তারা সফল হয়নি। এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনৈতিক বিবেচনায় নয় বরং প্রকৃত ব্যবসায়ী, যাদের সক্ষমতা রয়েছে তাদের রুগ্ন শিল্প বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

 

বন্ধ হওয়া শিল্প-কারখানার তালিকা : ২০২০ সালের ১ জুলাই আওয়ামী লীগ সরকার বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ২৫টি পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এ সিদ্ধান্তের ফলে প্রায় ২৫ হাজার স্থায়ী শ্রমিক ও সমসংখ্যক অস্থায়ী শ্রমিক কর্মসংস্থান হারান। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে সরকারি-বেসরকারি কল-কারখানা বন্ধ করা হয়েছে।

এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ক্রিসেন্ট জুট মিলস (খুলনা), প্লাটিনাম জুবিলি জুট মিলস (খুলনা), স্টার জুট মিলস (খুলনা), লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস (ডেমরা, ঢাকা), হাফিজ জুট মিলস (চট্টগ্রাম) ও ইস্টার্ন জুট মিলস (খুলনা)।

খরচ কমাতে ও লোকসান এড়াতে ১৫টি সরকারি চিনি কলের ৬টির উৎপাদন স্থগিত রাখা হয়েছে। এগুলো হলো পাবনা চিনি কল, পঞ্চগড় চিনি কল, শ্যামপুর চিনি কল (রংপুর), সেতাবগঞ্জ চিনি কল (দিনাজপুর), রংপুর চিনি কল ও কুষ্টিয়া চিনি কল।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) ২৫টি মিলের অধিকাংশেরই উৎপাদন বন্ধ রয়েছে, যেমন আহমেদ বাওয়ানী টেক্সটাইল মিলস, ঢাকা কটন মিলস, মাগুরা টেক্সটাইল মিলস ও রাজশাহী টেক্সটাইল মিলস।

গ্যাস সংকটের কারণে কিছু সার কারখানার উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারখানা যেমন চিটাগাং কেমিক্যাল কমপ্লেক্স, খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস, নর্থ বেঙ্গল পেপার মিলস (পাবনা) বন্ধ রয়েছে।

বেসরকারি খাতে গত কয়েক বছরে শত শত পোশাক কারখানা, চামড়া শিল্প ও ছোট-বড় অনেক ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্ট বন্ধ হয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, ব্যাংক ঋণের জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় এগুলো বন্ধ হয়ে পড়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত