বিশ্বরাজনীতি জটিল ও পরিবর্তনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। যে শক্তিধর রাষ্ট্র একসময়, বৈশ্বিক নেতৃত্বের একচ্ছত্র অধিকারী ছিল, এখন তার অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নীতি, কৌশল ও আচরণগত পরিবর্তনের ফলে, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নকুন চিন্তা তৈরি হয়েছে। এক সময় যে ওয়াশিংটনের ইশারায় বৈশ্বিক রাজনীতির মানচিত্র আঁকা হতো, আজ সেই হোয়াইট হাউজের দেয়ালে ফাটল ধরেছে। বিশেষ করে, ইরান ও মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উগ্রতা এবং ইসরায়েলের অন্ধ পক্ষাবলম্বন আমেরিকাকে একঘরে করে ফেলেছে। কেবল শত্রুরাষ্ট্র নয়, মিত্র দেশগুলোও এখন আমেরিকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী’ বুলি শুনে মুচকি হাসে। প্রশ্ন উঠেছে, রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায়, তখন বিশ্বব্যবস্থার হাল ধরবে কে? ট্রাম্পের নীতি কেবল আন্তর্জাতিক মহলে নয়, খোদ আমেরিকার ভেতরেই এক নজিরবিহীন বিভাজন তৈরি করেছে। ট্রাম্প-বিরোধী বিক্ষোভ এখন কেবল বিরোধী শিবিরের কর্মসূচি নয়, বরং এটি সাধারণ মার্কিন জনগণের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ডেমোক্র্যাট থেকে শুরু করে রিপাবলিকানদের একটি অংশ মনে করে, ট্রাম্পের অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তগুলো আমেরিকার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করছে। রাজপথে নেমে আসা সাধারণ মানুষের এই চিৎকার স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, আমেরিকার নাগরিকরা এখন আর তাদের ট্যাক্সের টাকায়, বিদেশের মাটিতে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধ দেখতে প্রস্তুত নয়।
আমেরিকার আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে, বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছে। বিক্ষোভ এখন আর কেবল মধ্যপ্রাচ্যের শহরগুলোয় সীমাবদ্ধ নেই। লন্ডন, প্যারিস, টোকিও থেকে শুরু করে সিডনি বিশ্বের প্রধান প্রধান নগরীগুলো আজ ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাবের বিরুদ্ধে উত্তাল। সাধারণ বিশ্ববাসীর কাছে আমেরিকার পরিচয় এখন আর ‘গণতন্ত্রের রক্ষক’ হিসেবে নয়, বরং এক অস্থির বিশ্বব্যবস্থার কারিগর হিসেবে। এই গণরোষ আমেরিকার দীর্ঘদিনের তিলে তিলে গড়া ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। আসলে, ইরান সংঘাতে আমেরিকার বৈশ্বিক মর্যাদার অপমৃত্যু হয়েছে। ওবামার সময় পরমাণু চুক্তি থেকে একতরফাভাবে বেরিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে, উসকানিমূলক পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে আমেরিকা বিশ্বশান্তি নয়, বরং বিশৃঙ্খলা চায়। তেহরানের ওপর একের পর এক অমানবিক নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে সাধারণ ইরানি জনগণের জীবন দুর্বিষহ করে তোলার বিষয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ভালোভাবে নিচ্ছে না। এই একগুঁয়েমি আমেরিকার কূটনৈতিক সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে এবং দেশটির আন্তর্জাতিক মর্যাদা আজ ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। সবচেয়ে বড় পরিহাস হলো, যারা বিশ্বজুড়ে সন্ত্রাসের বিচার করতে চায়, তারা নিজেরাই আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে। আমেরিকা যখন অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে হামলা চালায়, তখন তাদের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ স্লোগানটি বিশ্ববাসীর কাছে স্রেফ একটি তামাশায় পরিণত হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার প্রতিটি পদক্ষেপ মূলত ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের স্বার্থরক্ষায় নিবেদিত। ফিলিস্তিনিদের অধিকার হরণ থেকে শুরু করে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি, সবখানেই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি তেল আবিবের আজ্ঞাবহ হিসেবে কাজ করছে। ট্রাম্প প্রশাসন যেভাবে জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং গোলান মালভূমি নিয়ে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর কাছে আমেরিকার নিরপেক্ষতা পুরোপুরি বিলীন হয়ে গেছে। এই অন্ধ আনুগত্যের কারণে আমেরিকা আজ আরব বিশ্বে তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশটির ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য আত্মঘাতী হবে। আমেরিকার দীর্ঘদিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত মিত্র হিসেবে পরিচিত ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর অনেক প্রভাবশালী রাষ্ট্র আজ ওয়াশিংটনের পাশ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসা বা পরিবেশ চুক্তির মতো ইস্যুতে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে আমেরিকার দূরত্ব এখন স্পষ্ট। ওয়াশিংটন আর আগের মতো মিত্রদের ওপর হুকুম জারি করতে পারছে না। স্বার্থান্বেষী এবং পুতুল শাসকদের সহযোগিতায় গড়ে তোলা ঘাঁটিগুলো, মূলত ওই দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং সম্পদ লুটের হাতিয়ার। সাধারণ মুসলিম জনতা বুঝতে পারছে ঘাঁটিগুলো তাদের নিরাপত্তার জন্য নয়, বরং পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার জন্য।
আমেরিকার চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ এবং বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে বিশ্বঅর্থনীতিতে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তেলের বাজারের অস্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনে ব্যাঘাত ঘটায়, সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলাদেশসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলো। ট্রাম্পের ‘ট্রেড ওয়ার’ বা বাণিজ্যিক যুদ্ধ বিশ্ববাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। নিজের সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলার এই দায় ট্রাম্প প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। ডলারের আধিপত্য দিয়ে বিশ্বকে জিম্মি করার প্রবণতা এখন, বুমেরাং হতে শুরু করেছে। আমেরিকা এখন কার্যত বন্ধুহীন। যদিও তাদের সামরিক ও পারমাণবিক শক্তি বিপুল, কিন্তু নৈতিক ও কূটনৈতিক সমর্থন পাওয়ার মতো নির্ভরযোগ্য কোনো সঙ্গী পাশে নেই। কেবল অস্ত্রের জোরে বিশ্ব শাসন করা যায় না। এই ধ্রুব সত্যটি ট্রাম্প প্রশাসন উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকার একাকিত্বই প্রমাণ করে যে, তাদের দম্ভ ও উগ্রতার দিন ফুরিয়ে আসছে। বিশ্ববাসী এখন আর কোনো ‘বিগ ব্রাদার’-এর শাসন চায় না, বরং সার্বভৌমত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে একটি সুষম বিশ্বব্যবস্থা চায়।
বিশ্ব ক্রমেই একক আধিপত্য থেকে সরে এসে একটি বহুমাত্রিক শক্তির ভারসাম্যের দিকে এগোচ্ছে। চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ভারতসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করছে এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় অধিকতর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। এই পরিবর্তন শুধু ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস নয়, বরং একটি নতুন ধরনের বৈশ্বিক কাঠামোর ইঙ্গিত দেয় যেখানে পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং সার্বভৌমত্বের গুরুত্ব বেশি। যদি যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী থাকতে চায়, তবে অবশ্যই তার কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। সহযোগিতা, সংলাপ এবং অংশীদারত্বভিত্তিক কূটনীতিতে ফিরে আসা ছাড়া বিকল্প নেই। অন্যথায়, বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে একক নেতৃত্বের জায়গা থাকবে না; বরং বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি নতুন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে।
লেখক : ব্যবসায়ী ও সমাজ গবেষক
mirabdulalim.com