রবীন্দ্রনাথের লেখার প্রাচুর্য ও আতিশয্য তার নিজের সময়ে তাত্ত্বিক পরিমণ্ডলে আলোচিত হয়ে থাকলেও তার রচনার গভীরে থাকা না-বলা ও না-ভাবা বিষয়গুলো আজও আমাদের তাড়িত করে। এই লেখার উদ্দেশ্য হলো তার সমালোচনা ও সৃজনশীল উদ্ভাবনের জীবন্ত শক্তির এমন কিছু দিকের সন্ধান দেওয়া, যা দেখাবে একবিংশ শতাব্দীর তাত্ত্বিক ও বৈশ্বিক সংকটের দৃশ্যমানতার মাধ্যমে তিনি কীভাবে বিশ্বজুড়ে এখনো প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন।
জাইল দেলেউজ বলেছেন, প্রজাতি হিসেবে মানুষের সঙ্গেই চলে আসে ভাষা। ভাষা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, স্নায়ু-অনুভূতি-জ্ঞান প্রকাশের মাধ্যমে। আধুনিক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে ধারণ করতে চাওয়া বাংলা ভাষার এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তার অতিমানবীয় পদচারণা ঘটেছিল। তার জীবন অভিজ্ঞতার বয়ানে উপচে পড়েছে এসব রচনা।
মানুষের অস্তিত্ব সংক্রান্ত অমীমাংসিত প্রশ্নের ন্যারেটিভ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যকর্মকে পরিপূর্ণ করে তুলেছে এবং এর আধুনিক ও সমকালস্পর্শী অবস্থান নিশ্চিত করেছে। প্রাচ্য, এশীয় বা বঙ্গীয় তুচ্ছজ্ঞানকারী প্রান্তিকীকরণের মানবতাবাদকে আপন করে নেওয়ার মাধ্যমে ‘প্রাচ্যবাদ’ বা ওরিয়েন্টালিজমকে তিনি নিজের মতো করে রূপান্তরিত করে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের আগে এ নিয়ে অন্য কোনো এশীয় লেখক সাহিত্য রচনা করেননি। অনেক পরে এডওয়ার্ড সাঈদ এই প্রাচ্যবাদকেই তাঁর চিন্তা ভাবনার কেন্দ্রে নিয়ে আসেন, যা পরে পশ্চিমী জ্ঞানতত্ত্বের প্রধান বিষয় হয়ে ওঠে।
দার্শনিক মার্টিন হাইডেগার নিজেকে ‘মানবতা-বিরোধী’ বলে ঘোষণা করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ তার বিশ্বজনীন মানবতাবাদের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সেই বিরোধিতাকে আরও গভীর করে দেখেছেন। এ হচ্ছে সেই উত্তর-আধুনিক ভাবনা, যার প্রতিধ্বনি ফুকোর কণ্ঠেও শোনা গেছে। ফুকো মানুষের প্রতিচ্ছবি মুছে যাওয়ার যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, তার উৎস খুঁজে পাওয়া যায় নিৎসের সংজ্ঞায়—যেখানে মানুষকে এক ‘রূপান্তরকালীন সত্তা’ বা ‘পশু ও অতিমানবের মধ্যে টাঙানো একটি দড়ি’ হিসেবে দেখা হয়েছে। মানবতার অভিজ্ঞতাতগত বাস্তব এবং স্বাধীনতা, সাম্য ও সৌভ্রাতৃত্বের আধুনিক আদর্শের প্রতি সজাগ থেকেও রবীন্দ্রনাথ মানুষের সীমাবদ্ধতা বা বাউন্ডেড এসেন্সকে অস্বীকার করেছিলেন। উপনিষদীয় অন্তর্দৃষ্টির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা তার মানবচিন্তা ‘হয়ে ওঠা’ বা becoming এবং অবভাসতত্ত্ব বা Phenomenology-র অস্তিত্ববাদী উন্মুক্ত দিগন্তের সঙ্গে মিলে যায় এবং মানবতাবাদী/মানবতাবাদবিরোধী বিভাজনকে অতিক্রম করে। রবীন্দ্রনাথ স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার এবং অন্যতম সত্তায় পরিণত হওয়ার (becoming-other) জন্য মানুষের আবেগীয় সহমর্মিতার এমন এক পরিচয়ে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন যেখানে মানুষ তার অস্তিত্বের সঙ্গে একাত্মতা স্থাপন করবে। রবীন্দ্রনাথের এই মানবিক ‘আত্ম-অতিক্রম’ ও ‘বিশ্বমানবীয়’ ভাবনাটি মরমিবাদ নয়, বরং ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যে তার সার্থকতা খুঁজেছে। এই ভাবনাটিই হচ্ছে ‘বহুত্ববাদী বিশ্বজনীনতা’, যা আন্তদেশীয় যোগাযোগের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। আধুনিক কালের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এটাই হচ্ছে ভিত্তি, যার কথা স্মরণ করিয়ে দেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের ভাবুকরা।
ভাষা বা বাচনের গভীরে নিমজ্জন মানেই হলো রাজনীতির আবর্তে প্রবেশ—তা যেমন মতাদর্শিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি, তেমনি ব্যক্তিসত্তা বিকাশের অনু-রাজনীতি। আঞ্চলিক, জাতীয়, আন্তঃমহাদেশীয় এবং বৈশ্বিক—এই নতুন কল্পিত আত্মপরিচয়গুলোর উত্থানের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত ও অংশগ্রহণ করার সময় রবীন্দ্রনাথ সর্বদা এই কঠিন ‘বিবর্তন বা হয়ে ওঠার রাজনীতি’কে অভ্যস্ত জীবনচর্যায় প্রোথিত করতে চেয়েছিলেন; তা সে জোড়াসাঁকোর স্থানীয় আন্তঃব্যক্তিক পরিবেশেই হোক বা শান্তিনিকেতনের সৃজনশীল বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার সংকল্প থেকেই হোক। এই প্রক্রিয়ায়, তার স্বায়ত্তশাসনের অন্বেষণ সাম্রাজ্যের সেই আধিপত্যের বিরুদ্ধে গেছে, যা সর্বস্তরে সক্রিয় এবং যা মানুষের স্বকীয়তাকে গ্রাস করার চেষ্টা করে। এই আধিপত্য কাজ করে যেমন বস্তুগতরূপে (সাম্রাজ্যবাদী/ সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ, রাষ্ট্রীয় বা করপোরেট প্রশাসন, সামাজিক বা পারিবারিক পিতৃতন্ত্র), তেমনই প্রযুক্তির মাধ্যমে মানসিক বশীকরণের ক্ষেত্রেও। তাত্ত্বিকভাবে আজ বিশ্বজুড়ে রবীন্দ্রনাথের পাঠবিশ্লেষণ করছেন অসংখ্য খ্যাতিমান চিন্তক। এই বিশ্লেষণের অর্থ হলো সেসব প্রতিরোধের সংকেতগুলোকে উন্মোচিত করা, যা তার শব্দ, দৃশ্য, শ্রুতি বা আঙ্গিক ব্যবহারের কৌশলের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের নৃত্যনাট্যে নারীবাদ, রবীন্দ্রসংগীতের মিশ্র নির্মাণ ও প্রসার উন্মুক্ত দ্বান্দ্বিকতার চাক্ষুষ ও শ্রুতিগত রাজনীতিকেও ব্যাখ্যা করে।
গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নানা দিক নিয়ে বেশ স্পষ্টভাবে সমালোচনা করা হচ্ছে। ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকের শেষ দিকে গড়ে উঠেছিল উত্তর-কাঠামোবাদের তত্ত্বসূত্র। সত্যের নিয়ম প্রতিষ্ঠায় মিশেল ফুকোর ক্ষমতা ও জ্ঞানের প্রত্নতত্ত্ব ও বংশগতিবিদ্যার অধ্যয়ন এবং এর রেশ ধরে এডওয়ার্ড সাঈদ ১৯৭৮ সালে প্রকাশ করেন ওরিয়েন্টালিজম গ্রন্থটি। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে পশ্চিমা রাজনৈতিক শক্তি জ্ঞান আহরণ, বিষয় ভাবনায় ঔপনিবেশিক যুগে এবং তারপরও অপশ্চিমা বিশ্বকে দমন করার কাজে জড়িত ছিল। এরপর থেকে উত্তর-ঔপনিবেশিক তাত্ত্বিকরা সাম্রাজ্যবাদ, উপনিবেশবাদ, উত্তর-জ্ঞানালোক এবং আধুনিকতাবাদী উদার মানবতাবাদের প্রতি অপশ্চিমা বিশ্ব কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তাই নিয়ে কাজ করেছেন। ১৯৮০-র দশকের ‘সাবঅল্টার্ন স্টাডিজ’ (নিম্নবর্গীয় পাঠ) গোষ্ঠী এই পদ্ধতি উন্মোচনের জন্য পরিচিতি পায়। এই সাবঅল্টার্ন গোষ্ঠীরই একজন প্রখ্যাত চিন্তক গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। তিনি রবীন্দ্রনাথ যে বিশ্বসাহিত্যের ধারণা দিয়েছেন, যার সম্পর্ক আনন্দ আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাহিত্যের পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে, তাকেই বিশ্বসাহিত্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতাকে খারিজ করে দিয়ে বিশ্বজনীন স্বাধীনতা ও সৃজনশীলতার উন্নত বিশ্ব গঠনের লক্ষ্যকে গ্রহণ করেছিলেন। এই সূত্রে তিনি ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সেই সম্পদগুলোর সন্ধান করেছেন, যা বিশ্বজনীনতার পথে সহায়ক হতে পারে।
আধুনিক মানবতাবাদকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই আধুনিকতার মধ্যে আত্ম-অতিক্রম এবং অন্য-সত্তায় রূপান্তরিত হওয়ার ক্ষমতা পেয়ে যায় মানুষ। সে তার সীমানা ছাড়িয়ে প্রকৃতি ও প্রাণিজগতের সঙ্গে আত্মীয়তার বন্ধন তৈরি করে। রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতাকে সংশোধন করে মানুষের সীমানাকে ‘সর্বপ্রাণবাদ’ (panpsychism) বা ‘সর্বেশ্বরবাদের’ (panentheism) দিকে প্রসারিত করে দিয়েছেন। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সখ্যের মাধ্যমে মহাজাগতিকতার দিকে ধাবিত হয়ে উত্তর-আধুনিকতার সম্ভাবনাকে উন্মোচিত করেছেন। ‘বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, সৃজনশীল বৈশ্বিক সত্তার গঠন মানুষের মুক্তির সঙ্গে যুক্ত। এখানেও আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতার মানবতাবাদকে অতিক্রম করে এক অনন্য বৈশ্বিক সত্তা তৈরির প্রকল্পের দিকে এগিয়ে গেছেন। এর লক্ষ্য হচ্ছে, সাংস্কৃতিক ইতিহাসে শিকড়িত থেকে বৈশ্বিক সত্তা বা ‘গ্লোবাল সাবজেক্ট’ গঠন করা। রবীন্দ্রনাথ ঠিক এই কাজটিই করেছেন, যার গুরুত্ব সাঈদের মতো চিন্তকরা স্বীকার করে নিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের নিরন্তর ভ্রমণ, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং তার জীবনের ‘শেষ ফসল’ হিসেবে পরিচিত চিত্রকর্মকে সমৃদ্ধ চিত্রগত কথোপকথনের অংশ হিসেবে দেখা যায়। এই ছবিগুলো মন্ময় আদিমতার (subjective primitivism) দ্বারা গঠিত, যা বিশ্বজনীন আধুনিকতার অবৈজ্ঞানিক বা অযৌক্তিক অবদমনের বিপরীতে মনস্তাত্ত্বিক অবচেতনের উৎসকে খনন করে আমাদের দৃষ্টিগোচর করে।
শার্ল বোদল্যেরের মতোই কসমোপলিটান শিল্পবোধ এবং বহুত্ববাদী বিশ্বজনীন হয়ে ওঠার আহ্বান রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যেরও মূল ভিত্তি। তবে জাতীয় ও বৈশ্বিক সত্তা গঠনের নৈতিকতা ছিল তার গদ্যের প্রধান উপজীব্য বিষয় এবং তা তার কবিতার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে মিশে গিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্যের ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ তত্ত্বে (surplus value theory) দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী ছিলেন, যার মূল কথা হচ্ছে শিল্পকর্মে সৌন্দর্যের আধিক্য থাকবে। ‘শিল্পের জন্য শিল্প’ ভাবনা কখনোই বর্জন করা যায় না। একই সঙ্গে শিল্পই সব নয়। মার্টিন কেম্পশেন এই সূত্রটিই আমাদের ধরিয়ে দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ একই সঙ্গে পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নন্দনতত্ত্বের সহজ আত্মীকরণ সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং শ্রেণি, সংস্কৃতি ও লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে স্বায়ত্তশাসিত সৌন্দর্যের এক সামষ্টিক বহিঃপ্রকাশ খোঁজার জন্য সামাজিক প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করেছিলেন। তার অসাম্প্রদায়িক মরমিবাদ গড়ে উঠেছিল সত্তার সূক্ষ্ম অন্তর্নিহিত ঐক্য (ব্রহ্ম) এবং ‘হয়ে ওঠা’র (becoming) ওপর নির্ভর করে, যেখানে মানুষ ঐক্যের এই সৃজনশীল আবেগকে ধারণ এবং গতিশীলতাকে উপলব্ধি (লীলা) করে থাকে।
রবীন্দ্রনাথের মধ্যে জীবনের নৈতিক ও নান্দনিক আবেগ এসেছিল বাংলার আঞ্চলিক সাহিত্য বৈষ্ণব ঐতিহ্য থেকে, যার সঙ্গে তিনি স্থানীয় এবং বৈচিত্র্যময় বিশ্বমরমি ঐতিহ্যের ছোঁয়া যুক্ত করেছিলেন। এই মরমি অভিমুখ রবীন্দ্রনাথের কাছে পারলৌকিক সাধনা ছিল না, বরং তা তাকে মহাজাগতিক ও সামাজিক সত্তাকে পড়ার ও ব্যাখ্যা করার দৃষ্টি ও কাঠামো দিয়েছিল।
জাতি, গোষ্ঠী, শ্রেণি বা লিঙ্গ বৈষম্যমুক্ত একটি বিশ্বজনীন ও সমতাবাদী বিশ্বে পৌঁছানোই ছিল রবীন্দ্রনাথের নৈতিকতা; যে নৈতিকতার সক্রিয়তা রাজনীতিতে নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে মনস্তত্ত্ব এবং নান্দনিক সত্তা গঠনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। বিশিষ্ট তাত্ত্বিক প্যাট্রিক হোগান বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প ও উপন্যাসে আমরা ব্যক্তিক আবেগ ও সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের এক নিবিড় বিশ্লেষণ পাই, যেখানে শ্রেণি ও পুরুষতন্ত্রের সীমানার মধ্যে ‘সংলগ্ন সংবেদনশীলতা’ (attachment sensitivity) এবং ‘সংলগ্ন উন্মুক্ততা’ (attachment openness) মানুষের বন্ধন ও বিকাশের আনন্দকে হয় ব্যাহত করে, নয়তো ত্বরান্বিত করে। আখ্যানের এটাই হচ্ছে আধুনিক বৈশিষ্ট্য।
আবেগীয় আন্তঃব্যক্তিকতার এই ব্যবহারিক ব্যাখ্যা আধুনিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সত্তা গঠনে রবীন্দ্রনাথের চিন্তার মূলে অবস্থান করছিল। সাংস্কৃতিক মনস্তত্ত্বের এই বোঝাপড়া সমানভাবে রাজনৈতিক; যা প্রাগাধুনিক-আধুনিক, ঔপনিবেশিক-উত্তর-ঔপনিবেশিক, উত্তর-কাঠামোবাদী-উত্তর-আধুনিক, নারী-পুরুষ এবং অভিজাত-নিম্নবর্গীয় ক্ষমতার সীমানা জুড়ে ছড়িয়ে আছে।
প্রাগ্রসর নারীভাবনারও অধিকারী ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। আধুনিক নারীবাদের সঙ্গে এই ভাবনার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। স্বায়ত্তশাসিত নারীসত্তার ক্ষমতায়ন, নারীর সারসত্তাকে দখল ও নিয়ন্ত্রণ করার পুরুষতান্ত্রিক লালসার ধ্বংসাত্মক প্রভাব, নারী-পুরুষ সম্পর্কের সৃজনশীল আবেগ এবং গঠনমূলক সামষ্টিক জীবনে মুক্ত নর-নারীর প্রেম ও অংশগ্রহণের সম্ভাবনাকে তিনিই প্রথম বাঙালি লেখক হিসেবে উন্মোচিত করে দেখিয়েছেন।
ঘরে বাইরে ও শেষের কবিতায় ঘর এবং বাইরের লিঙ্গীয় সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামো এবং নারীমুক্তি যে সমান্তরাল নয়, সেই অসংগতি প্রকাশ করে। শেষের কবিতায় রবীন্দ্রনাথ একজন প্রখর বুদ্ধিমান এবং আবেগীয়ভাবে পরিপক্ব নারী চরিত্রের মাধ্যমে এই অসংগতিকে তুলে ধরেছেন। উপন্যাসটিতে রবীন্দ্রনাথ দেখিয়েছেন, নর-নারীর সম্পর্ক মানসিক স্তর থেকে বস্তুগত অস্তিত্বে উন্নীত হতে গিয়েও ব্যর্থ হয়েছে। এই ব্যর্থতা উপন্যাসের ঘটনাকালের দেশীয় সামাজিক বাস্তবতা এবং কসমোপলিটান বা বিশ্বজনীন চাহিদার মধ্যকার গভীর ব্যবধানকে উন্মোচিত করেছে। এর আগে পরিবর্তিত এই নারীকে আমরা প্রথম দেখতে পেয়েছি ‘স্ত্রীর পত্রে’, চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যে দেখা গেছে অন্যভাবে।
রাজনৈতিকভাবে পরাধীন এবং সাংস্কৃতিকভাবে অবদমিত জাতির সদস্য হিসেবে তিনি যেমন আধুনিকতার আত্মনিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন, তেমনি ‘পাশ্চাত্যের’ আধিপত্যবাদী সভ্যতার বিরুদ্ধে একটি সর্ব-এশীয় (Pan-Asian) পরিচয়ের সংহতির পক্ষেও দাঁড়িয়েছিলেন। এটিই রবীন্দ্রনাথকে অন্যান্য এশীয় দেশ এবং বন্ধুত্বের দিকে পরিচালিত করেছিল, বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এবং পূর্ব-এশীয় সংস্কৃতির দিকে। তিনি চীন, জাপান ও জাভা ভ্রমণ করেছিলেন। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক একে ‘অন্য এশিয়া’ বা ‘আদার এশিয়াস’ বলে চিহ্নিত করেছেন। আজ ইরান যে লড়ছে, তা এই সর্ব-এশিয়ার আরবীয় সংস্করণ।
দক্ষিণ-পূর্ব, পূর্ব-এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে যেমন তিনি সৃজনশীল আন্তঃব্যক্তিক সম্পর্ক চেয়েছিলেন, তেমনি পূর্ববঙ্গ এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ক্ষেত্রে তিনি অভ্যন্তরীণ ‘ওরিয়েন্টালিজম’ পরিহার করে জাতীয় ব্যক্তিসত্তা কল্পনার সাংস্কৃতিক বিকল্প এবং বৈচিত্র্য খুঁজেছেন। ‘নিউ হিস্টোরিসিজম’-এর ধারায় রবীন্দ্রনাথ কথাসাহিত্যকে অভ্যন্তরীণ ‘প্রাচ্যের’ রাজদরবার এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। এই ভাবনাই নির্মাণ করে দিয়েছে ‘জাতীয় আধুনিকতা’, পশ্চিমী আধুনিকতা থেকে রবীন্দ্রনাথ এভাবেই সরে এসেছেন। তিনি জানতেন, কোনো সাহিত্যচর্চাই জাতীয় ও বৈশ্বিক প্রতিনিধিত্বের রাজনীতিকে (politics of representation) অগ্রাহ্য করতে পারে না, করলে সেই সাহিত্যের চরিত্র পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। রবীন্দ্রনাথ নিজে তার জীবন ও কর্মের মাধ্যমে রাজনীতিতে নিজেকে কীভাবে উপস্থাপন করেছিলেন, এই প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নটি গত প্রায় দেড় দশক ধরে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে রবীন্দ্র-আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আশিস নন্দী দেখিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ বৈশ্বিক গণতন্ত্রে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার লক্ষ্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরার জন্য প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিকতার বিরোধিতা থেকে কৌশল হিসেবে সরে এসেছেন। আঞ্চলিক আধুনিক বাঙালি সত্তা নির্মাণেও তার ভূমিকা ছিল। শাস্ত্রীয় রাগ, বিভিন্ন আঞ্চলিক ও জাতীয় লোকজ সুর এবং পাশ্চাত্য সংগীতের সংমিশ্রণে তিনি এমন এক শ্রোতৃমণ্ডলী তৈরি করেছিলেন, যার কেন্দ্র ছিল একটি নতুন শহুরে দেশজ পরিচয়—যা উচ্চবিত্ত, নিম্নবিত্ত এবং বিশ্বজনীন সত্তাকে এক সুতোয় বেঁধেছে।
জীবনের শেষ দিকে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কবি ও চিত্রশিল্পীর ‘অন্তিম শৈলীচর্চা’র (late style) নতুন একটি রূপ লক্ষ করা যায়, যে চর্চায় সত্তাতাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটে বলে ইঙ্গিত করেছেন এডওয়ার্ড সাঈদ তার শেষের শৈলী গ্রন্থে। রবীন্দ্রনাথ জন্মনিয়ন্ত্রণের আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির সমর্থক ছিলেন। তিনি এই জন্মনিয়ন্ত্রণের পক্ষাবলম্বন করে জন্মনিয়ন্ত্রণ আন্দোলনের নেত্রী মার্গারেট স্যাঙ্গারকে চিঠি লিখেছিলেন। স্যাঙ্গার ১৯৩৫ সালে ভারত ভ্রমণ করেছিলেন এবং তখন তিনি গান্ধী ও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
রবীন্দ্রনাথের সার্ধশততম জন্মবার্ষিকী ২০১১ সালে বিশ্বজুড়ে, অত্যন্ত উৎসাহ ও শ্রদ্ধার সঙ্গে উদযাপিত হয়েছিল। প্রখ্যাত জার্মান রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ মার্টিন কেম্পশেন লিখেছেন, এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানগুলো, রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতায় যারা বিশ্বাস রাখেন তাদের সবার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। সেই সময় বিভিন্ন দেশে অনুষ্ঠান উৎসবের ভেতর দিয়েই ‘কবির মূল্যায়ন ও কদর নতুন এক অধ্যায়ে প্রবেশ’ করে। সেটা শুধু ভারত বা বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে। তিনি জানাচ্ছেন, ‘কে ভেবেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ ফিনল্যান্ড, কোস্টারিকা কিংবা তিব্বতে পঠিত হবেন?’ সেই সূত্রে রবীন্দ্র-উৎসব কীভাবে জার্মানিতে উদযাপিত হয়েছিল তার বিস্তৃত বিবরণ তিনি দিয়েছেন তার অনুভবে অনুধ্যানে রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে।
অমর্ত্য সেন লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল মানুষের বেঁচে থাকা ও বিচার করার স্বাধীনতা। রাজনীতি ও সংস্কৃতি, জাতীয়তা ও আন্তর্জাতিকতার ঐতিহ্য এবং আধুনিকতাকে তিনি অবিমিশ্রভাবে গ্রহণ করেছিলেন। তাকে ইয়েটস্ যেমন মনে করেছেন, ‘প্রাচ্যের এক মহান রহস্যবাদীর’ (মিস্টিক) ভাবমূর্তিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না; এ নিয়ে তিনি বারবার আপত্তি জানিয়েছেন। কিন্তু ইয়েটস্ ও পাউন্ড তাকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেছেন।
পশ্চিমে যুদ্ধের আতঙ্ক, জীবনের প্রতি বীতস্পৃহা, নিঃসঙ্গতা, গৃহহীনতা—অর্থাৎ বিশ্বজুড়ে সভ্যতার সংকট যত তীব্র হয়েছে, ততই রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এই মুহূর্তে বিশ্ব যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ প্রসঙ্গে তিনি যে কথা বলেছিলেন, তা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। তিনি যথার্থই মনে করতেন, ক্ষমতার গুরুতর অসাম্যের মধ্যে নিহিত থাকে অবিচার (উপনিবেশবাদ তারই অন্যতম দৃষ্টান্ত)। রবীন্দ্রনাথ উত্তর-আধুনিকদের মতো বারবার যে প্রশ্নটি করেছেন তা হলো, যা বলা হচ্ছে সেটা আমাদের কাম্য কিনা তা সব দিক দিয়ে খতিয়ে দেখা হয়েছে কি? ইতিহাস খুবই মূল্যবান ঠিকই, কিন্তু যুক্তিবুদ্ধিকে অতীত অতিক্রম করে যেতে হবে। যুক্তিবুদ্ধি—স্বাধীন, নির্ভীক যুক্তিবুদ্ধি—সব কিছুর ঊর্ধ্বে, এই উপলব্ধির মধ্যেই আমরা রবীন্দ্রনাথের কালজয়ী কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিকতা তাই দ্বন্দ্ব-বিক্ষুব্ধ, অশান্ত পৃথিবীতে কখনো ফুরাবে না।
