আর্থিক ‘নয়ছয়ে’ গৃহদাহ বেসবলে

আপডেট : ০৯ মে ২০২৬, ০১:৪০ এএম

গত এপ্রিলে দায়িত্ব গ্রহণ করে বাংলাদেশ বেসবল সফটবল অ্যাসোসিয়েশনের নতুন কমিটি। এরই মধ্যে মওলানা ভাসানী জাতীয় হকি স্টেডিয়ামে রুমও বরাদ্দ পায়। কিন্তু এক বছর না যেতেই ভেঙে পড়েছে এই অ্যাসোসিয়েশনের সাংগঠনিক কাঠামো। মূলত একটি টুর্নামেন্টে হওয়া ছয় থেকে নয় লাখ টাকার আর্থিক অনিয়মের কারণেই এখন কর্মকর্তাদের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তৈরি হয়েছে তীব্র বিভ্রান্তি, যা এখন রীতিমতো হট্টগোলে রূপ নিয়েছে।

গত বছরের ৯ এপ্রিল জাতীয় স্টেডিয়ামের কনফারেন্স রুমে বেশ ঘটা করেই দায়িত্ব বুঝে নেয় বর্তমান অ্যাডহক কমিটি। দায়িত্ব নেওয়ার পর অক্টোবরে ‘ষষ্ঠ জাতীয় নারী বেসবল চ্যাম্পিয়নশিপ’ ছিল এই কমিটির প্রথম আয়োজিত টুর্নামেন্ট। কিন্তু এক টুর্নামেন্টকে ঘিরে নানা আর্থিক অনিয়মের কারণে এখন ভঙ্গুর দশা কমিটির। টুর্নামেন্ট-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানা গেছে, ১২ দলের এই টুর্নামেন্টের শুরুতে মোট বাজেট ধরা হয়েছিল সাড়ে আট থেকে নয় লাখ টাকা। তবে আয়-ব্যয়ের হিসাব নিয়ে দায়িত্বশীলদের বক্তব্যে দেখা গেছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। আয়োজকদের একাংশ দাবি করছেন, তারা মোট ছয় লাখ টাকার মতো পেয়েছেন। অন্যদিকে খরচের খাত দেখাতে গিয়ে বিভিন্ন অঙ্ক সামনে আসছে, যা মিলছে না একে অপরের সঙ্গে।

অক্টোবরে খেলা শেষ হলেও এখনো টুর্নামেন্ট কমিটির সম্পাদক এবং অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ইমাম হোসেন সোহাগ হিসাব দেননি বলে অভিযোগ করেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তালহা জুবায়ের। শুধু তাই নয়, হিসাব সাবমিট করার জন্য গত ২ এপ্রিল সোহাগকে চিঠিও দেন জুবায়ের। তার কথা, ‘ছয় মাস হয়ে গেছে, টুর্নামেন্টে খরচা হওয়া ছয় লাখ টাকার হিসাব এখনো দেননি সোহাগ। তাই আমরা চিঠি ইস্যু করে তার কাছ থেকে হিসাব চেয়েছি।’ তবে ভিন্ন কথা বললেন অভিযুক্ত সোহাগ, ‘জুবায়েরই দায়ী। কারণ সাধারণ সম্পাদক হয়েও নিজে সব করতে চান। জার্সিতে ডাবল দাম দেখাচ্ছেন। ব্যাট এক হাজার টাকা হলে দেখাচ্ছেন তিন হাজার টাকা। তাহলে হিসাব দেব কী করে?’ এই যুগ্ম সম্পাদক যোগ করেন, ‘খরচ হয়েছে ছয় লাখ টাকা, কিন্তু আমাকে সাধারণ সম্পাদক যে হিসাব দিলেন তাতে দেখা যায়, লিখতে গেলে তা আট লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাবে। তাহলে কীভাবে আমি বাড়তি খরচের হিসাব মেলাব।’ তিনি যোগ করেন, ‘কমিটির শুরুর দিকে জাপান থেকে ১২ লাখ টাকা এসেছিল। কিন্তু তার কোনো হদিস নেই। আসলে ফেডারেশনের সবকিছুই সাধারণ সম্পাদক তালহা জুবায়ের, সহসভাপতি ডা. অনুপম হোসেন এবং সদস্য ফরিদ আহমেদই করে থাকেন।’ এ বিষয়ে সাধারণ সম্পাদকের কথা, ‘আমাদের অ্যাসোসিয়েশনে প্রত্যেকটি খরচের পাইটুপাই হিসাব রয়েছে। আর ১২ লাখ টাকা জাপানি কোচের জন্য এসেছিল, সেটা কোচকে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সব সিদ্ধান্তই আমরা কমিটির সভাপতিসহ সবার সঙ্গে আলোচনা করেই নিয়ে থাকি।’

সাধারণ সম্পাদক আর যুগ্ম সম্পাদকের গ্যাঁড়াকলে কোষাধ্যক্ষ খালেদ মাহমুদ ফয়সাল হাবিব। সূত্রে জানা গেছে, এই সমস্যার কারণেই তিনি ঠিকমতো অ্যাসোসিয়েশনে আসছেন না। তবে এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ফয়সাল হাবিব বলেন, ‘কমিটি গঠনের পরই আমি বলে দিয়েছিলাম, অন্যত্র চাকরি করি। তাই বন্ধের দিন ছাড়া আমি আসতে পারব না। ফলে সবসময় আমার যাওয়া হয় না। অন্য কোনো কারণ নেই।’ এই কোষাধ্যক্ষ এবার একটি পরামর্শ দিলেন, ‘সাধারণ সম্পাদক তালহা যুবায়ের ও যুগ্ম সম্পাদক ইমাম হোসেন সোহাগকে এক টেবিলে বসালেই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে সব।’

এদিকে টুর্নামেন্টে খরচ করেও কমিটির কর্তাদের সমস্যায় পাওনা পাচ্ছেন না টিম স্পোর্টস অ্যান্ড ইভেন্টের কর্ণধার তারিক শাহরিয়ার। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রচ- বৃষ্টির মধ্যেও সবরকম সহযোগিতার মাধ্যমে জাতীয় নারী বেসবল টুর্নামেন্ট শেষ করেছি। কিন্তু এখনো দেড় লাখ টাকার মতো বকেয়া। ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই অর্থ পাচ্ছি না। ফলে খাবারের দোকান থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই আমি হেনস্তার শিকার হচ্ছি।’ তিনি যোগ করেন, ‘২০১৬ সালে বাংলাদেশ সুপার লিগ (বিএসএল) আয়োজনের সঙ্গে আমরা জড়িত ছিলাম। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে মেয়র কাপ আয়োজনের অভিজ্ঞতা রয়েছে আমাদের। কিন্তু বেসবল করতে গিয়েই এখন বিপদে আছি। উনাদের সমস্যার কারণে সামাজিকভাবে আমি ছোট হচ্ছি। যদিও এই বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে একটি অভিযোগও দিয়েছি আমি।’

ক্রীড়াঙ্গনের বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ধরনের ঘটনা দেশের উদীয়মান খেলাগুলোর জন্য বড় বাধা। বেসবল এখনো বাংলাদেশে জনপ্রিয়তা পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানে এমন আর্থিক বিশৃঙ্খলা খেলাটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ করতে পারে। এ বিষয়ে দ্রুত স্বচ্ছ তদন্ত ও নিরপেক্ষ অডিটের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট খেলোয়াড় ও সংগঠকরা। তাদের মতে, সঠিক হিসাব প্রকাশ করা হলে যেমন বিতর্কের অবসান ঘটবে, তেমনি ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত