কবি জীবনানন্দ দাশ অমোঘ মায়া ভরে লিখেছিলেন, ‘তোমার যেখানে সাধ চলে যাও, আমি এই বাংলার পারে রয়ে যাব’। কিন্তু আমরা পারলেই চলে যেতাম। চট্টগ্রাম শহরের কোনো একটা বিমানবন্দর থেকে এ রকম একটা আহ্বান যদি থাকত যে যারা বিদেশে চলে যেতে চাও তারা এখান থেকে প্লেনে উঠে উঠে চলে যেতে পারো, তা হলে পুরো বাংলাদেশ সম্ভবত খালি হয়ে যেত। জীবনানন্দ যেতে চাননি, কিন্তু আমরা যেতে চাই, কিন্তু যেতে পারছি না।
‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ থিমের ওপর লিখতে গিয়ে ওপরের প্রসঙ্গটি আনলাম। জীবনানন্দের প্রতিভূ কথক বাংলার প্রকৃতি, নাটোরের বনলতা সেনের পাখির নীড়ের মতো চোখ, বেতের ফলের মতো প্রেমিকার ম্লান মুখ, হরিণ আর দোয়েলের সখ্য, জ্যোৎস্না রাতে উঠোনে চাঁদের গভীর ছায়া, সমুদ্রের জলে দেহ ধুয়ে নিয়া প্রিয়ার আসার অপেক্ষায় থাকা এবং হাজার বছর ধরে পথ হেঁটে শেষ পর্যন্ত এই বাংলার নীড়ে আস্তানা গেড়ে বুঝে গিয়েছিলেন যে বাংলার রূপের মতো আর কোনো রূপ নেই। তার আগে কবিগুরু বাংলাদেশের রূপকে মায়ের মুখম-লের সঙ্গে তুলনা করে বলতে চেয়েছেন, মায়ের মুখ যেমন খাঁটি সোনার, দেশটিও খাঁটি সোনার।
কবিগুরু, জীবনানন্দ দাশ, জসীম উদ্দীন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের কবি, গীতিকার, লেখক, চিত্রকর, সবাই মিলে বাংলাদেশের প্রকৃতিকে নিবেদন করে তাদের কল্পনাশক্তি উজাড় করে দেশমাতৃকার যে অপরূপ চিত্রকল্প জনমানসে গেঁথে দিয়েছেন, সেটি নিয়ে আমরা পরম স্বস্তিতে থাকলেও, আমরা আটকা পড়ে যাই একটা জায়গায় : দেশ যত সুন্দর, দেশের অবস্থা ঠিক ততটাই অসুন্দর। ৫৫ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে অবস্থিত একটি ছোট ব-দ্বীপসম হিমালয় পর্বতের বিস্তৃত ঢালের একেবারে শেষ প্রান্তে বাংলাদেশ অসংখ্য নদী-বিধৌত একটি দেশ। লোকসংখ্যা ‘মাত্র’ আঠারো কোটি, পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ।
লোকে ভাত খায়, কিন্তু অত ভাত নেই। সংসারগুলোতে দারিদ্র্যের কশাঘাত বছরওয়ারী, কিন্তু বছরওয়ারী সন্তান উৎপাদনে ক্ষান্তি নেই। যুবক-যুবতীরা শিক্ষাগ্রহণ করে চাকরির দুনিয়াতে ঢুকতে চায়, কিন্তু তাদের জন্য চাকরি নেই। দেশটির প্রায় সবাই মুখে মুখে পাপ থেকে দূরে থাকার কথা বলে, পাপ কাজটাই সর্বাগ্রে করি। অর্থনৈতিক দুর্নীতির চর্চা করতে যেন এ জাতি বেহুঁশ। ছোট, মাঝারি, বড় দুর্নীতির জালের মধ্যে পুরো দেশটা আটকা। এ-রকম দ্বৈত-চরিত্রের দেশ পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না সন্দেহ। এ-রকম প্রেক্ষাপটে আমাদের কবি-লেখকদের দেশ নিয়ে উচ্চাশার একটি অর্থ সেটি হচ্ছে কাব্যিক দেশ, বাস্তবে নয়।
বাস্তবের ছবি একটু করে ওপরে দিয়েছি। কিন্তু কেন ‘বাংলাদেশের হৃদয় হতে’ শিরোনামটি চূড়ান্ত অর্থে একটি বক্রোক্তি সেটির ব্যাখ্যায় নামব। আমি প্রথমে টাকার কথাটা আনতে চাই। আমরা সবাই জানি টাকা জীবনের সবকিছু নয়। টাকার বিছানায় শুয়ে থাকলেও মানুষ সুখী হতে পারে না। এই কথাটির তলায়ও চরম একটি অসত্য লুকিয়ে আছে। সেটা হচ্ছে বাস্তবতাকে পরিহার করে মেকি সুখ আদায় করার চেষ্টা করা। একটু খোলাসা করি। আমার ব্যক্তিগত গাড়ির চালক তার শ্বশুর মারা যাওয়াতে ভোলায় তার দেশের বাড়িতে গেছে। আমি তাই রিকশায় করে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে প্রচন্ড তাপপ্রবাহের মধ্যে পড়লাম। চট্টগ্রামে গত কয়েকদিন কয়েকবার অঝোরধারায় বৃষ্টি হওয়ার পর সম্প্রতি রোদ ঝলমলে দিনের শুরু করেছে, এবং বর্তমানের তাপমাত্রা যেন হাতে ধরা যায় এ-রকম। চট্টগ্রামের রাস্তা মানেই চড়াই-উতরাই। মধ্যবয়স্ক হাড় জিরজিরে শরীরের রিকশাওয়ালার যে কী কষ্ট হচ্ছিল, সেটা দেখে আমার অন্তরাত্মা কেঁদে উঠল। তখন মনে পড়ল, সকালে বের হওয়ার আগে পত্রিকাগুলোতে চোখ বুলাবার সময় একটা শিরোনাম চোখে পড়েছিল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন। শিরোনামটি মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার মনের চিন্তার গতিপ্রকৃতি এ-রকম হলো যে এই ব্যক্তি রিকশাওয়ালা আসলে সিনেকডোকিক্যালি একজন রিকশাওয়ালা হলেও, সে কয়েক লাখ রিকশাওয়ালার প্রতিভূ, যাদের দিন গুজরান ও সংসার চলে তাদের নিঃসৃত গায়ের ঘাম দিয়ে। ‘জিরো টলারেন্সের’ আন্দালন তো সহসা এখানে থেকেই শুরু হতে পারে। উত্তরাধুনিক যন্ত্রায়িত রাষ্ট্রিক সমাজে তো পায়ে চালিত রিকশার কোনো জায়গা থাকবে না, এই ব্যবস্থা তো উন্নয়নকামী, পরিবর্তনকামী একটি সরকারের প্রধান এজেন্ডাগুলোর একটা হতেই পারে।
দ্বিতীয়ত, সিনেকডোকির কথা বলেছি। অর্থাৎ অংশ দিয়ে পুরোটাকে চিহ্নিত করা যায়। যেমন ধরুন বাংলাদেশের পর্যুদস্ত নারী সমাজের ওপর একজন সমাজচিন্তক কন্টেন্ট নির্মাতা নারী-ধর্ষণের ওপর একটি ছবি বানালেন। শো-টা শুরু হলেই প্রথম দৃশ্যে হয়তো দেখা গেল, একটি চোখের ওপর ক্লোজআপ, যেটির ভুরুর ওপরে কাটা দাগ। এই কাটা দাগটাই সিনেকডোকি, যেটা পরবর্তী দৃশ্যে যখন ধর্ষিত রমণীর মৃতদেহ দেখানো হবে, তখন বোঝা যাবে যে কাটা দাগটির সঙ্গে পুরো দেহটির কী সম্পর্ক। ধর্ষণ থেকে মৃত্যুবরণ করা একজন ধর্ষিত রমণীর করুণ কাহিনি।
রিকশাওয়ালাদের দারিদ্র্যের প্রতি যেমন জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে, তেমনি জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে বাংলাদেশের পর্যুদস্ত নারী সমাজের নিগৃহীত অবস্থানের ওপর। নারী জাগরণের পক্ষে সবচেয়ে সবলভাবে কথা বলেছিলেন কবি নজরুল। এবং তার ‘নারী’ শীর্ষক কবিতাটি যদি রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায় তা হলে নারী জাতিকে এই ছদ্মবেশী মহান রূপের আড়ালে আর অবমাননাকর জীবনযাপন করতে হবে না : ‘যে দেশে নারীরা বন্দিনী, আদরের নন্দিনী নয়,/ সে দেশে পুরুষ ভীরু কাপুরুষ জড় অচেতন রয়।’ আমরা পুরুষেরা নারীর ওপর যে স্টিমরোলার চালাই, তার কারণ, নজরুল ঠিকই বলছেন, আমরা কাপুরুষ বলে অফিসে বসের গালি খেলে বাসায় ফিরে বউয়ের গালে চড় বসিয়ে সে অপমানের ঝাল তুলি। আমার ধারণায় ছলে-বলে-কৌশলে এ-রকম প্রতারণাপূর্ণ স্বীকৃতির মাধ্যমে পুরো নারী জাতিকে অবসাদগ্রস্ত ও সৃজনক্ষমতাবিহীন করে তোলার পুরুষতান্ত্রিক পাকাপোক্ত সমাজব্যবস্থাকে প্রথমেই জিরো টলারেন্স দেখানো উচিত।
সিনেকডোকির তৃতীয় পর্যায় হচ্ছে দুর্নীতি। দুর্নীতি নিজস্ব গন্ডিতে অত্যন্ত সৃজনশীল একটি প্রক্রিয়া। কবি জন মিল্টন ‘প্যারাডাইস লস্ট’ লিখতে গিয়ে কোথায় ‘স্বর্গ হইতে বিদায়’ জাতীয় রাবীন্দ্রিক ধাঁচের একটি কবিতা লিখবেন, তা না। তিনি শয়তানের ধড়িবাজগিরির প্রতি আকর্ষিত হয়ে মহাকাব্যিক ছন্দে যেটি লিখলেন, সেটি হলো শয়তান প্রয়োজনীয় একটি উপস্থিতি। শয়তানকে তিনি ঈশ্বরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে খারিজ করে দিলেন না, বরঞ্চ দেখালেন যে মানবাত্মা হচ্ছে সুর-অসুরের মধ্যে যুদ্ধক্ষেত্র। একটা দৈবিক কাহিনিকে মিল্টন পুরোটাই মানুষের ভালোমন্দ বাছাই করার ক্ষমতার ওপর ছেড়ে দিলেন।
অর্থাৎ, মিল্টন মানুষের নৈতিক শক্তির ওপর জোর দিলেন। এখন গুরুতর প্রশ্নটা হলো এই নৈতিক শক্তিটা কোত্থেকে আসে? বিধিপ্রদত্ত, জন্মসূত্রে, নাকি পরিবেশগত! নাকি সবকিছু মিলিয়ে একজন মানুষ নৈতিকভাবে সৎ হয় অথবা হয় না। এই প্রশ্নটার কোনো একক উত্তর দেওয়া কঠিন। যেমন, যে ধর্ম নৈতিকতা শেখায়, সে ধর্মকে ব্যবহার করে অবৈধ উপার্জনের রাস্তার কথা সুবিদিত। নজরুল চিৎকার করে বলছেন, ‘মানুষেরে ঘৃণা করি’ / ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরিমরি।’ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র লালসালু উপন্যাসের ভ- পীর মজিদের মতো চরিত্র দেশের সর্বত্র মাজার, মসজিদে ছড়িয়ে আছে। শেক্সপিয়ার পন্ডিত স্টিফেন গ্রিনব্ল্যাট হালকা চালে বলেছেন, মুরিদ অগাধ বিশ্বাসে মন্দিরে গিয়ে অর্ঘ্য দান করে, আর সে অর্ঘ্য খেয়ে সংসার চলে পুরোহিতের।
তবে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় আকরক্ষেত্র বা মাইনফিল্ড হলো প্রশাসনে। প্রশাসনে অবৈধ উপায়ে উপার্জনের ক্ষেত্রে দুটি প্রিয় শব্দগুচ্ছ আছে। একটি হচ্ছে ‘বোটল নেক’, আরেকটি হচ্ছে, ‘স্যারকে একটু খুশি করিয়েন।’ এই দুটো হচ্ছে গ্রাউন্ড লেভেলে। ইচ্ছাকৃতভাবে যত বোটল নেক বা হরমুজ প্রণালির মতো ব্যারিকেড তৈরি করা হবে, তত অবৈধ উপায়ে উপার্জনের পথ প্রশস্ত হবে। কিন্তু আপার লেভেলের দুর্নীতির প্রক্রিয়াগুলো সাধিত হয় পারসেন্টেজের মাধ্যমে। যত বড় প্রজেক্ট, তত বড় কিক ব্যাক। হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি তো হচ্ছেই দেশে। এগুলোকে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর প্রয়োজন।
দেখানো প্রয়োজন, কিন্তু দেখানো সম্ভব কী!? এতক্ষণ আলোচনা করেছি কনসপেচুয়াল লেভেলে। কিন্তু অপারেশনাল লেভেলে কথা বললে দেখা যাবে, দিল্লি বহুত দূর। যে সমস্যার মুখোমুখি হয়ে মিল্টনের তার কাব্য রচনার ক্ষেত্রে নাভিশ্বাস উঠেছিল। কারণ সরিষায় ভূতের মতো অশুভ এত সুন্দর করে শুভের সঙ্গে মিশে থাকে যে অশুভ থেকে শুভকে ব্যবচ্ছেদ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ জন্য জিরো টলারেন্সের প্রত্যয় কার্যকর করতে বলা যত সহজ করা তত সহজ নয়। তারপরও আমার মনে হয় পরিবেশগতভাবে যদি একটি সৎ, সত্যনিষ্ঠ, সবল, সহজ কার্যকর অর্থনৈতিক শৃক্সক্ষলা বা জবাবদিহিমূলক সিস্টেম এই সরকার যদি দাঁড় করাতে পারে এবং দলমত নির্বিশেষে অবজেকটিভলি রাস্তা, যানবাহন, বাজার, ব্যাংকিং, সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে একটি আগাগোড়া শৃঙ্খলা বলবৎ রাখতে পারে এই সরকারের আমলেই জিরো টলারেন্স কার্যকর করা সম্ভব। আমরা আশাবাদী থাকলাম।
লেখক : অধ্যাপক ও সাহিত্যিক। ডিন, কলা অনুষদ, প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম
সাবেক উপাচার্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
৮/৫/২৬
