চীনে একখণ্ড বাংলাদেশ

আপডেট : ১১ মে ২০২৬, ১২:৫০ এএম

চীনের ইউনান প্রদেশ। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা কুনমিং শহর। এই দূর দেশে একদল চীনা তরুণ-তরুণীর কণ্ঠে যখন ধ্বনিত হয়—‘আমি বাংলায় গান গাই’, ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’, ‘এসো হে বৈশাখ’ কিংবা ‘চল চল চল, ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মা দল’, তখন আমার মন ভরে ওঠে আনন্দে। কুনমিং শহরে অবস্থিত ইউনান বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষার শিক্ষার্থী এই চীনা তরুণ-তরুণীরা। আমি তাদের বাংলাদেশি শিক্ষক। আমার কাজ এই শিক্ষার্থীদের বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে শিক্ষাদান করা। ওরা বাংলা ভাষায় ‘মেজর’ নিয়ে অনার্স করছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

চীনের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা বিভাগ রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে আমার শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে গভীরভাবে ভালোবেসেছি এ সময়ে। এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, প্রবাস থেকে বা দূরে থেকে আমি বাংলাদেশকে যতটা অনুভব করেছি, যতটা ভালোবেসেছি দেশের কৃষ্টি সংস্কৃতিকে, যতটা মধুর বলে মনে হয়েছে বাংলা ভাষাকে, ততটা দেশে বাস করার সময় হয়নি।

বাংলাদেশের যে সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সাহিত্য রয়েছে, এ বিষয়ে আমরা বাংলাদেশিরা কতজন বা কত শতাংশ পরিপূর্ণভাবে জানি?

সেই গঙ্গাহৃদি রাজ্য থেকে শুরু করে পুণ্ড্রবর্ধন, সোনাগড়া সভ্যতা বিষয়ে আমরা কতটা জ্ঞাত? বাংলার সন্তান বিজয় সিংহ ও রাজা লাকলোংয়ের ইতিহাস আমরা কতটা জানি? আমরা আমাদের অতীত, বাংলার গৌরবময় ইতিহাসকে ভালোবাসতে শিখিনি।

এই প্রবাসে যখন আমি আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে বাংলার জনপদগুলোর সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরি, তখন যেন নিজের দেশকেই দেখি দূর থেকে, সম্পূর্ণরূপে। যখন কোনো অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রিয় লাল-সবুজ পতাকা দেখি, শুনি—‘আমার সোনার বাংলা’ তখন চোখ ভিজে ওঠে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন চীন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগ রয়েছে বা চীনের তরুণ শিক্ষার্থীরা কেন বাংলা ভাষা শিখছে। জবাবে বলা যায়, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বা বাঙালির সম্পর্ক তো আজকে নতুন নয়। সেই ফাহিয়েন, হিউয়েন সাং, মীননাথ, কাহ্নপা, অতীশ দীপঙ্করের সময় থেকে চীন ও বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময় রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়িক ও সাস্কৃতিক যোগাযোগ বেড়েছে। চীনের অনেক নাগরিক চাকরি, ব্যবসাসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে বসবাস করছেন। বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। দুই দেশের সম্পর্ককে সুদৃঢ় করার জন্যই প্রয়োজন পরস্পরের ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানা। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ রয়েছে। চীনের ইউনান, ইউনান মিনজু, কুয়াংতোং, বেইজিং, চীন যোগাযোগ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফরেন স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা বিভাগ রয়েছে।

চীন বিশাল দেশ। সেই তুলনায় বাংলাদেশের ভৌগোলিক আয়তন খুবই কম। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় বিশাল। আতিথেয়তার যে ঐতিহ্য আমাদের রয়েছে, বিদেশি বন্ধুর প্রতি যে অকৃত্রিম ভালোবাসা আমাদের রয়েছে, তাতে চীনের মানুষের মধ্যে যারাই বাংলাদেশিদের সংস্পর্শে এসেছেন, তারাই মুগ্ধ হয়েছেন।

বাংলা ভাষার শিক্ষকের এ ভূমিকার পেছনে আমার কিছু ব্যক্তিগত আবেগও আছে বৈকি। এ যেন আমার পূর্ব প্রজন্মের প্রতি এক ধরনের দায়বদ্ধতা ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা। আমার দাদা (পিতামহ) বহুভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষা আন্দোলনের প্রথম ও প্রধান উদগাতা ছিলেন। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবিতে তিনি একের পর এক প্রবন্ধ লিখেছেন, বুদ্ধিবৃত্তিক ও দার্শনিক সংগ্রাম চালিয়েছেন। তিনি ছিলেন মাতৃভাষার মহান সেবক।

আমার বাবা কমরেড মুহম্মদ তকীয়ূল্লাহ বাংলা বর্ষপঞ্জির সংস্কারক এবং ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের কর্মী ও সংগঠক। ভাষা আন্দোলনের জন্য তিনি ত্যাগ করেছিলেন সেনাবাহিনীর কমিশনড অফিসার হিসেবে তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎকে। তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রথম আলোকচিত্রী। তিনি ভাষা আন্দোলনের জন্য কারাবরণ করেছেন। এবং মাতৃভাষা ও মাতৃভূমির সেবায় জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।

আমি যখন আমার ছাত্রছাত্রীদের বাংলা ভাষায় পাঠ দেওয়া শুরু করি, বিশেষ করে যখন ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস তাদের বলি, তখন আবেগে আমার চোখ প্রায়ই ভিজে আসে। বাবার কথা সবচেয়ে বেশি মনে পড়তে থাকে। মনে মনে ভাবি—আহা! বাবা যদি জানতেন, আমি এই বিদেশে বসে তারই জীবনব্যাপী সাধনার ঐতিহ্যকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছি, তিনি অবশ্যই আমাকে আশীর্বাদ করতেন।

আমার ছাত্রছাত্রীদের কাছে যখন আমি বাংলাদেশের সংস্কৃতির কথা বলি, যখন ওদের শোনাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, লালন, জীবনানন্দের কবিতা, চর্যাপদের কথা, তখন ওরা বিস্ময়ে বিমুগ্ধ হয়। ওরা বাংলাদেশের প্রকৃতি আর সংস্কৃতির কথা শুনে, চলচ্চিত্র দেখে মুগ্ধ। সুন্দরবন, শ্রীমঙ্গল, কক্সবাজার, পাহাড়পুর, মহাস্থানগড়, লালবাগের কেল্লা, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিনের কথা জেনে তারা এসব দেখতে চায়। ওরা ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে গায়—‘আমার পরাণ যাহা চায়’, ‘এসো হে বৈশাখ, ‘আলো আমার আলো’, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি’, ‘তীরহারা এই ঢেউয়ের সাগর’।

কুনমিং শহরে বাংলাদেশের কনস্যুলেট রয়েছে। আমাদের বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আমার ছেলেমেয়েরা সেখানে গান, কবিতা পরিবেশন করে। ওরা বাংলাদেশকে ভালোবাসে, ভালোবাসে বাংলা ভাষাকে। বিশে^ বাংলাই একমাত্র ভাষা, যার মর্যাদা রক্ষায় প্রাণ দিয়েছে বাংলামায়ের সন্তানরা। কে বলে আমার বর্ণমালা দুঃখিনী? বাংলার মতো সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংগ্রামী ইতিহাস আর কোন ভাষার রয়েছে?

যতই পরাধীনতার আমলে শাসকের রাজভাষা হোক সংস্কৃত, ফারসি, ইংরেজি, উর্দু। ব্রাত্যজনের ভাষা, প্রাকৃতজনের ভাষা বাংলাকে কি গণমানুষের কবিরা অমর করে রাখেননি? এ ভূখণ্ডের মানুষ যুগে যুগে বাংলাভাষা রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছে, মুখের ভাষায়, সাহিত্যে ও লোকসাহিত্যে তাকে অমর করে রেখেছে।

মাতৃভাষার প্রতি এত ভালোবাসা আর কাদের রয়েছে? বাংলাভাষা বিশে^র মধুরতম ভাষা। এ ভাষার ধ্বনি ঝংকারে বিদেশিরাও মুগ্ধ। এই ইতিহাসে এবং বাংলা ভাষার মধুর ধ্বনিতে চীনা তরুণ-তরুণীরাও মুগ্ধ হচ্ছে। সেই সুদূর প্রবাসে আমি যখন ওদের বাংলা ভাষায় পাঠ দিই, তখন অদ্ভুত ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। মনে হয়, শ্রেণিকক্ষে যেন অদৃশ্য হয়ে উপস্থিত আছেন ভাষাশহীদরা, ভাষাসৈনিকরা। ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বলার সময় মনে হয় বাবা অদৃশ্যলোক থেকে আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছেন। তার স্নেহময় কণ্ঠস্বর যেন শুনতে পাই বাংলা ভাষার শব্দ উচ্চারণের মধ্যে। দেখতে পাই সালাম, রফিক, বরকতসহ ভাষাশহীদদের। যখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বলি, দেখতে পাই বীরশ্রেষ্ঠদের, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের।

পিতা, পিতামহ আরও দূর পূর্বপ্রজন্মের মানুষের কণ্ঠে শুনতে পাই পুঁথিপাঠ, মনসার গীত, লক্ষ্মীর পাঁচালী, গাজন, গম্ভীরা, ভেলুয়া, মলুয়ার কাহিনিকাব্য। আমার সুজলা, সুফলা সোনার বাংলার রূপ যখন ওদের তরুণ দৃষ্টিকে মুগ্ধ করে, তখন আমিও নিজের চিরচেনা দেশকে দেখি নতুন দর্পণে। শহীদ মিনার, স্মৃতিসৌধের ছবির দিকে তাকিয়ে আমারও চোখ সজল হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের কোনো সংবাদ যখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়, তখন মনের মধ্যে আলাদা অনুভূতি সৃষ্টি হয়। তবে দুঃখজনক হলো—বেশিরভাগ সময় নেতিবাচক ঘটনাই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে। তবে আমি চিরদিন আশাবাদী। আমি আশা করি, বাংলাদেশ সব দুঃখ, সংকট, প্রতিকূলতা জয় করে বিশে^ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। আবার আমরা সংবাদের শিরোনাম হব ভালো কিছু অর্জনের জন্য, সাফল্যের জন্য।

বাংলাদেশকে দুর্নীতিমুক্ত করাকে নতুন সরকারের সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। আমাদের দেশের সম্পদ আছে। কিন্তু সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও সুষম বণ্টন নেই। আমাদের মানবসম্পদ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দেশের অর্থনীতিকে মজবুত করা দরকার। দরিদ্র দেশের মানুষের

কোথাও সম্মান নেই—এটাই বাস্তব সত্য। আমাদের সবুজ পাসপোর্ট যেন বিদেশে সম্মান পায় তার জন্য বাংলাদেশের সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। পাশাপাশি দেশের মানুষেরও এমনভাবে কাজ করা উচিত যেন, বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়। আমাদের হৃদয়ে বাংলাদেশের মুখ নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হোক। বাংলাদেশ বিশে^ গৌরবের আসনে আসীন হোক।

লেখক : কবি ও শিক্ষক, ইউননান বিশ্ববিদ্যালয়, চীন

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত