মানুষের মাতৃভূমিপ্রেম কতটা প্রাকৃতিক মনে হয়? একজন সচেতন মানুষকে যেকোনো উৎস বিষয়ক ভাবনা আকৃষ্ট করে। উৎসের প্রতি আগ্রহ তাকে ‘ধারা’ সম্পর্কেও ধারণা দেয়, সচেতন রাখে; কোন পথে সে প্রবাহিত, কোথায় তার প্রতিবন্ধকতা ও সীমাবদ্ধতা, কোথায় তাকে পৌঁছাতে হবে এসব কিছু সে তার চিন্তার আয়ত্তের ভেতর রাখতে তখন বাধ্য। মনে সারাক্ষণ প্রশ্ন জাগে। উত্তরগুলো প্রথমত ব্যক্তিগত। দ্বিতীয় সামষ্টিক। যে উৎসকে জানে, ধারাকে বোঝে, সে যেকোনো প্রশ্নের ব্যক্তিগত উত্তরের কাছাকাছি যেতে পারে। যে তার উৎস জানে না, ধারা নির্ণয় করতে অক্ষম, তার চিন্তা, স্বপ্ন ও পরিকল্পনাকে ওপরচালাকি দিয়ে বদলে দেওয়া যায়। কোনো জাতিকে দুঃশাসন ও শোষণ করতে হলে এ কারণেই সবার আগে তার ইতিহাস, ভাষা ও গল্পগুলো মুছে দেওয়া হয়। মানুষ যখন তার ব্যক্তিগত উত্তরের কাছে যেতে পারে না, সমষ্টির উত্তরের কাছে যাওয়ার সিঁড়িও খুঁজে পায় না। এই মাটি থেকে কীভাবে সে নির্মিত, তা সে যখন ভেবে পায় না, সচেতন থাকে না, তার কাজ ও চিন্তাকে যখন তা প্রভাবিত করে না, তখন মাতৃভূমির সামষ্টিক ছবি সে দেখে ঠিকই কিন্তু বুঝতে পারে না। লোকমুখে শোনে তার কথা, হয়তো ভালোও লাগে, কিন্তু তার সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন করতে পারে না। এর অর্থ এই আত্মীয়তার সংস্থাপন এক ধরনের স্থাপত্য কৌশল। মাতৃপ্রেম প্রাকৃতিক, কিন্তু মাটিতে মাতৃসত্তা দেখার বোধ তৈরি করা, মাতৃভূমিপ্রেম সৃষ্টি করা এসব নির্মাণনির্ভর, শিল্পের মতো।
আমরা বাংলাকে কেন ভালোবাসব। বাঙলার মাটিতে জন্মেছি যখন, ভালোবাসা ব্যক্ত করার মন তৈরি হয়নি, ভাষাও ছিল না। তবু বাংলা বারবার আমার প্রাণের রসদ নিয়ে যখন সামনে এসেছে, বেঁচে থাকার স্বার্থে তা গ্রহণ করেছি, তখন সচেতনে ও অবচেতনে তার সঙ্গে আমার অস্তিত্বের বাঁধা শর্তগুলো অনুভব করতে পারলাম। অবোধ সন্তানও মাকে শৈশবে কেন কাছে চায়। মায়ের কাছে তার খাদ্য, মায়ের দরদের সামনে তার অপরিণত মনের অনুরক্ত হওয়ার ক্ষুধা যেন মেটে। ভাষা নেই তার বোঝাতে পারে না। অনুভবে ধরা পড়ে। কখনো আনন্দ রূপে ব্যক্ত হয়, কখনো স্বস্তিরূপে। শিশু যখন ক্রমে বড় হয়, তার ভেতর যৌনতার বোধ জন্মে, তখন অনেক অনুভূতি, আবেগ তার শেকড় খুঁজে পায়। যৌনতা বিষয়টি আমাদের সমাজে অবমূল্যায়িত হয়। এর ভূমিকা কেবল বংশগতির তাড়না সৃষ্টিতেই সীমাবদ্ধ না। যৌনতাবোধ আত্মীয়তার বোধ জাগায়, দরদকে নতুন মাত্রা দেয়, সমানুভূতি তৈরি করে, বিশৃঙ্খল প্রেমকে সুশৃঙ্খলা দেয়। এমনকি মাতৃপ্রেমও বিকশিত যৌনতাবোধের কাছে ঋণী। মানুষ যখন মা কিংবা বাবা হওয়ার যোগ্যতাসূচক বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে শুরু করে, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে জগতের প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে থাকে। আমরা প্রায়ই পশুপাখিদের সঙ্গে শিশুদের অত্যন্ত নিষ্ঠুর আচরণ করতে দেখি, যখন এমনকি নিষ্ঠুরতা সম্পর্কেও তারা সচেতন থাকে না। তাদের আচরণে তখনই প্রথম কোমলতা আসতে শুরু করে, যখন প্রথম যৌনতাবোধ জাগে এবং বিকশিত হতে থাকে। সে তখন রূপ বুঝতে পারে, তাই রূপকও বুঝতে শেখে। বিষয়টি মাতৃভূমিপ্রেমের সঙ্গেও সংযুক্ত।
বিকশিত যৌনতাবোধের ভূমিকা আধ্যাত্মিকতাতেও প্রবল। চিন্তা পাশব স্তর থেকে প্রেমজ স্তরে উন্নীত হয়। এই উন্নয়ন যার যত ভালোভাবে ঘটে, নিষ্কাম প্রেমের জগৎ, রূপকের জগৎ সে তত ভালো বুঝতে পারে। যার ভেতর এই বোধ বিকশিত হতে পারে না, অবদমিত হয়ে থাকে, সেই মানুষটি প্রায় সমস্ত বুদ্ধিজাত, বোঝাপড়াজাত উপহার থেকে বঞ্চিত থেকে সংকীর্ণতার ভেতর জীবন কাটিয়ে দেয়। তার বোধ ও বুদ্ধির সব স্তরে এই সংকীর্ণতা কাজ করতে থাকে। ঈশ্বরকে সে শুধু আচারনিষ্ঠার ভেতর বেঁধে ফেলে কষ্ট দিতে থাকে। ফলে অভিশাপই কুড়ায়, উপহার পায় না। পুণ্য তার কাছে পুণ্যাহ। শর্ত আর বিনিময়ে বাঁধা বিকৃত এক আধ্যাত্মিক দুরবস্থা। তখন মাতৃপ্রেম সে কিছুটা বুঝতে পারে, প্রবৃত্তির দিক থেকে, দর্শনের অংশ থেকে নয়। দার্শনিক স্তরে মাতৃভূমিপ্রেমের স্বরূপ সে পুরো ধরতে অক্ষম থেকে যায়। সময়ের শুদ্ধ-অশুদ্ধ গোলমাল করে ফেলে। শুচিতার অংশ হিসেবে সে মানুষের রক্তে স্নান করতে তার বাধবে না।
অঙ্গজ বংশবৃদ্ধি হয় যেসব প্রাণীর মধ্যে, তাদের ভেতর কি ‘প্রেম’ জাগার অবকাশ থাকছে? রূপ ও রূপকের সম্পর্ক বা বিভাজন বোঝার মতো জটিল বুদ্ধিমত্তা তাদের নেই, কিন্তু অপর একটা কিছু আছে। ধারা আছে। বুদ্ধিমত্তা সব প্রাণীতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার ভেতর লুকিয়ে নেই। বিপুল সংখ্যক প্রাণীর ভেতর এটা ধারা হিসেবে বজায় থাকে। সুতরাং তাদের ভেতরও বোধের বিচিত্র কোনো মাত্রা রয়েছে। অকল্পনীয় কোনো পথে তারা গন্তব্যে পৌঁছায়। একটি এক কোষী প্রাণও যখন অনুকূল পরিবেশের মুখাপেক্ষী, তখন বলতেই হয় ‘দেশবোধ’ তারও আছে। এক কোষী থেকে বহুকোষী মানুষে আসি। একসময় ‘বাংলা’ ছিল না, আজ আছে। ‘বাংলা’ একসময় থাকবে না, কিন্তু মানুষের এই দেশবোধ থাকবে। আগে বোধ, পরে প্রেম। দেশবোধ থাকলে, দেশপ্রেম থাকবে। এই প্রেম তখন অপর কোনো পাত্র বেছে নেবে। এই মুহূর্তে আমাদের সেই পাত্রের নাম বাংলা। ‘বাংলা’ নাম লিখিয়েছে ভূরাজনীতির দ্বৈরথে। এক বাংলা বাংলাদেশ নামে সীমানা দিয়েছে। সেখানে এমন অংশও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যারা আদিতে বাংলায় ছিল না। অপর বাংলা ভারতে সীমান্তবদ্ধ হয়েছে। সেখানে বাংলার মতোই আরও অনেক মায়ের আঁচলের কোলাজ। এমন রয়েছে পাকিস্তানেও, শ্রীলঙ্কাতেও। চীন কেন নয়? রাশিয়া? যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য? লাতিন আমেরিকা? আফ্রিকা? আধুনিক ‘দেশ’ ধারণায় আঁচলের ‘কোলাজ’ থাকবে, পূর্ণ আঁচল থাকবে না। আঁচলই তো অঞ্চল। পূর্ণ অঞ্চল যদি থাকে, সে ভয়ার্ততা ও ক্ষুধার্ততা থেকে জন্ম দিয়ে বসে আঞ্চলিকতা। ভূরাজনৈতিক মানচিত্রের কৃত্রিমতা এসব কোলাজের দিকে তাকালে মুহূর্তে ধরা পড়ে।
কিন্তু শাসন চালিয়ে যেতে কৃত্রিমতার ভাঁজ, রেখাগুলোকে আড়াল করতে হবে। তাই নতুন ‘দেশ’ ভিত্তিক মাকে ডাকা হতে থাকল। সন্তানরা আজ এমনই মাতৃপ্রেমী, মা তাদের ডাকে সাড়া না দিলেও, সাড়া সে কল্পনা করে নেয়। মানুষের আবার কল্পনাশক্তি প্রবল। ফলে জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেমবাদের ধারণা সৃষ্টি করে ওই কল্পশক্তিকে যুদ্ধাস্ত্রে রূপ দেওয়া হলো। আগে চেতনা, তারপর চালনা। আগে চেতনাকে যুদ্ধাস্ত্র বানানো হয়, এরপর হাতে উঠল মারণাস্ত্র। শিল্পেরও আছে অন্ধকার দিক। শৈল্পিক নিয়মতান্ত্রিকতায় তৈরি হলো কাঠামোবাদী শহীদতত্ত্ব। কোনো না কোনো রাষ্ট্রের ছত্রছায়ায়। যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদ কোনো না কোনো রাষ্ট্রের ছত্রছায়া গ্রহণ করে। পার্থক্য, বিশেষ কাঠামোর মাধ্যমে তারা কখনো দায় নেয়, কখনো নেয় না।
পৃথিবীতে জনযুদ্ধ ছাড়া বাকি যুদ্ধগুলো এত অপবিত্র, অন্যায্য, বাহুল্য। আলাদা ভূখণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে দুই বাংলার সহজ মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়েছে; দুই পাঞ্জাবেরও, দুই কাশ্মিরেরও, পৃথক অথচ হৃদয়ে একীভূত দুই তামিল ভূখণ্ডেরও। সারা পৃথিবীতে এমন উদাহরণের শেষ নেই। ‘গণ’ সবচেয়ে শক্তিশালী চলক ও চালক। কাঠামোবাদ তাদের যতই পৃথক রাখার চেষ্টা করবে, গণ সবসময় তার স্বকীয় সমাজনীতিতে চলবে। তার স্বকীয় সমাজনীতি হলো গোষ্ঠীর ভেতর শখ ও সাহসের ভারসাম্য রাখা। রাষ্ট্র ‘গণের’ অন্তর ক্রমাগত প্রচারণায় বিষিয়ে না তুললে শখ ও সাহসের উপলক্ষগুলোয় ভূ-রাজনৈতিক সীমারেখাগুলো অদৃশ্য হয়ে যায়। তখন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নিউক্লিয়ার বিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। তা ভাষায়, পোশাকে, প্রয়োজনে, বিনোদনে সর্বত্র এই বিক্রিয়ার প্রভাব প্রকাশ পায়। এটা গণের গোষ্ঠীনীতি পালন করার ফল। এই ফলের ভেতর থাকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বীজ। সেই বীজ তেজস্ক্রিয়। সীমান্তের এপারে থেকে, পৃথিবীর অপর পাশে থেকে, সেই তেজস্ক্রিয়তা বিক্রিয়ায় প্রত্যেক মানুষ বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হই। তাই পরোক্ষভাবে দুই বাংলার, দুই পাঞ্জাবের, দুই কাশ্মীরের, দুই তামিল ভূখণ্ডের মুখ দেখাদেখি কখনো বন্ধ হয় না, এবং ভূ-রাজনৈতিক দেশপ্রেমবাদের সিডেটিভ খাইয়ে, ঘোষিত ভূখণ্ডে সংখ্যালঘু জাতি-গোষ্ঠীর দেশভাবনাকে; এই বাংলায় অবাঙালি, পাহাড়িদের নিজস্ব ন্যায্য দেশপ্রেমবোধকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায় না।
বাংলাদেশ ও বাংলা প্রসঙ্গে আসি। বাংলাদেশ সবার দেশ, তবে ‘বাংলা’ বিশেষ। যা সমসাময়িক তা সাময়িক। বর্তমান বাংলাদেশের মুখ তাই অনেক মায়ের মুখচ্ছবি মিলে তৈরি একটি মুখ। সব মা সাম্যে, স্বীকৃতিতে সম হোন। সব মায়ের সন্তানেরা যার যার রেনেসাঁর পথ কেটে আনুক। বাংলায় চাই দ্বিতীয় রেনেসাঁ। সমতল ও পাহাড়ের অপরাপর জনজাতির সন্তানেরা তাদের রেনেসাঁ পথ কেটে আনুক। মানবজাতি জ্ঞান বিনিময়ে তার শ্রেষ্ঠ সময় অতিক্রম করছে। পৃথিবী গ্রহ হিসেবে তার স্বর্ণালি সময় অতিক্রম করছে।
তবে ‘জগতের সকল প্রাণী সুখের হোক’—এই আশাবাদ যাদের কাছে অলীক মনে হয়, তারা এই রেনেসাঁ ডেকে আনতে পারবে না। আশাবাদ হলো শক্তির কাছে প্রত্যাশা। শক্তি রূপান্তরযোগ্য। শক্তি ধারণনির্ভর, প্রয়োগনির্ভর। আশাবাদ জলের মতো তার আকৃতি পরিবর্তন করে, কিন্তু ধর্ম বদলায় না। আশীর্বাদ এমন কোনো রুটি নয় যে সমান টুকরো করে সবার মাঝে ভাগ করে দিলাম, সবার ক্ষুধা সমানভাবে মিটে গেল। দেহ সমান বড় নয় সবার, প্রয়োজনও সমান নয় এবং জোগান অসীম নয়। তাহলে এই আশাবাদে কী বোঝায়। এই আশাবাদ একই সঙ্গে একটি প্রত্যয়। বোঝায়, সবার প্রয়োজন বোঝার, কাজ করে যাওয়ার এই মহা-অভিযানে, মহাযানে আরোহণে, আমি সম্মত আছি।
প্রতিটি আশাবাদ আজ্ঞার সঙ্গে যুক্ত। সাম্য প্রাকৃতিক। তাই সাম্যের আজ্ঞাবহরা আশীর্বাদযুক্ত। পরিবারের কর্তা কিংবা কর্ত্রী যেমন একার জন্য ভাবেন না, সুসন্তান যেমন একার জন্য ভাবে না, তেমনই প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য ভাবার মতো এমন পারিবারিক সংযোগ তৈরি করবে—এটাই প্রকৃতির আজ্ঞা। এই পর্যায়ে প্রতি-অস্তিত্ববাদী একটি বিষয় নিয়ে কিছু বলার মতো পরিবেশ খানিকটা তৈরি হয়েছে।
অস্তিত্বের লক্ষ্য কী? প্রকৃতি কী? মহাবিশ্ব কি ‘কিছু না-থাকার’ চেয়ে ‘আছে’? প্রশ্নগুলো মানব-অস্তিত্ব ও দেশপ্রেম, ধর্মবোধের ধারণার সঙ্গে যুক্ত। অস্তিত্ববাদ অনুসারে ‘অস্তিত্বের লক্ষ্য নেই’ এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। অস্তিত্ববাদী দর্শন কিন্তু এখানেই আলাপ শেষ করে দেয় না। অস্তিত্ববাদী দার্শনিকরা এখান থেকে আরেকটি বিশেষ তাড়নার দিকে মানুষের শক্তিকে চালিত করতে চান। লক্ষ্য নেই, বেশ, লক্ষ্য আরোপ করো। অর্থ নেই, বেশ অর্থ আরোপ করো। অস্তিত্ববাদের মূল যাত্রা এখান থেকে শুরু। ‘ঈশ্বর দেখছে? বেশ গিভ হিম আ গুড শো।’ দেখা যাচ্ছে অস্তিত্বের লক্ষ্য নেই এই বোঝাপড়া ঘুরপথে জীবনবাদী করে তুলছে।
‘স্রষ্টাতত্ত্ব’ মানুষের সৃষ্টি। তবু গড় মানুষের মনে কেন এই কথা এলো, অস্তিত্বের কারণ স্রষ্টার কাছে আত্মসমর্পণ, স্রষ্টার উপাসনা? ‘স্রষ্টা’ তো উপাসনার মুখাপেক্ষী নন। তবু এই সমর্পণ, এই উপাসনার উপলক্ষ হিসেবে অস্তিত্বকে দাঁড় করানো কেন? মানুষের প্রাচীন এই গড় প্রবণতার পেছনে ধারার ভূমিকা আছে। স্রষ্টা আছেন কি নেই এই প্রশ্ন বুদ্ধ অবান্তর ঘোষণা করেছেন, কিন্তু ধারা বুঝতে চেয়েছেন তিনি, গন্তব্য নির্ধারণ করেছেন ‘সুখের’ দিকে, ‘নির্বাণের’ দিকে। গড় মানুষ ভেবেছে সমর্পণে সুখ। সমর্পণে কেউ কেউ সুখী হতে পারেন, সবাই নন। যারা পারেন ও যারা পারেন না উভয়েরই একটি প্রবণতায় মিল রয়েছে। এই প্রবণতার কাছেই অস্তিত্বের লক্ষ্য বাঁধা। এই প্রবণতা, বন্ধন সৃষ্টির প্রবণতা। নিজের বিশ্লিষ্ট সত্তাগুলোর সঙ্গে এবং অপরের সঙ্গে। অস্তিত্বের উদ্দেশ্য বন্ধন সৃষ্টি করা। অস্তিত্বের উদ্দেশ্য বন্ধন বজায় রাখা।
মস্তিষ্কের ভূমিকা কী। সারাজীবনে আমরা এর সামান্য অংশ ব্যবহার করি। অব্যবহৃত একটি বিপুল অংশ তবু কেন আছে। সেটুকু কি অর্থহীন? প্রকৃতি কী চায়? চায়, সংযোগ। মানুষ গভীর মহাবিশে^ যেতে চাইছে। কীসের তাড়নায়?
অস্তিত্বের লক্ষ্য এই সংযোগ। ‘গণ’ মানুষ সবচেয়ে শক্তিশালী এই সংযোগের যুগে। অণুজীব থেকে মহাকায় প্রত্যেকে সংযোগ তৈরি করছে। সংযোগই সক্ষমতা। সংযোগই স্ব-ক্ষমতা।
এই সংযোগের সঙ্গে মাতৃভূমি ও দেশের ধারণা, এমনকি দেশপ্রেমবোধ সম্পর্কিত। বিষয়গুলো আপেক্ষিক, সুতরাং সংযোগের ধরনের সঙ্গে এরা সমানুপাতে বা ব্যস্তানুপাতে বদলায়। পরিবর্তিত পরিসরে মাতৃভূমির আয়তন বদলে যায়। মানুষ যত বড় পরিসরে যায় মাতৃভূমি তত বড় হয়। পৃথিবীর সাপেক্ষে বাংলাদেশ মাতৃভূমি। মহাবিশে^র সাপেক্ষে পৃথিবী মাতৃভূমি। লানিয়াকিয়ার সাপেক্ষে আকাশগঙ্গা মাতৃভূমি। এ বাড়তেই থাকবে এবং প্রমাণিত হতে থাকবে, মহাবিশে^র সন্তানরা এরই মাঝে সংযুক্ত।
এই একার্ণব যুগে, বিদ্যায় বুদ্ধিতে সম্পদে মিত্রতা ও শত্রুতার ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ায় গোটা বিশ্ব যখন এক ও অভিন্ন মহাসাগরের মতোন, তখন, মাতৃভূমি সম্বোধিত হবে বলে মা-পৃথিবী বাংলার সন্তানের দিকে তাকিয়ে আছে। যে বাংলা আপেক্ষিক, সেই বাংলা নয়, বরং যে বাংলা চিরকালের, যার অবস্থান বাংলাদেশ কিংবা ভারত-সীমান্তের ওপর নির্ভর করে না, যে বাংলা মানসিক, সেই চিরায়ত বাংলার মুখচ্ছবি বাদ দিয়ে পৃথিবীর মুখচ্ছবি তৈরি হয়নি। এবং চিরকালীন বাংলার মুখ পৃথিবীরই পরিচয় বহনকারী। বাংলাপ্রেম তাই পৃথিবীপ্রেমেরও নাম। এ কথা আজ বোঝা যত সহজ, মানুষের এই সুবর্ণ যুগ আসার আগে, বোঝা এতটা সহজসাধ্য ছিল না। আজকের বাংলা মা শুধু বাঙালি ছেলেমেয়ের মা নন। বাংলার মুখ দর্শনের জন্য, বিশ্ব, তুমি এসো। সংযুক্ত হও। এবং সংযুক্ত হতে এসে জানবে, এরই মাঝে তোমরা সংযুক্ত। বাংলার মানুষ, বিশ্বের আহ্বানে সাড়া দিন, সংযুক্ত হন। এবং সংযুক্ত হতে গিয়ে জানবেন, সবাই এরই মাঝে সংযুক্ত। যখন একার্ণব যুগ ছিল না, গোটা বিশ্ব এক ও অভিন্ন বিশ্বগ্রামে একাকার ছিল না, তখনো তারা সংযুক্ত ছিল। যে ইংরেজ, যে আরব, যে আফ্রো, বাংলার মুখ তারও এবং বিপরীতক্রমটিও সত্য।
মাতৃভূমিপ্রেম একই সঙ্গে বিশেষ্য ও ক্রিয়া। যেখানে ক্রিয়া, সেখানে সে এক যাত্রার নাম। বিন্দু থেকে সিন্ধুযাত্রা এবং সিন্ধু থেকে বিন্দু যাত্রা। উভমুখী, সরল ছন্দিত যাত্রা। খণ্ডিত বা কোনো বিশেষ সীমান্তবদ্ধ ভূগোলপ্রেম এই যাত্রার সামান্য পথ পেরিয়ে ফিরে আসার মতো।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সংবাদকর্মী
