কেউ গৃহিণী, কেউ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সন্তানদের ছোটবেলাতেই মারা যান কারও কারও স্বামী। অতল গহ্বরে পড়েন মা। কিন্তু শত প্রতিকূলতাতেও ভেঙে পড়েননি। জীবনে নানা সমস্যা মোকাবিলা করে সুশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন সন্তানকে। তাদের একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুগোপযোগী করে তুলেছেন। বাবাকে ছাড়া সংসারের নানা টানাপড়েনের মধ্যে বড় হওয়া সন্তানরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজে আলো ছড়াচ্ছেন। সন্তানদের কেউ হয়েছেন ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ডাক্তার, কেউ পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বড় কর্মকর্তা। দেশ-বিদেশে তাদের খ্যাতি। তারা দেশের ‘রত্ন’ হিসেবে পরিচিত। আর যিনি নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে রত্ন হিসেবে গড়ে তুলেছেন, সেই মায়ের গর্ভই সত্যিকারের রত্নভান্ডার। রত্নাগর্ভা এমন ৩৫ মাকে দেওয়া হয়েছে রত্নগর্ভা সম্মাননা। বিশ্ব মা দিবস উপলক্ষে এই সম্মাননা দিয়েছে আজাদ প্রোডাক্টস। এ উপলক্ষে গতকাল সোমবার ঢাকা ক্লাবের স্যামসন এইচ চৌধুরী মিলনায়তনে আয়োজন করা হয় ‘রত্নগর্ভা মা ২০২৫’ অনুষ্ঠানের। আজাদ প্রোডাক্টস ২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছরই সফল মায়েদের এ সম্মাননা দিয়ে আসছে।
গতকাল অনুষ্ঠান শুরু হয় গুণী শিল্পীদের ‘মা’ গান দিয়ে। এ সময় গান গাইতে গিয়ে ও মা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন শিল্পীরাও। এ বছর সাধারণ বিভাগে ২৫ জন আর বিশেষ বিভাগে ১০ জন মা সম্মাননা পেয়েছেন।
সাধারণ বিভাগে রত্নগর্ভা সম্মাননা পাওয়া মায়েরা হলেন তওহীদা ফারুকী বেগম, শাহানা পারভীন লিটা, হাসনা হেনা বেগম, রাজিয়া আক্তার, ফাতেমা বেগম, ফেরদৌসী ইসলাম, তাহমিনা বেগম চৌধুরী, আয়েশা আক্তার, সাহিনা বেগম, খায়রুন নেছা আক্তার, কানিজ ফাতেমা, জান্নাতুন নাহার, কামনা রানী ঘোষ, মোসাম্মাৎ ফিরোজা বেগম, হাসনারা বেগম, রাশিদা বেগম, মোসা. রহিমা বেগম, রেহানা বেগম, হামিদা বেগম, রোকেয়া বেগম, আক্তার খাতুন, রোকেয়া বেগম, অরুনা রানী সরকার, নাসরিন সুলতানা ও রীনা রানী সাহা।
বিশেষ বিভাগে সম্মাননা পেয়েছেন রীতা সেন, হোসনে আরা বেগম, রাহেনা আক্তার খানম, জহুরা খাতুন, অনুভা ঘোষ, রেজিয়া বেগম, খোরশেদা বেগম, রীনা বেগম, শেফালী বেগম ও মাহবুবা ফারুক।
এবারের রত্নগর্ভা মায়েদের একজন রেজিয়া বেগম। প্রত্যন্ত দ্বীপ সন্দ্বীপের এই মা নিজে প্রাথমিকের পর আর পড়তে পারেননি। দ্বীপে শিক্ষাব্যবস্থা তেমন উন্নত ছিল না। স্বামীর স্বল্প আয়ে দুবেলা ঠিকমতো খাবার জোগাতেই চরম কষ্ট হতো। এর ওপর আবার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালানো। তাই এই মা নিজেই হাঁস-মুরগির ডিম ও গাছের ফল বিক্রি করতেন। টাকা বাঁচাতে সারা দিন মাত্র একবার খাবার খেতেন। কিন্তু সন্তানদের সুশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মায়ের নিষ্ঠা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি ছিল প্রবল। তাই মায়ের সন্তানরা আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রে সমাজে প্রতিষ্ঠিত। তার প্রথম সন্তান আকবর হোসেন বর্তমানে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, দ্বিতীয় সন্তান মো. মনির হায়দার এলজিইডির ইঞ্জিনিয়ার,
তৃতীয় সন্তান ডা. ওমর ফারুক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার, চতুর্থ সন্তান রহিমা বেগম ও পঞ্চম সন্তান ফাতেমা বেগম নারী উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত এবং ষষ্ঠ সন্তান আয়েশা বেগম মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা।
সম্মাননা পাওয়া মা হোসনে আরা বেগম লাঠিতে ভর দিয়ে অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সঙ্গে স্বামী ও ছেলেমেয়ে। সন্তানদের সুশিক্ষিত করার সম্মাননা নিতে এসে কেমন লাগছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কোনো স্বীকৃতিতেই মন ভরে না, সন্তুষ্টি আসে না। যদি না ছেলেমেয়েরা প্রকৃত মানুষ হয়। মা হিসেবে এটি পরম প্রাপ্তি।’
চিকিৎসক ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে সম্মাননা পুরস্কার নিতে আসেন রত্নগর্ভা আরেক মা রেহানা বেগম। নিজে পড়ালেখা না জানলেও কঠোর পরিশ্রম আর স্বামীর সীমিত আয় দিয়ে সংসার চালিয়েও সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ চালিয়েছেন এই মা। আয়োজকদের প্রতি খুশি হয়ে রেহানা বেগম বলেন, ‘এগুলো (ক্রেস্ট ও সনদ) আমার কষ্টের ফসল।’ তার পাঁচ সন্তানের মধ্যে একজন নারী উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত, একজন সহকারী শিক্ষিকা, একজন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার, বাকি দুজন দুটি স¦নামধন্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক।
মাকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাক, কান ও গলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী রাজিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের অভাব-অনটনের সংসারে খাবার, পোশাকের কষ্ট ছিল। এর মধ্যেও মা লেখাপড়া নিয়ে উৎসাহ দিতেন। মা’র অবদানে আজ আমরা এ পর্যায়ে এসেছি।’
এ বছর সাধারণ ক্যাটাগরিতে ‘রত্নগর্ভা মা’ সম্মাননা পাওয়া কুমিল্লা জেলার বুড়িচং উপজেলার তাহমিনা বেগম চৌধুরীর জীবনসংগ্রামের পথ মোটেও সহজ ছিল না। স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের অর্থনৈতিক টানাপড়েন ও পারিবারিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি ৯ সন্তানের ভরণপোষণ এবং শিক্ষার নিশ্চয়তা দিতে নিরলস সংগ্রাম করে গেছেন। সন্তানদের সুশিক্ষিত, নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন এবং দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি ছিলেন দৃঢ় ও অনমনীয়। তার ৯ সন্তানই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বর্তমানে রাষ্ট্রীয় ও পেশাগত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।
২০ বছর আগে মা, এখন মেয়ে : জীবনে নানা সমস্যা মোকাবিলা করে সন্তানকে সুশিক্ষিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত করার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৫ সালে রত্নগর্ভা সম্মাননা পেয়েছিলেন মঞ্জিলা বেগম। একই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবার সম্মাননা পেয়েছেন তার মেয়ে শাহানা পারভীন লিটা। গতকাল তার হাতেও আজাদ প্রোডাক্টসের পক্ষ থেকে ক্রেস্ট ও সনদ তুলে দেওয়া হয়। এ সময় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন এই মা।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শাহানা পারভীন লিটা একাধারে বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেতারের বাংলা সংবাদ পাঠিকা ও সংগীতশিল্পী। ছবি আঁকা ও লেখালেখিতে পারদর্শী এই মা নিজে গান লিখে নিজেই সুর করেন। এত কর্মব্যস্ততার মধ্যেও তিনি তার তিন সন্তানকে প্রতিষ্ঠার স্বর্ণচূড়ায় পৌঁছে দিতে এতটুকু পিছপা হননি। তার দুই ছেলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানে সিনিয়র সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আরেক ছেলে ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রে লেখাপড়া করছেন।
শাহানা পারভীন লিটা নিজের অনুভূতি নিয়ে বলেন, ‘২০০৫ সালে আমার মা মঞ্জিলা বেগম রত্নগর্ভা সম্মাননা পান। মায়ের সম্মাননায় আমিও অনুপ্রাণিত হই। মা আমাদের ভাই-বোনদের যেভাবে আগলে রেখেছিলেন, আমিও তিন সন্তানকে সেভাবে আগলে রেখেছি। আজ আমি আনন্দিত, আমার সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. সবুর খান সব মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘বর্তমানে মানুষের যে নৈতিক অবক্ষয়, তার মধ্যেও সন্তানদের মানুষ করার প্রধান কৃতিত্ব মায়েদের।’ বর্তমান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আদর্শিক শিক্ষক ও নৈতিক শিক্ষার অভাবে ভুগছে উল্লেখ করে তিনি মায়েদের আহ্বান জানান, যেন তারা নতুন প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধে বলীয়ান করেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ফরিদ আহমেদ প্রত্যেক সন্তানকে যেকোনো পরিস্থিতিতে মায়ের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘একজন মা যখন তার সন্তানকে নিয়ে গর্ববোধ করেন, সেটিই সন্তানের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তি।’
এর আগে অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্যে আজাদ প্রোডাক্টসের স্বত্বাধিকারী আবুল কালাম আজাদ ছোটবেলায় নিজের মাকে হারানোর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আজ এখানে অনেক মাকে পেয়েছি। যাদের মা বেঁচে আছে, তারা সবচেয়ে সুখী মানুষ। প্রতি বছর এই দিনটি আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের।’
