সভ্যতার অগ্রগতির সঙ্গে চিকিৎসা ও সেবাশুশ্রূষার ক্ষেত্র যত বিস্তৃত হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে নিবেদিতপ্রাণ সেবকদের অবদান। আজকের আধুনিক নার্সিং ব্যবস্থার বহু আগে, ইসলামের সূচনালগ্নেই মানবসেবাকে ইবাদতের মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন এক মহীয়সী নারী সাহাবি। যুদ্ধক্ষেত্রের রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে শুরু করে অসুস্থ ও অসহায় মানুষের শুশ্রূষায় যিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি হলেন ইসলামের প্রথম নার্স রুফাইদা আল-আসলামিয়া (রা.)। মানবতার সেবায় তার আত্মত্যাগ, প্রজ্ঞা ও নেতৃত্ব আজও ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।
তিনি বনু খাজরাজের আসলাম গোত্রের সদস্য ছিলেন। রাসুল (সা.) মদিনায় আগমনের আগেই এ নারী সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেন। যারা রাসুল (সা.)-কে মদিনায় তার আগমনের দিন অভ্যর্থনা জানান, তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। রুফাইদা (রা.)-এর পিতা সাদ আল-আসলামি মদিনার মানুষদের চিকিৎসা করতেন।
বনু খাজরাজ আসলাম গোষ্ঠীতে রুফাইদার জন্ম হয়। ছোট থেকেই রুফাইদা তার বাবাকে চিকিৎসা কাজে সাহায্য করতেন। বলা যায়, নিজের বাবার হাতেই তার রোগ নিরাময় ও চিকিৎসাজ্ঞান শেখা। তিনি যেন জানতেন, তাকে মানুষের সেবা করতে হবে। সেই হিসেবেই নিজেকে তৈরি করেছিলেন রুফাইদা।
ইমাম বুখারি (রহ.) ‘আদাবুল মুফরাদ’ কিতাবে লিখেছেন, মসজিদে নববীর পাশে তার একটি তাঁবু ছিল। যেখানে তিনি অসুস্থদের সেবাদান করতেন। খন্দকের যুদ্ধে সাদ ইবনে মুয়াজ (রা.) আহত হলে রাসুল (সা.) তাকে সেই তাঁবুতে রেখে চিকিৎসার আদেশ দেন। মদিনার আনসার-মুহাজিরদের অন্যান্য নারী সাহাবিদের তিনি নার্সিং প্রশিক্ষণ দেন। তার শিষ্য নারী সাহাবিরা বদর, ওহুদ, খন্দক ও খায়বারসহ অন্যান্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে আহতদের চিকিৎসা সেবাদান করতেন।
রাসুল (সা.) খায়বারের যুদ্ধে যাওয়ার জন্য যখন প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন রুফাইদা (রা.) ও একদল স্বেচ্ছাসেবী নার্স (নারী সাহাবি) তার কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা আপনার সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চাই। আহতদের সেবা করার পাশাপাশি মুসলিমদের যতটুকু সম্ভব সাহায্যের চেষ্টা করব। রাসুলুল্লাহ (সা.) অনুমতি দিলেন। কেউ আহত হলে তিনি তাকে রুফাইদার তাঁবুতে পাঠিয়ে দিতেন। তিনি ও তার স্বেচ্ছাসেবী নার্স বাহিনী খুবই চমৎকারভাবে এ কাজ সম্পন্ন করেন। ফলে খুশি হয়ে রাসুল (সা.) খায়বার যুদ্ধের গনিমতের একটা অংশ রুফাইদা (রা.)-এর জন্য বরাদ্দ করেন। তাকে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুসলিমদের সমান মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। ইউরোপীয় চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা ঊনবিংশ শতাব্দীর ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেলকে নার্সিংয়ের পথিকৃৎ বলেন। কিন্তু অনেক মুসলিম ঐতিহাসিক বলেন, ‘নার্স’ কথাটি ইতিহাসে প্রথম রুফাইদা (রা.) এর ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করা যায়।
রুফাইদা (রা.) দিনরাত এক করে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন মানবসেবায়। যুদ্ধের কঠিন মুহূর্তে মৃত্যুভয়ও তাকে আহতদের সেবা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থাতেও মানুষ ছুটে আসত তার কাছে। তিনি শুধু রোগ নিরাময় করতেন তা নয়, নানাবিধ সামাজিক উন্নতির কাজও করতেন। তিনি ছিলেন সম্পূর্ণভাবে ইসলামের প্রতি আত্মনিমগ্ন। নিজের সম্পদ ও অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসা ও সেবা প্রদান করতেন সব আর্ত ও অসুস্থকে। রুফাইদা (রা.) ইসলামি ইতিহাসে এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। তার সম্মানে আগা খান বিশ্ববিদ্যালয় একটি নার্সিং কলেজ স্থাপন করেছে। শুধু তাই নয়, বাহরাইনের রয়্যাল কলেজ অব সার্জন ইন আয়ারল্যান্ডের ছাত্র-ছাত্রীদের রুফাইদা আল আসলামিইয়া পুরস্কার দেওয়া হয়।
নার্সিং সেবায় উৎসাহিত করেছে ইসলাম
ইসলামের প্রথম নারী নৌ-সেনা