ইসলামের প্রথম নারী নৌ-সেনা

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৫, ১২:০৭ এএম

ইসলামের প্রথম নারী নৌ-সেনা ছিলেন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.)। একই সঙ্গে সামুদ্রিক অভিযানে প্রথম শহীদ নারীও ছিলেন তিনি। উম্মে হারাম (রা.) খাজরাজ গোত্রের নাজ্জার শাখার কন্যা। হিজরতের পূর্বে মদিনার একদল লোক মক্কায় এসে রাসুল (সা.)-এর হাতে বাইয়াত হন। যা ইতিহাসে বাইয়াতে আকবাহ নামে প্রসিদ্ধ। বাইয়াতের পর এই দল মদিনায় ফিরলে উম্মে হারাম (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।

উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.) প্রখ্যাত সাহাবি আনাস (রা.)-এর খালা। অনেক বর্ণনায় পাওয়া যায়, উম্মে হারাম (রা.) রাসুল (সা.)-এর দুধসম্পর্কীয় খালা। মতান্তরে রক্তসম্পর্কীয় খালা বলেও কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে। আবার কারো মতে, উম্মে হারাম (রা.) ছিলেন রাসুল (সা.)-এর পিতার খালা। কেননা রাসুল (সা.)-এর দাদা আবদুল মুত্তালিবের মা ছিলেন নাজ্জার গোত্রের কন্যা।

রাসুল (সা.) হিজরত করে মদিনায় আগমনের পর কুবায় দুই সপ্তাহ অবস্থান করেন। সে সময় তিনি সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। যা মসজিদে কুবা নামে পরিচিত। এই মসজিদের পাশে অর্থাৎ কুবা পল্লীতে ছিল উম্মে হারাম (রা.)-এর বাড়ি। রাসুল (সা.) প্রতি শনিবার মসজিদে কুবায় যেতেন। কখনো পায়ে হেঁটে, কখনো বাহনে চড়ে। (সহিহ বুখারি) তিনি সেখানে গেলে প্রায়ই উম্মে হারামের বাড়িতে যেতেন। দুপুরে খাবার খেয়ে তার ঘরে বিশ্রাম নিতেন। এমনই একদিন ঘটল ভিন্ন এক ঘটনা। রাসুল (সা.)-কে খাবার খাওয়ান। খাবার শেষ হলে তিনি বিশ্রাম নেন। এমতাবস্থায় ঘুমিয়ে যান। হঠাৎ তিনি হাসতে হাসতে ঘুম থেকে ওঠেন। উম্মে হারাম বেশ অবাক হয়ে জানতে চান, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার হাসির কারণ কী?

রাসুল (সা.) জানান, তিনি স্বপ্ন দেখেছেন। বলেন, উম্মতের একটি দলকে সমুদ্রের মাঝে যুদ্ধরত অবস্থায় আমার সামনে পেশ করা হলো। তারা সমুদ্রের মাঝে জাহাজের পাটাতনে এমন অবস্থায় আরোহী, যেমন বাদশাহ তার জৌলুশপূর্ণ সিংহাসনের ওপর। এই স্বপ্ন ছিল একটি ভবিষ্যদ্বাণী। মুসলিমদের তখন কোনো নৌবাহিনী ছিল না। এমনকি আবু বকর (রা.) বা ওমর (রা.)-এর খেলাফতকালেও মুসলিমদের নৌবাহিনী ছিল না। ফলে এই ভবিষ্যদ্বাণী সেই সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল বিস্ময়কর। উম্মে হারাম (রা.) অনুরোধ করেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন, আমাকে যেন সেই দলের অন্তর্ভুক্ত করেন।’ তিনি প্রার্থনা করলেন এবং ঘুমিয়ে পড়লেন। আবারও হাসতে হাসতে ঘুম থেকে উঠলেন। উম্মে হারাম (রা.) হাসির কারণ জিজ্ঞেস করলে পূর্বের মতো বললেন এবং জানালেন যে, ‘তুমি প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সহিহ বুখারি)

রাসুলুল্লাহ (সা.) তার খালা উম্মে হারামকে শাহাদতের সুসংবাদ দেন। ফলে উম্মে হারাম (রা.) জীবিত থাকাবস্থায় শহীদ উপাধি লাভ করেন। কেউ কেউ তাকে এই নামে ডাকত। (আসহাবে রাসুলের জীবনকথা ৬/১৫১)

তারপর ইতিহাসের নানা বাঁকবদলের মধ্য দিয়ে সময় বয়ে যায় আপন গতিতে। এক সময় রাসুল (সা.)-এর ওফাত হয়। শুরু হয় মহান চার সাহাবির খেলাফতকালের সূচনা। পর্যায়ক্রমে আবু বকর ও ওমর (রা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নেন। অপরদিকে উম্মে হারাম (রা.) আশায় বসে থাকেন, কবে সেই সুবর্ণ সুযোগ আসবে।

প্রায় ২০ বছর পরের ঘটনা। তখন ওসমান (রা.)-এর খেলাফতকাল চলছিল। তৎকালীন সিরিয়ার গভর্নরের দায়িত্বে ছিলেন মুয়াবিয়া (রা.)। তিনি ওসমান (রা.)-কে নৌ-অভিযানের প্রস্তাব দেন। খলিফা ওসমান (রা.) অনুমতি দেন। মুয়াবিয়া (রা.) অভিযান চালান বর্তমান ইউরোপের সাইপ্রাসে। যোদ্ধাদের মধ্যে রাসুল (সা.)-এর কয়েকজন সাহাবি সেই অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন উম্মে হারামের স্বামী উবাইদা ইবনে সামেত (রা.)। মুসলিম বাহিনীর প্রথম নৌ-অভিযানে স্বামীর সঙ্গে উম্মে হারাম (রা.) অংশগ্রহণ করেন। মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ ছাড়াই সাইপ্রাস জয় করে। বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.) তার ঘোড়া থেকে পড়ে যান এবং ঘাড়ে আঘাত পান। সেই জখমের ফলে তিনি ইন্তেকাল করেন। (সহিহ বুখারি)

এর মধ্য দিয়ে রাসুল (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয় এবং উম্মে হারাম বিনতে মিলহান (রা.) প্রথম নারী নৌ-সেনা হিসেবে বিবেচিত হন। মদিনায় জন্মগ্রহণ করা সেই নারী সাহাবিকে সমাধিস্থ করা হয় ইউরোপের সাইপ্রাসে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত