আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে সামনে রেখে মোটরসাইকেল মালিকদের ওপর করের খড়গ নেমে আসার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখন চিন্তাভাবনা করছে কীভাবে মোটরসাইকেল মালিকদের আয়করের আওতায় আনা যায়। বিশেষ করে যাদের মোটরসাইকেল আছে, তাদের ওপর অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আরোপের একটি প্রস্তাবনা নিয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চলছে। তবে এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়ে ইতিমধ্যেই জনমনে এবং সংশ্লিষ্ট শিল্প খাতে নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই নিয়ম অনুযায়ী, উবার বা পাঠাওয়ের মতো রাইড শেয়ারিং সেবায় নিয়োজিত চালক থেকে শুরু করে পণ্য সরবরাহকারী ডেলিভারিম্যান- সবার ওপরই এই করের বোঝা চাপতে পারে। অগ্রিম কর মূলত ব্যক্তির করযোগ্য আয় হবে ধরে নিয়ে আগেই কেটে রাখা হয়। বর্তমানে দেশে করমুক্ত আয়ের সীমা সাড়ে তিন লাখ টাকা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, একজন মোটরসাইকেল চালক মানেই কি তিনি বছরে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি আয় করেন? বাস্তবে দেখা যায়, বহু শিক্ষার্থী টিউশনির টাকা দিয়ে বা নিম্নবিত্ত মানুষ অতি কষ্টে কিস্তিতে বাইক কিনে সংসার চালান। তাদের অনেকেরই কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) নেই এবং তাদের আয় করসীমার অনেক নিচে। এমন পরিস্থিতিতে অগ্রিম কর আরোপ করাকে অনেকেই ‘জোর করে টাকা নেওয়া’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
এনবিআর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন ক্ষমতার (সিসি) ওপর ভিত্তি করে এই কর নির্ধারণ করা হতে পারে। প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী:
১১১-১২৫ সিসি: বার্ষিক ২,০০০ টাকা।
১২৬-১৬৫ সিসি: বার্ষিক ৫,০০০ টাকা।
১৬৫ সিসির বেশি: বার্ষিক ১০,০০০ টাকা।
যদিও কম সিসির বাইককে এই তালিকার বাইরে রাখার একটি প্রাথমিক ঐক্যমত হয়েছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে বাজারে রয়্যাল এনফিল্ডের মতো দামী ও উচ্চ ক্ষমতার বাইক আসায় সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা সহজ। তাদের দাবি, সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান দেখে কর নির্ধারণ করা এনবিআরের একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া এবং বছর শেষে আয়কর রিটার্ন জমা দিয়ে এই অর্থ সমন্বয়ের সুযোগ থাকবে।
এই সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত মোটরসাইকেল উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ শিল্পের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ মোটরসাইকেল অ্যাসেম্বলার্স অ্যান্ড ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএএমএ) সভাপতি মতিউর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বর্তমানে মোটরসাইকেল বিক্রির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ২০১৮ সালে সরকারের উৎসাহে দেশীয় শিল্প গড়ে তুলতে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে। অথচ গত কয়েক বছরে বিক্রি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ২০২২ সালে যেখানে ৬ লাখ বাইক বিক্রি হয়েছিল, ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ৪ লাখ ৬৪ হাজারে। বারবার অযৌক্তিক নীতি পরিবর্তন এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা না করে কর চাপানো এই সম্ভাবনাময় শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এনবিআর সহজ পথ খুঁজছে। যারা নিয়মিত রিটার্ন দেয় না বা যাদের কাছ থেকে কর আদায় করা কঠিন, তাদের বাদ দিয়ে নিবন্ধিত যানবাহনের মালিকদের লক্ষ্য বানানো হচ্ছে। এনবিআরের আয়করনীতি বিভাগের সাবেক সদস্য সৈয়দ আমিনুল করিমের মতে, ধনী পরিবারের সন্তানদের দামী বাইকের ওপর কর বসানো যেতে পারে, কিন্তু সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর এই বোঝা চাপানো ঠিক হবে না।
মাঠপর্যায়ে রাইড শেয়ারিং করা চালকদের জীবন আরও দুর্বিষহ হয়ে ওঠার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় বাইক চালিয়ে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি সংসার চালানোই যাদের জন্য দায়, তাদের ওপর নতুন করে কয়েক হাজার টাকার কর আরোপ করা হলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে। পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, মোটরসাইকেল এখন বিলাসিতা নয়, বরং দেশের অর্থনীতির একটি লাইফলাইন। তাই এই খাতে কর বসানোর আগে এর আর্থ-সামাজিক প্রভাব গভীরভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
