ইরানের বিরুদ্ধে জিসিসিকে যুদ্ধে নামাতে চেয়েও ব্যর্থ আবুধাবি

আপডেট : ১৬ মে ২০২৬, ০৪:০০ এএম

ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযানে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে যুক্ত করার প্রচেষ্টায় ব্যর্থ হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। আবুধাবি চাইলেও অন্য আরব দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াতে রাজি হয়নি।

শুক্রবার (১৫ মে) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ব্লুমবার্গ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া যুদ্ধের শুরুর দিকেই ইউএই জিসিসিভুক্ত অন্য পাঁচটি দেশকে যৌথ সামরিক অভিযানে অংশ নিতে চাপ দিয়েছিল। তবে সেই উদ্যোগ সফল হয়নি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। ওই হামলায় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আঘাত হানা হয়। একই সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনিকে হত্যা করা হয় এবং দেশটির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডারদেরও প্রাণহানি ঘটে।

এর জবাবে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়ে অঞ্চলজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের পাল্টা হামলার পর ইউএই কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান ও সৌদি আরবকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিত সামরিক হামলা চালানোর চেষ্টা করে। তবে শেষ পর্যন্ত অন্য দেশগুলো সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে আরও সহিংসতা বাড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নেয়।

এ উদ্দেশ্যে ইউএই প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান (এমবিজেড) সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানসহ আঞ্চলিক নেতাদের সঙ্গে একাধিক ফোনালাপ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, এমবিজেড মনে করতেন, ইরানকে ঠেকাতে উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর সমন্বিত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।

ফোনালাপে তিনি আরব নেতাদের স্মরণ করিয়ে দেন, ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর উদ্ভূত হুমকির জবাব হিসেবে ১৯৮১ সালে ছয় সদস্যের জিসিসি গঠিত হয়েছিল।

তবে অন্য আরব রাষ্ট্রগুলো এই অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়নি। তারা উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ ও সংঘাত আরও বিস্তৃত হোক—এমন অবস্থান নেয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাহরাইন ও কুয়েত মূলত সৌদি আরবের অবস্থানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। ওমান ইরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখে। অন্যদিকে ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত কাতার প্রথমে পাল্টা হামলার বিষয়টি বিবেচনা করলেও শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা প্রশমিত করা ও মধ্যস্থতার পথ বেছে নেয়।

এদিকে ট্রাম্প প্রশাসনও উপসাগরীয় আরব নেতাদের মধ্যকার মতবিরোধ সম্পর্কে অবগত ছিল এবং তারাও ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক হামলার পক্ষে চাপ দিচ্ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কুয়েতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের নেতারা যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন আগের যুদ্ধগুলোর ক্ষয়ক্ষতির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অঞ্চলকে স্থিতিশীল রাখা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছিলেন।

ব্লুমবার্গ আরও জানায়, এমবিজেডের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন উপসাগরীয় নেতা তাকে স্মরণ করিয়ে দেন যে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই যুদ্ধ ‘তাদের যুদ্ধ নয়’। এরপর তিনি দ্রুত ট্রাম্প প্রশাসন ও ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় করে মার্চ ও এপ্রিলে ইরানের বিরুদ্ধে কিছু হামলা পরিচালনার উদ্যোগ নেন।

এর আগেই ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশ হিসেবে আবুধাবি ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল।

এদিকে ওয়াশিংটন ও তেলআবিবের ওপর আবুধাবির ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। এর ফল হিসেবে এপ্রিলের শেষ দিকে ইউএই ওপেক থেকে বেরিয়ে যায় এবং সম্প্রতি জিসিসি থেকেও সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয়।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ইসরায়েল ঘনিষ্ঠভাবে ইউএইর সঙ্গে কাজ করে দেশটির নিরাপত্তা ও সামরিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করেছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ব্লুমবার্গ জানায়, ইউএইকে সহায়তা দিতে ইসরায়েল সেখানে ‘আয়রন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছিল।

ইসরায়েল-ইউএই সমন্বয়ের তথ্য প্রকাশের মধ্যেই রয়টার্স জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ইউএই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

এটি ছিল দুই নেতার মধ্যে প্রথম প্রকাশ্যে নিশ্চিত হওয়া বৈঠক।

বৈঠক সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র রয়টার্সকে জানায়, গত ২৬ মার্চ দুবাই আমিরাতের আল আইন শহরে, ওমান সীমান্তের কাছে, নেতানিয়াহু ও এমবিজেড গোপনে বৈঠক করেন। গত বুধবার ইসরায়েলি গণমাধ্যম নেতানিয়াহুর দপ্তরের বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করে।

নেতানিয়াহুর দপ্তর দাবি করে, ‘এই সফরের মাধ্যমে ইসরায়েল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে।’

সূত্র: প্রেস টিভি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত