প্রায় দেড় যুগ অপেক্ষা, নানা জটিলতা আর অনিশ্চয়তার অবসান হলো। অবশেষে বাংলাদেশ পুলিশের ইতিহাসে ব্যতিক্রমী ২৭তম বিসিএস পুলিশ ব্যাচের বঞ্চিতদের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের (এএসপি) প্রশিক্ষণ শেষ হলো বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমিতে। পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দীর্ঘ বঞ্চনার পর অধিকার ফিরে পাওয়া এই কর্মকর্তাদের প্রতি জাতির প্রত্যাশা অনেক। সেজন্য দুর্নীতিমুক্ত থেকে জনগণের আস্থা অর্জন করে পুলিশকে সত্যিকার অর্থেই জনবান্ধব বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে বছরজুড়েই চলে এমন প্রশিক্ষণ ও সমাপনী আয়োজন। তবে গতকালের এই কুচকাওয়াজ ছিল ব্যতিক্রম। নবীন কর্মকর্তা হিসেবে যারা প্রশিক্ষণ শেষ করলেন, সেই ৫৮ জনই মধ্যবয়সী। সবার বয়সই ৪০ এর ওপরে। কারও কারও পঞ্চাশের কাছাকাছি। গতকালের এই প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে এএসপি হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন তারা। এই ৫৮ জনের মধ্যে ৫৭ জনই বিসিএস ২৭তম ব্যাচের। আরেকজন ২৮তম ব্যাচের।
২০০৫ সালে ২৭তম বিসিএসের মাধ্যমে এএসপি পদে চাকরির চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েও তারা যোগদানের সুযোগ পাননি। অথচ এই ব্যাচের অনেকেই এখন কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে। ক্যাডার হিসেবে যোগ দিতে না পেরে এই ৫৮ জন পরবর্তিতে বিভিন্ন পেশায় যুক্ত হন। তবে বিশেষ সুযোগে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি সরকার তাদের পুলিশে নিয়োগ দেয়। এর পরদিনই শুরু হয় ছয় মাসের মৌলিক প্রশিক্ষণ। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন জেলায় তাদের পদায়ন করা হয়েছে। গতকাল সকালে পুলিশ একাডেমিতে এসে কুচকাওয়াজ পরিদর্শন ও অভিবাদন গ্রহণ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পরে বিভিন্ন বিষয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনকারী প্রশিক্ষণার্থীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন তিনি।
নবীন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। দুর্নীতির করাল গ্রাস যেন আপনাদের স্পর্শ করতে না পারে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। আপনারা এমন একটি ব্যাচ, যারা নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় কর্মজীবনে পদার্পণ করছেন। সুতরাং আপনাদের দায়িত্ব অনেক বেশি। রাষ্ট্রের এই রূপান্তরকালে নিজেদের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। সততা, দক্ষতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার বিশ্বাস করে পুলিশ কোনো বিশেষ দলের বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়; বরং পুলিশ হবে জনগণের প্রকৃত বন্ধু। পুলিশকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করে একটি আধুনিক, সেবাধর্মী ও মানবিক সংস্থায় রূপান্তর করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। নবীন এই পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, প্রায় দেড় যুগ আগে আপনারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ন্যায্য অধিকার ফিরে পেয়েছেন। তবে মনে রাখতে হবে, এই বঞ্চনা ও নিপীড়নের পর অধিকার ফিরে পাওয়ার কারণে জাতির প্রত্যাশাও আপনাদের প্রতি অনেক বেশি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু ও পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির। কুচকাওয়াজ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগস্ট মাসে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠীর বিভিন্ন তৎপরতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত ব্যাগ ঘিরে সৃষ্ট ‘বোমা আতঙ্ক’ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরিস্থিতি কোনোভাবেই উদ্বেগজনক নয়। গত পাঁচ-ছয় মাসের অপরাধপ্রবণতার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, আনুপাতিক ও তুলনামূলক বিচারে দেশে বর্তমানে অপরাধ ও নাশকতার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
