জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) নারী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ফুটেজে দেখা গেছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৬টা ৫৮ মিনিটে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে রাত ১১টা ১৩ মিনিটে অপরাধ সংঘটনের আগ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টা ধরে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছেন অভিযুক্ত যুবক।
শুক্রবার (১৫ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান প্রক্টর অধ্যাপক ড. এ কে এম রাশিদুল আলম।
সংবাদ সম্মেলনে প্রক্টর সিসিটিভি ফুটেজের বর্ণনা দিয়ে জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি সন্ধ্যা ৬টা ৫৮ মিনিটে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করেন। এরপর ৭টা ২ মিনিটে বিশমাইল মোড় অতিক্রম করে জাবি স্কুল ও কলেজের সামনে দিয়ে ব্যাচেলর কোয়ার্টারের মোড় হয়ে ৭টা ১৫ মিনিটে প্রান্তিক গেটে আসেন। সেখানে কিছুক্ষণ অবস্থান করে মহিলা ক্লাবের সামনে দিয়ে চৌরঙ্গীর দিকে যান। পরে রাত ৭টা ৩১ মিনিটে পদ্মপুকুরের উত্তরের মাটির রাস্তায় প্রবেশ করে বের হয়ে আবার একই রাস্তায় যান তিনি।
ফুটেজ বিশ্লেষণ করে প্রক্টর আরও জানান, রাত ৮টার দিকে চৌরঙ্গী মোড় হয়ে মেডিকেলের সামনে দিয়ে ৮টা ২৬ মিনিটে প্রথমবারের মতো ঘটনাস্থলে যান ওই ব্যক্তি। সেখান থেকে শহীদ সালাম-বরকত হলের মোড়ে গিয়ে ৮টা ৩৩ মিনিটে আবার ট্রান্সপোর্টে ফিরে আসেন। এরপর রাত ৯টা থেকে সোয়া ১০টার মধ্যে আ ফ ম কামালউদ্দীন হলের সামনে, পুনরায় পুরোনো ট্রান্সপোর্টে এবং দুইবার ঘটনাস্থলের সামনে দিয়ে যাতায়াত করেন। পরবর্তীকালে রাত ১০টা ২০ মিনিটে ছাত্রী হলগুলোর রাস্তা, শহীদ মিনার ও পুরোনো প্রশাসনিক ভবন হয়ে ১০টা ৫০ মিনিটে আবার ফিরে যান। এরপর রাত ১০টা ৫৪ মিনিটে ঘটনাস্থলের দিকে গিয়ে ট্রান্সপোর্টে ফেরেন এবং ১১টা ০১ মিনিটে সালাম-বরকত হলের দিকে যান। সর্বশেষ ফেরার পথে রাত ১১টা ১৩ মিনিটে ফজিলাতুন্নেসা হল সংলগ্ন রাস্তার পাশে ওই অপরাধ সংঘটন করেন। তিনি কীভাবে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়েছেন, তা জানতে আরও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানানো হয়।
এই ঘটনায় গভীর মর্মবেদনা প্রকাশ করে প্রক্টর বলেন, ‘আমরা এই ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত। দোষী ব্যক্তিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে আমরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও নির্বাচিত সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, দ্রুত তাকে গ্রেপ্তার করে একটি নজির সৃষ্টি করা হোক।’
এদিকে ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ১৪ দফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা ঘাটতি মেটাতে দ্রুততম সময়ে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ গঠন ও তাৎক্ষণিক অভিযোগ জানাতে হটলাইন নম্বর চালু করা। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর পরিচয়পত্র বহন বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি বহিরাগত প্রবেশে কড়াকড়ি, গেটের লগবুকে এন্ট্রি এবং ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে যাতায়াতকারী প্রতিবেশীদের জন্য পাসের ব্যবস্থা করা হবে।
প্রশাসনের অন্যান্য সিদ্ধান্তের মধ্যে রয়েছে নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিক ও কর্মকর্তা এবং ক্যাম্পাসের দোকান কর্মচারীদের পরিচয়পত্র বহন বাধ্যতামূলক করা এবং তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ও তথ্য সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেওয়া। এছাড়া হলের দোকান কর্মচারীদের তথ্য নিয়ে আইসিটি সেল কর্তৃক একটি ডাটাবেজ তৈরি এবং ক্যাম্পাসের সকল ভাসমান (ভ্রাম্যমাণ) দোকান উচ্ছেদ করা হবে। গেটগুলোতে প্রহরী বৃদ্ধি, এক মাসের মধ্যে নতুন নারী-পুরুষ প্রহরী নিয়োগ এবং ১০০ আনসার সদস্য চেয়ে ইউজিসির কাছে আবেদন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সাথে সীমানা প্রাচীরের ভাঙা অংশ বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত আলো ও সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, আল-বেরুনী হলের টিনশেড এক্সটেনশন ভবন ভেঙে ফেলা এবং বুলিং ও র্যাগিং প্রতিরোধে আগামী সিন্ডিকেট সভায় একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করা হবে বলে জানানো হয়।
