নারীর জন্য সৃষ্টির পথে ফুল জড়িয়ে থাকে না। তা সে যেকোনো সৃষ্টি হোক, লেখালেখি বা অন্য কোনো শিল্পকর্ম। বরং অনেকটা প্রতিবন্ধকতা, ঘাত-প্রতিঘাত অতিক্রম করেই নারী ‘লেখক’ বা যাদের ‘লেখিকা’ বলি তাদের সেখানে টিকে থাকতে হয়। পুরুষ লেখকরা আশপাশের পারিপার্শ্বিক পটভূমিতে যে ছাড় বা সুবিধাটুকু পান, লেখিকাদের ভাগ্যে অনেকাংশে তার সিকি পরিমাণও জোটে না। আবার শিল্পসাহিত্য বা কবিতার ভাষারও কথাও যদি উল্লেখ করি সবক্ষেত্রে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি যেন বারবার ধরা দেয়। কিন্তু নারীর দৃষ্টিভঙ্গি সেখানে খুব গৌন। কেননা আজকের একবিংশ শতাব্দীতে এসেও, অনেক পুরুষ ভাবে নারী কেবল ঘরগৃহস্থালি নিয়ে মাথা ঘামাবে। যদিও আজকাল নারীদের একটা বিশাল অংশ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। সুতরাং সংসার সামলে কর্মক্ষেত্রের দায়িত্ব সামলানো নারীদের একটা বাড়তি চাপ।
এতকিছু সামলানোর পরও কোনো নারী যখন লেখালেখির জগতে আসেন, তখন তারা সত্যি সৎসাহসী। কেননা স্বামী, সংসার, আত্মীয়-পরিজন থেকে যে প্রত্যাশার চাপ তার ওপর তৈরি হয় তা তার সৃষ্টিশীল চিন্তাচেতনাকে অনেকটা বাধাগ্রস্ত করে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন পুরুষ যখন লেখালেখি করেন, তখন তার পিছুটান থাকে না। কেননা কর্মক্ষেত্রের বাইরে পুরুষকে আর কিছু নিয়ে ভাবতে হয় না। লেখকরা স্বাধীনভাবে তার সৃষ্টিতে ডুবে থাকতে পারেন। অথচ লেখিকারা হয়তো কারও স্ত্রী, নয়তো কারও মা। পারিবারিক বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সুখের পাশাপাশি নানা তিক্তকর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তাকে এগোতে হয়। তবে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এই অভিজ্ঞতাগুলো অনেক সময় তাদের লেখনীকে সমৃদ্ধ করে। দাম্পত্য জীবনের নানা টেনশন, সুখ-দুঃখের নানা ঘাতপ্রতিঘাতে অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে লেখিকাদের এগিয়ে যেতে হয়। তাদের চলার পথটা মসৃণ নয় বরং অনেকটা পিচ্ছিল। একজন নারী গৃহস্থালির কাজে যথেষ্ট সময় ব্যয় করেন। ফলে লেখালেখির মতো সৃষ্টিশীল কাজে, পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন না। পুরুষরা ধরেই নেয়, বাচ্চার লালনপালন থেকে সাংসারিক যাবতীয় কাজ নারীরা এককভাবে সামলাবে।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন হয়তো এ কারণেই বলেছিলেন, ‘বাঙালি নারী বাবুর্চিরূপে জন্মায় আর তার মরণে বাবুর্চি জীবনলীলা সাঙ্গ করে’। আজ এত বছর পেরিয়ে গেলেও, সমাজের তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। সেক্ষেত্রে বেগম রোকেয়া ভাগ্যবতী ছিলেন। তিনি এমন একজন জীবনসঙ্গিনী পেয়েছিলেন যে, তার স্বামীর অনুপ্রেরণায় সৃষ্টিশীল লেখকসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটাতে পেরেছেন। কালজয়ী সাহিত্য রচনা করে গেছেন। কিন্তু কজন নারীর সেই সৌভাগ্য হয়? বরং অধিকাংশ লেখিকার ক্ষেত্রে দেখা যায়, পরিবারের অনুপ্রেরণা তো দূরের বিষয় বরং অনেক কাঠ, খড় পুড়িয়ে সৃষ্টিশীল কাজে তাকে নিয়োজিত থাকতে হয়। সারাজীবন চলে যায়, কিন্তু লেখিকা হিসেবে স্বীকৃতি জোটে না। আবার অনেক সামাজিক প্রতিকূলতা তাকে পেরোতে হয়। কেন না নারীরা যতক্ষণ প্রেম, প্রকৃতি ইত্যাদি নিয়ে লিখছেন তখন পাঠকদের বাহবা জোটে আর নিজের অধিকার নিয়ে প্রতিবাদী ভাষায় দু-এক কথা লিখলেই, পুরুষরা তাতে নারীবাদী তকমা এঁটে দেন। এত অবহেলা আর বঞ্চনায় অনেক সময় অনেক নারীর লেখকসত্তার মৃত্যু ঘটে। তারপরও যারা লেখালেখিকে কেবল ভালোবেসে এ পথে পা বাড়ান, তারা সত্যি অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। আমাদের দেশের একজন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও অধ্যাপক, যিনি কিছুদিন আগে প্রয়াত হয়েছেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম একবার তার সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, তার লেখালেখির শুরু মাকে দেখে। তিনি শৈশবে তার মাকে দেখতেন, উনুনে রান্না চাপিয়ে দিয়ে বইয়ের পাতায় ডুবে থাকতে। কিন্তু সব নারীর তো সেই সৌভাগ্য হয় না। লেখিকাদের নানা বিষয় নিয়ে টেনশনে মগ্ন থাকতে হয়। স্বামীর নাশতা বানানো হলো কিনা, এঁটো বাসনপত্র ধোয়া হলো কিনা ইত্যাদি নানাবিধ সাংসারিক চাপে সৃষ্টির নেশায় পুরোপুরি ডুবে থাকতে পারেন না। তা সে প্রাবন্ধিক হোন, কবি হোন আর ঔপন্যাসিক বা গল্পকারই হোন না কেন সবার ক্ষেত্রে কথাটা প্রযোজ্য।
মনপ্রাণ উজাড় করে লেখার মতো সময় খুব কম নারীই পান। হয়তো কোনো মহিলা কবির মাথায় একটা কবিতার লাইন ঘুরছে কিংবা গল্পের কোনো চরিত্র একটা রূপ দিতে যাচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে তাকে শব্দ আর বাক্যে সুবিন্যস্তভাবে সাজানোর যথার্থ সুযোগ লেখিকাদের হয়ে ওঠে না। অধিকাংশ সময়ে এ কারণে হয়তো তাদের লেখা অনেক সময় স্বার্থক রচনায় রূপান্তরিত হয় না। এই তিক্তকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি পুরুষদের হতে হয় না। পুরুষ লেখকরা লেখার মাধ্যমে যেন অনেক স্বাধীন আর সাবলীলভাবে নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন। আজকাল অনলাইন প্ল্যাটফর্মের লেখালেখিতে, লেখিকারা অনেক সময় নানা রকম সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন। দিন দিন এর মাত্রা বাড়ছে। অনেক লেখিকা তাদের সৃষ্টির অপূর্ণতা নিয়ে সারাটা জীবনই কাটিয়ে দেন। আমাদের দেশে সাহিত্য জগতে কত স্বনামধন্য কবি-সাহিত্যিক আছেন। অথচ একজন রাবেয়া খাতুনের মতো ঔপন্যাসিক বা নাসরিন জাহানের মতো কথাসাহিত্যিক হাতে গোনা কয়েকজন হয়তো আছেন।
সব দিক বিবেচনায়, লেখিকা হিসেবে সাহিত্যাঙ্গনে পাকাপোক্ত আসন তৈরি করা অনেক কঠিন। যেদিন নারীরা সমাজের বদ্ধমূল ধারণা আর সংস্কারের শৃঙ্খলার বেড়ি ভেঙে এগিয়ে যেতে পারবে, হয়তো সেদিন এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে তার আগে নয়। সেজন্যই লেখিকাদের ভাবতে হবে, তাদের লেখকসত্তাও সম্পূর্ণ স্বাধীন পুরুষদের মতোই যেখানে তাদের ব্যক্তিস্বত্বার প্রভাব লেখকসত্তায় পড়বে না। কেবল মনপ্রাণ উজাড় করে, কোনো সৃষ্টি নিয়ে মেতে থাকলে তবেই না, সেটি পরিপূর্ণভাবে স্বার্থক হয়ে ওঠে। শুধু এভাবেই কেবল স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়। এক্ষেত্রে সাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর একটা কথা উল্লেখযোগ্য ‘আজ যখন তোমরা লিখতে এসেছ, তখন মানুষের মতো ভাব। মেয়ে মানুষের মতো নয়, মানুষের মতো ভাবলেই নারী-পুরুষ সবাইকে বোঝা যায়।’ তাই কেবল পাঠকদের প্রশংসার জন্যই নারীদের লেখা উচিত নয়। বরং এই সংকীর্ণ দৃষ্টিকোণ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। নারীদের লেখা হয়ে উঠুক, তাদের প্রতিবাদের হাতিয়ার। তার বক্তব্যকে সর্বজনীন প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করাই হোক, লেখিকাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
