যুদ্ধ বন্ধে ইরানের ১৪ দফার প্রস্তাব

আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ০১:৫৯ এএম

উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত বন্ধে শান্তি আলোচনার বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। উল্টো প্রতিনিয়তই দুপক্ষ একে অন্যের বিরুদ্ধে হুমকি ও হুঁশিয়ারি অব্যাহত রেখে উত্তেজনা জিইয়ে রেখেছে। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই বেশ কয়েক দফায় শান্তি প্রস্তাব দিলেও, কোনো পক্ষই তাতে সম্মত হয়নি। বরং পাল্টাপাল্টি হুমকিতে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর আশঙ্কা বাড়ছে। সবশেষ গতকাল সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শান্তি প্রস্তাবের আনুষ্ঠানিক জবাব দিয়েছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রস্তাবের আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেন ‘আমরা যেমনটি আগেই ঘোষণা করেছিলাম, আমাদের উদ্বেগের বিষয়গুলো ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।’ তবে ইরানি আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে দেওয়া প্রস্তাবটি ১৪ দফার। আলোচনার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে তেহরানে অবস্থানরত পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি তার পূর্বনির্ধারিত দুই দিনের সফর আরও এক দিন বাড়িয়েছেন।

গত ১৭ মে ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল, ওয়াশিংটন তেহরানের কাছে একটি পাঁচ দফার তালিকা পেশ করেছে। যার মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো ইরানকে কেবল একটি মাত্র পারমাণবিক কেন্দ্র সচল রাখতে হবে এবং তাদের উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পুরো মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এর বিপরীতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর জন্য ইরানের পক্ষ থেকেও কিছু পূর্ব শর্ত দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে যুদ্ধাবসান, ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে অবরুদ্ধ ইরানি সম্পদ ছেড়ে দেওয়া, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ প্রদান এবং কৌশলগত হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম অধিকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

সংবাদ সম্মেলনে ইরানি মুখপাত্র আরও জানান, হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌ-চলাচল নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ কর্মপদ্ধতি তৈরির লক্ষ্যে ওমানের সঙ্গে আলোচনা করছেন ইরানি নেতারা। গত সপ্তাহে মাস্কটে এই বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং দুই দেশের যোগাযোগ এখনো চলছে। আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই অঞ্চলের কোনো দেশের সঙ্গেই আমাদের শত্রুতা নেই এবং আমরা চিরকাল প্রতিবেশী হয়েই থাকব। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ অঞ্চলের সব দেশকে আমরা বহিরাগত পক্ষগুলোর চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’ দুই দেশের এই টানাপোড়েনের মধ্যেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইঙ্গিত দিয়েছেন যে ইসলামাবাদে ওয়াশিংটন-তেহরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় সরাসরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে। পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমি আশাবাদী। এই ফলাফল নিশ্চিত করতে ইসলামাবাদ নতুন দফার আলোচনা আয়োজনের জন্য ‘সর্বোচ্চ চেষ্টা’ করছে বলেও তিনি জানান।

দুপক্ষের অচলাবস্থার মধ্যে ১১ সপ্তাহ ধরে চলা এই সংকট নিয়ে ট্রাম্প ক্রমেই হতাশার ইঙ্গিত দিচ্ছেন। তবে ইরানের নেতৃত্বের প্রতি তার কঠোর কূটনৈতিক অবস্থান নমনীয় করার কোনো লক্ষণ দেখা যায়নি। সোমবারও ট্রুথ সোশ্যালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি উপসাগরীয় অঞ্চলের মানচিত্র প্রকাশ করে ইরানকে ইঙ্গিতপূর্ণ বার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প। মানচিত্রের ওপর ইরানের দিকে তাক করা একাধিক তীরচিহ্ন দেখা গেছে। তবে পোস্টের বিষয়ে ট্রাম্প বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা না দিলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন ট্রাম্পের এই পোস্টটিকে ইরানের ওপর পুনরায় হামলা বা সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার আরেকটি প্রকাশ্য হুমকি। ইরানি নৌকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, মহাকাশ যুদ্ধ ও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা সংবলিত বেশ কয়েকটা ছবি দিয়েছেন ট্রাম্প। পাশাপাশি ট্রাম্প আরও বলেন তাদের (ইরান) উচিত খুব দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া, নয়তো তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না; হাতে সময় একেবারেই নেই!

এই আবহের মধ্যেই ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ফোনালাপ পুনরায় যুদ্ধ শুরুর গুঞ্জন উসকে দিয়েছে। আজ মঙ্গলবার ট্রাম্প হোয়াইট হাউজের ‘সিচুয়েশন রুম’-এ একটি জরুরি বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করেছে যে তারা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র সমাপ্তি ঘটিয়েছে, তবে একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ‘অপারেশন সেøজহ্যামার’ নামে ইরানের ওপর নতুন হামলার পরিকল্পনা করছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত