হৃদয়ে নুর আসে যেভাবে

আপডেট : ১৯ মে ২০২৬, ০১:৫৬ এএম

মানুষ পৃথিবীতে এসেছে অল্প সময়ের জন্য। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। আখেরাতের জীবন চিরস্থায়ী। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন জীবন গড়া, যে জীবন হবে ইমানের আলোয় আলোকিত, নেক আমলে সৌন্দর্যমণ্ডিত এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিতে পরিপূর্ণ। কারণ যে জীবন আল্লাহর পথে চলে, সেই জীবনই প্রকৃত অর্থে আলোয় ভরা জীবন। আলো মানে শুধু বাহ্যিক চাকচিক্য নয়। প্রকৃত আলো হলো অন্তরের প্রশান্তি, ইমানের দৃঢ়তা, সৎপথে চলার শক্তি এবং গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার তওফিক। একজন মুমিন যখন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, সত্য কথা বলে, হারাম থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখে এবং মানুষের হক আদায় করে, তখন তার অন্তরে নেমে আসে অনন্য নুর। সেই নুর তার চিন্তা, কথা, আচরণ এবং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে ফুটে ওঠে।

মুমিন জানে, এই পৃথিবী পরীক্ষার জায়গা। তাই সুখে সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে, আর দুঃখে ধৈর্যধারণ করে। সে মানুষের ক্ষতি করে না, কাউকে অপমান করে না, হিংসা-বিদ্বেষে জড়ায় না। বরং সে ক্ষমা করতে শেখে, মানুষের উপকার করতে ভালোবাসে এবং সবসময় নিজের চরিত্রকে সুন্দর করার চেষ্টা করে। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমাদের মধ্যে চরিত্রের দিক থেকে যে সর্বোত্তম, সেই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। কেয়ামত দিবসে সে আামার সবচেয়ে কাছে অবস্থান করবে। (সুনানে তিরমিজি ২০২৪)

যে ব্যক্তি নিজের চোখ, কান, জিহ্বা ও হৃদয়কে গুনাহ থেকে হেফাজত করে, আল্লাহ তার জীবনকে বরকতময় করে দেন। আজকের যুগে ফেতনা ও পাপের মহড়া চারদিকে ছড়িয়ে আছে। মোবাইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, হারাম সম্পর্ক, মিথ্যা ও অশ্লীলতা মানুষের অন্তরের আলো নিভিয়ে দিচ্ছে। তাই একজন সচেতন মুমিন সবসময় নিজেকে হিসাবের মধ্যে রাখে। সে মনে রাখে, একদিন তাকে আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে।

জীবনকে আলোয় ভরাতে হলে তওবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ ভুল করবে, গুনাহ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভালো এবং আলোকিত মানুষ সেই, যে নিজের ভুল বুঝতে পেরে আল্লাহর কাছে ফিরে আসে। আন্তরিক তওবা মানুষের হৃদয়কে পরিষ্কার করে দেয় এবং নতুনভাবে জীবন শুরু করার শক্তি দেয়। আল্লাহতায়ালা তার বান্দার তওবা খুব ভালোবাসেন।

একজন মুমিনের জীবন শুধু নিজের জন্য নয়, সে সমাজের জন্যও কল্যাণের উৎস হয়। সে অন্যায়ের প্রতিবাদ করে, অসহায়ের পাশে দাঁড়ায়, পিতা-মাতার খেদমত করে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে এবং মানুষের মধ্যে শান্তি ছড়িয়ে দেয়। এমন মানুষ পৃথিবীতেও সম্মান পায় এবং আখেরাতেও সফল হয়।

জান্নাত কোনো সাধারণ প্রতিদান নয়। এটি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত। সেখানে নেই কোনো কষ্ট, ভয় কিংবা দুঃখ। সেখানে থাকবে অনন্ত শান্তি ও সুখ। আর সেই জান্নাত লাভ করবে তারাই, যারা ইমান ও নেক আমলের ওপর অটল থাকবে।

সেই সুখের জান্নাতে যেতে হলে আপনাকে কিছু আমল করতে হবে। নিজের জীবনকে সাজাতে হবে আল্লাহর রঙে। একজন মুমিনকে জান্নাতে যেতে হলে কী কী কাজ করতে হবে, সেই দিকনির্দেশনা প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এক হাদিসে দিয়ে গেছেন। সে পথে চলার জন্য মানুষকে আহ্বানও করেছেন।

হজরত মুয়ায ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। একদিন চলার সময় আমি তার নিকটবর্তী হয়ে গেলাম। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমাকে এমন একটি আমল সম্পর্কে অবহিত করুন, যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে এবং জাহান্নাম থেকে দূরে সরিয়ে দেবে। তিনি বললেন, তুমি তো বিরাট একটা বিষয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে। তবে আল্লাহতায়ালা যার জন্য তা সহজ করে দেন তার জন্য বিষয়টি অবশ্য সহজ। আল্লাহর ইবাদত করবে, তার সঙ্গে কোনো কিছু শরিক করবে না। নামাজ আদায় করবে, জাকাত প্রদান করবে, রমজানের রোজা পালন করবে এবং বায়তুল্লাহর হজ করবে।

এরপর তিনি বললেন, সব কল্যাণের দ্বার সম্পর্কে কি আমি তোমাকে দিকনির্দেশনা দেব? রোজা হলো ঢালস্বরূপ, পানি যেমন আগুন নিভিয়ে দেয় তেমনি সদকাও গুনাহসমূহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। আর হলো রাতের নামাজ, এরপর তিনি তেলাওয়াত করলেন, তারা (মুমিনরা গভীর রাতে) শয্যা ত্যাগ করে তাদের রবকে ডাকে আশা ও আশঙ্কায় এবং আমি তাদের যে রিজিক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে। কেউই জানে না তাদের জন্য সুখকর কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ। (সুরা সাজদা ১৬-১৭)

তারপর নবীজি (সা.) বললেন, তোমাকে এই সব কিছুর মাথা ও বুনিয়াদ এবং সর্বোচ্চ শীর্ষ আমল সম্পর্কে অবহিত করব কি? এরপর মুয়াজ (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, অবশ্যই! তিনি বললেন, সব কিছুর মাথা হলো ইসলাম, বুনিয়াদ হলো নামাজ। আর সর্বোচ্চ শীর্ষ আমল হলো জিহাদ। এরপর বললেন, এ সব কিছুর মূল পুঁজি সম্পর্কে তোমাকে অবহিত করব কি? আমি বললাম, অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল!

তিনি তার জিহ্বা ধরে বললেন, এটিকে সংযত রাখো। আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী, আমরা যে কথাবর্তা বলি সেই কারণেও কি আমাদের পাকড়াও করা হবে? তিনি বললেন, হে মুয়াজ! লোকদের অধঃমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ্ত হওয়ার জন্য এই জবানের কামাই ছাড়া আর কি কিছু আছে নাকি? (জামে তিরমিজি ২৬১৭)

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও, ঢাকা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত