লাল মাটি, অনাবৃষ্টি এবং তপ্ত রোদে জর্জরিত রাজস্থানের প্রত্যন্ত গ্রামের এক কৃষকপুত্র স্বপ্ন দেখেছিলেন রাসায়নিক সার ছাড়াই ফসল ফলানো এবং মানুষের কাছে বিষমুক্ত খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার। পরিবার তাকে পাগল বলেছিল, প্রতিবেশীরা উপহাস করেছিল। নষ্ট হয়েছিল প্রথম বছরের ফসলও। রাজস্থানের হুকুমচাঁদ তারপরও হাল ছাড়েননি। অবশেষে তার পরিশ্রমে গড়ে ওঠা পরিবর্তিত জমির ফসল লাল চেরি টমেটো যাচ্ছে দিল্লি-মুম্বাইয়ের পাঁচতারা হোটেলে এবং জৈব গম রপ্তানি হচ্ছে জার্মানি, জাপান ও সুইজারল্যান্ডে। বিশ্ব আজ তাকে সম্বোধন করছে ‘জৈব কৃষির বিপ্লবী’ হিসেবে। লিখেছেন আয়াজ আহমদ
যেভাবে শুরু
হুকুমচাঁদ পাতিদার রাজস্থানের ঝালওয়ার জেলার মানপুরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্মেছিলেন সমৃদ্ধ কৃষি পরিবারে। ২০০৫ সালে হুকুমচাঁদ পাতিদার তার ২৫ হেক্টর জমির একটি ছোট অংশে জৈব চাষের পরীক্ষা শুরু করেন। পরিবার ও বন্ধুরা লোকসানের আশঙ্কায় বিরোধিতা করলেও তিনি থামেননি। প্রথম কয়েক বছর উৎপাদন তেমন ভালো হয়নি; পরিবারের কটূক্তি বাড়তে থাকলেও পাতিদার মনোবল হারাননি। জমিতে হাইব্রিড বীজ ও কীটনাশক ব্যবহার করতে রাজি হননি। হাল না ছেড়ে তিনি পরবর্তী মাসগুলোতে জৈব সার তৈরির গবেষণায় মনোযোগ দেন।
শুরু হলো গবেষণা
হুকুমচাঁদ বেশি দূর পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষালাভ করেননি। মাত্র দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। সেই তিনিই জৈব কৃষি বিষয়ে গবেষণার জন্য পড়তে শুরু করলেন বই, গবেষণা পত্রিকা। পড়াশোনা করতে লাগলেন উদয়পুর ও দেরাদুনের এশিয়ান এগ্রি হিস্ট্রি ফাউন্ডেশনে গিয়ে। উপলব্ধি করলেন রসায়ন, জ্যোতির্বিদ্যা, ভূতত্ত্ব, মাটিবিদ্যা এবং বাজার সম্পর্কে না জেনে জৈব কৃষি নিয়ে সফলতা লাভ করা যাবে না। দশম শ্রেণি পাস কৃষক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র পড়ে নিজের জ্ঞানকে করলেন সমৃদ্ধ। জ্ঞানের সেই শক্তি দিয়েই তিনি সাফল্য লাভ করেন। রাসায়নিক সার আর হাইব্রিড বীজ ছেড়ে তিনি গোবর, শুকনো পাতা, খড়, কেঁচো, সবজির খোসা দিয়ে তৈরি করলেন জৈব সার। তারপর মাটি ভালো করে কুপিয়ে সেই সার মিশিয়ে দিলেন। কড়া রোদ যেন জমির আর্দ্রতা সব টেনে না নেয়, তার জন্য খড় বিছিয়ে দিলেন ওপরে। সেই জমিতে চাষ করলেন রসুন, মেথি, ধনে-সহ নানা রকম সবজি। পরিবারের অন্য সদস্যরাও ততদিনে দেখেছেন দীর্ঘদিন ধরে রাসায়নিক সারের সবজি খাওয়ার ফলে গবাদি পশুরাও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। তারাও তখন বুঝতে শুরু করলেন, জৈব কৃষিতেই রয়েছে মুক্তি। অবশেষে পরিবারও হুকুমচাঁদকে পুরো জমিতে জৈব চাষের অনুমতি দেন।
উড়ল হুকুমচাঁদের বিজয় নিশান
পরিবারের অনুমতি পাওয়ার পর পারিবারিক ৪০ একর জমিতে জৈব চাষ করতে শুরু করেন হুকুমচাঁদ। বাজার যাচাই করে ঠিক করলেন কোনো ফসলের চাহিদা শুধু ভারতে নয়, রয়েছে বিশ্বব্যাপী। জমি অনুযায়ী ফসল চাষ করে বদলে ফেললেন কৃষকের ভাগ্য। প্রথমেই তার ফসলের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য রাজস্থান স্টেট অর্গানিক সার্টিফিকেশন এজেন্সিতে পাঠান। সেখান থেকে তার ফসলের গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেওয়া সার্টিফিকেট। এই সার্টিফিকেটের সাহায্যে হুকুমচাঁদ ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত, এমনকি আমেরিকা ও অন্যান্য দেশেও জৈব ফসল রপ্তানির অনুমতি পান। প্রথম বছরই হুকুমচাঁদ লাভ করেন ২০ লাখ টাকা। আমেরিকার পাশাপাশি সুইজারল্যান্ড, জার্মানি এবং জাপানেও রপ্তানি হয় তার ফসল। তার জমি থেকে প্রতি বছর দু’হাজার কিলোগ্রামেরও বেশি রসুন যায় সুইজারল্যান্ডে, ৫০ টন মেথি যায় জার্মানিতে আর ১০০ টন ধনে গুঁড়া যায় জাপানে। আজ পাতিদারের জৈব পণ্য প্রচলিত চাষের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। তার গমের ফলন প্রতি হেক্টরে ৩৮ থেকে ৪২ কুইন্টাল, যেখানে প্রচলিত চাষে তা ২৮ থেকে ৩২ কুইন্টাল। জৈব গম চাষে প্রচলিত চাষের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ কম পানি লাগে।
এ পর্যন্ত ২৮টি দেশের ক্রেতারা তার খামার পরিদর্শনে এসেছেন। কৃষি নিয়ে গবেষণাকে এগিয়ে নিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বামী বিবেকানন্দ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ ফার্ম। মানপুরার এই কৃষক এখন সারা বিশ্বের জৈব কৃষির এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ঝালওয়ার জেলার ২২টি গ্রামে পাতিদারের কৃষি মডেল বাস্তবায়ন করেছে, যেখানে প্রায় ৪,০০০ কৃষক অংশ নিয়েছেন। ২০২২ সালে তাকে আইসিএআর-এর অধীনে
কৃষি মন্ত্রণালয়ের ১৪ সদস্যের জাতীয় কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই কমিটি স্কুল বোর্ড ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জৈব কৃষির পাঠ্যক্রম তৈরির কাজ করছে। দশম শ্রেণি পর্যন্ত পড়া একজন কৃষক এখন দেশের শিক্ষানীতি নির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন। শুধু তাই নয়, ভারত সরকার জৈব কৃষিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৮ সালে তাকে চতুর্থ সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রীতে ভূষিত করে। তার জীবন কাহিনি স্টার প্লাসের সত্যমেব জয়তে অনুষ্ঠানে প্রচারিত হয়েছিল। অভিনেতা আমির খান যখন তাকে সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালেন, তখন থেকে সারা ভারত পরিচিত হলো এই নীরব বিপ্লবীর সঙ্গে। এই বর্ষীয়ান কৃষি বিপ্লবী এখন তার অর্জিত জ্ঞান অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে ব্যস্ত সময় ব্যয় করেন।
