প্রতি বছর কোরবানির ঈদ এলেই সড়কের ওপর বসে অস্থায়ী চামড়ার বাজার। তবে বেশি চামড়া কেনাবেচা হয় খুলনা মহানগরীর শেখপাড়া বাজারে। ফলে এ বাজারের একটি অংশে পরপর কয়েকটি দোকান থাকায় এলাকাটি শেখপাড়া চামড়াপট্টি নামে পরিচিত। এদিকে এ এলাকায় কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় বিপাকে ব্যবসায়ীরা। ব্যবসার সুবিধায় তারা এ এলাকায় একটি স্থায়ী চমড়া মার্কেট স্থাপনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত সাত বছরেও চামড়া বেচাকেনার জন্য নতুন কোনো বাজার তৈরি হয়নি। সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় প্রতি বছর কোরবানির ঈদে বিপুলসংখ্যক চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েন ব্যবসায়ীরা। এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে ট্যানারি ব্যবসায়ীদের মন্দা যাচ্ছে। দেনার দায়ে জর্জরিত ব্যবসায়ীরা। ফলে ব্যবসা গুটিয়েছে অসংখ্য ব্যবসায়ী। আর যারা টিকে আছে তাদের দাবি, স্থায়ী মার্কেট আর ন্যায্য মূল্যে চামড়া বিক্রির ব্যবস্থার।
ব্যবসায়ীরা বলেছেন, খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) কাছে বারবার চামড়া বেচাকেনার জন্য পৃথক মার্কেট তৈরির দাবি জানানো হয়েছে। তখন বলা হয়েছিল আধুনিক কসাইখানা নির্মাণ হচ্ছে। ওই কসাইখানায় আশপাশে চামড়ার জন্য পৃথক মার্কেট তৈরি করার বিয়ষটি বিবেচনায় রয়েছে। কিন্তু আশ্বাস দিয়েও কেসিসি কথা রাখেনি। সংকট নিরসনে একটি স্থায়ী চামড়ার মার্কেট স্থাপনের দাবি করা হলেও এখনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যেই চলে এসেছে কোরবানির ঈদ। এবারও বিপুলসংখ্যক চামড়া সংরক্ষণ নিয়ে সমস্যায় পড়তে হবে। এ ছাড়া খুলনার চামড়া ব্যবসায়ীদের বিপুল পরিমাণ টাকা ঢাকার ট্যানারি মালিক ও আড়তদারদের কাছে বকেয়া রয়েছে। বকেয়া টাকা কেউ পরিশোধ করেননি। ফলে খুলনার ব্যবসায়ীরা এবারও শঙ্কায় রয়েছেন।
শেখপাড়া চামড়াপট্টির ব্যবসায়ী বাবর আলী অভিযোগ করে বলেন, ‘৩৫ জনের মতো ব্যবসায়ী এখানকার ১০টির মতো দোকানে ব্যবসা করতাম। বাড়িওয়ালারা এখানে চামড়ার দোকান রাখতে নারাজ ছিল। পরে সব দোকান আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যায়। যার কারণে আমরা দোকান রাখতে পারিনি। ট্যানারি কোম্পানিকে চামড়া দিলেও টাকা না পাওয়ায় আমাদের বিপাকে পড়তে হয়েছে। ফলে অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘আশপাশে আমাদের মার্কেট দরকার। মার্কেটের ব্যবস্থা করা হলে আমরা ভালোমতো ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারব। একই সঙ্গে সরকার যেভাবে চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেভাবে চামড়া কেনার ব্যবস্থা করলে আমরা উপকৃত হব।’
খুলনা কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক কার্তিক ঘোষ বলেন, ‘সংরক্ষণের জায়গা না থাকায় বিপাকে পড়তে হয় ব্যবাসয়ীদের। এখনো মানুষের কাছে নামকরা জায়গা হচ্ছে চামড়াপট্টি। কিন্তু এখন সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। অনেক ব্যবসায়ী ছিল, যারা সারা বছর এই কাজ করত। তখন মহাজন ছিল। আর মৌসুমে ফড়িয়ারা ব্যবসায় করত। এখন আর মহাজন আর ফড়িয়া বলে কিছু নেই। এখন সবাই ব্যবসায়ী।’
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম ঢালী বলেন, ‘আগে কোরবানির সময়ে ৬০-৭০ হাজার চামড়া সংগ্রহ করতাম। আমাদের ৬০-৭০ জন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী ছিল। এখন হাতে গোনা কয়েকজন ব্যবসা করছে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। কেউ কেউ ব্যবসা ছেড়ে ভ্যানে মালামাল বিক্রি করছে। অনেকের ব্যবসা ধ্বংস আর ঋণের চিন্তায় রোগাক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ৮-১০ জন ব্যবসায়ী কোনো রকম ব্যবসা টিকিয়ে রেখেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘খুলনায় নেই আধুনিক জবাইখানার ব্যবস্থাও। সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ব্যবসায়ীরা ধারদেনা করে, সোনা-গহনা বিক্রি করে, ব্যক্তি ঋণ নিয়ে অর্থ খাটিয়ে চামড়া কেনে। অথচ এই চামড়া ট্যানারিতে দেওয়ার পর কোটি কোটি টাকা বকেয়া রাখে। এখনো পর্যন্ত দেয়নি। ফলে আমরা পথে বসে গেছি। এ ছাড়া খুলনায় এতদিনেও গড়ে ওঠেনি একটি কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের মার্কেট। চামড়া ব্যবসায়ীদের এবং এই শিল্প বাঁচাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’
খুলনা সিটি করপোরেশন প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা চামড়ার মার্কেটের কথা জানালে সিটি করপোরেশন এ ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করবে। কোথায় করা যায় এটিও আমরা ভেবে দেখব।’
