বিশ্বকাপে নেইমার থাকবেন কি থাকবেন না গত কয়েক মাস ধরে ফুটবল দুনিয়ার অলিগলিতে এর চেয়ে বড় কোনো ‘সাসপেন্স’ সম্ভবত ছিল না। চোট, অস্ত্রোপচার, ফিটনেস ফিরে পাওয়ার লড়াই আর মাঠের বাইরের হাজারো গুঞ্জন পেরিয়ে অবশেষে যবনিকা নামল সেই নাটকের। রিও ডি জেনিরোর ‘মিউজিয়াম অব টুমরো’তে গত রাতে এক জমকালো সংবাদ সম্মেলনে ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি যখন ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য ২৬ জনের চূড়ান্ত তালিকা পড়লেন, সেখানে সবচেয়ে কাক্সিক্ষত নামটা তারই ছিল। অবশেষে আনচেলত্তির কণ্ঠে উচ্চারিত হলো সেই নাম নেইমার জুনিয়র।
হ্যাঁ, নন্দিত এবং কখনো কখনো নিন্দিত এই মহাতারকাকে নিয়েই হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) মিশনে যাচ্ছে ব্রাজিল। দল ঘোষণার অনুষ্ঠানে যখন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের নাম উচ্চারণ করলেন আনচেলত্তি, করতালির গর্জনে মুখরিত হয়ে উঠল চারপাশ। মিলনায়তন জুড়ে বয়ে গেল আনন্দের সুনামি।
বার্সেলোনা ও পিএসজির সাবেক এই ফরোয়ার্ডকে দলে ডাকার আগে কোচ আনচেলত্তিও কম পরীক্ষা নেননি। ২০২৩ সালে উরুগুয়ের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে হাঁটুতে চোট পাওয়ার পর থেকে নেইমার ছিলেন জাতীয় দলের রাডারের বাইরে। চোট আর ফিটনেসের দোলাচলে গত মার্চে ফ্রান্স ও ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচেও তাকে বাইরে রেখেছিলেন ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড। তার ফিটনেস নিয়ে কোচের মনে ছিল একরাশ সংশয়।
তবে সৌদি আরবের চোটজর্জর অধ্যায় চুকিয়ে গত জানুয়ারিতে নেইমার ফিরে আসেন শৈশবের ক্লাব সান্তোসে। আর সেখানেই যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পান। চেনা আঙিনায় টানা খেলে এবং নিজের ফিটনেসের দারুণ উন্নতি প্রমাণ করেই আদায় করে নিলেন আনচেলত্তির ‘ছাড়পত্র’। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২২ বিশ্বকাপের পর এবার ক্যারিয়ারের চতুর্থ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা (১২৮ ম্যাচে ৭৯ গোল)।
নেইমারকে কোনো বিশেষ ‘তারকা’ সুবিধা না দিয়ে দলের বাকি ২৫ জনের মতোই সাধারণ একজন ফুটবলার হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছেন কোচ। তিনি স্পষ্ট করেন, ‘আমরা পুরো বছরজুড়েই নেইমারের মূল্যায়ন করেছি। শেষ সময়টাতে ও টানা ম্যাচ খেলছিল এবং ওর শারীরিক অবস্থার বেশ উন্নতি হয়েছে। তবে দলের বাকি ২৫ জন খেলোয়াড়ের যে ভূমিকা, ওর দায়বদ্ধতাও ঠিক তাই। ও শুরুর একাদশে খেলতে পারে, নাও খেলতে পারে, বদলি হিসেবে নামা কিংবা বেঞ্চেও বসে থাকতে পারে। ও অভিজ্ঞ, দলের সবাই ওকে ভালোবাসে। ও ড্রেসিংরুমের পরিবেশ দারুণ রাখতে এবং দলকে সাহায্য করতে পারবে।’
স্কোয়াডে নেইমারের নাম যতই বড় হোক না কেন, প্রথম একাদশে জায়গা পেতে হলে তাকে অনুশীলনে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন আনচেলত্তি। এটি মূলত কোচের একটি মনস্তাত্ত্বিক ছক, যেন নেইমার নিজের সেরাটা উজাড় করে দিতে বাধ্য হন। আনচেলত্তি বলেন, ‘আমি কোনো জাদুকর নই। আমি একজন সাধারণ শ্রমিক, যে এই ফুটবলের ব্যবসায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে জড়িত। এই দলটির ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে যে তারা বিশ্বের যেকোনো দলের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারবে। আমাদের নিজেদের কাছে নিজেদের চাওয়াটা অনেক বড় হতে হবে, যেন তা আমাদের অনুপ্রাণিত করে।’
দল ঘোষণার পর থেকে ভক্তদের মনে প্রশ্ন জেগেছে নেইমার মাঠে ঠিক কোন পজিশনে খেলবেন? আনচেলত্তি তার এই পরিকল্পনা কিছুটা ফাঁস করে জানিয়েছেন, তিনি নেইমারকে একজন ‘অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার’ (১০ নম্বর পজিশন) হিসেবে দেখছেন, যিনি মূল স্ট্রাইকারের ঠিক পেছনে খেলবেন অথবা প্রয়োজনে ‘ফলস নাইন’ হিসেবেও মাঠ মাতাতে পারেন।
ব্রাজিলের ঘোষিত বিশ্বকাপ স্কোয়াডে নেইমারের প্রত্যাবর্তন বড় স্বস্তি দিলেও, দলটির বেশ কয়েকজন ফুটবলারের ইনজুরি ও স্কোয়াড থেকে আকস্মিক বাদ পড়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের দুর্দান্ত ফর্মে থাকা তারকা ফরোয়ার্ড রদ্রিগো, রক্ষণভাগের অন্যতম সেরা ভরসা এদের মিলিতাও এবং চেলসির তরুণ উইঙ্গার এস্তেভাও উইলিয়ান ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপ থেকে পুরোপুরি ছিটকে গেছেন। এদের অনুপস্থিতি আনচেলত্তির পরিকল্পনায় বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে, চেলসির আক্রমণভাগের তারকা জোয়াও পেদ্রো এবং শক্তিশালী মিডফিল্ডার আন্দ্রে সান্তোস যারা আগের উইন্ডো বা বাছাইপর্বে নিয়মিত ডাক পাচ্ছিলেন, তাদের চূড়ান্ত স্কোয়াডে না থাকাটা ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বড় এক বিস্ময় হিসেবে এসেছে। বোর্নমাউথের তরুণ রায়ান ভিতরকে দলে নিয়ে চমকে দিয়েছেন আনচেলত্তি।
আগামী ২৭ মে থেকে ব্রাজিলের তেরেসোপোলিসের ‘গ্রানজা কোমারি’-তে কন্ডিশনিং ক্যাম্প শুরু হবে।
বিশ্বকাপের ব্রাজিল দল
গোলরক্ষক : আলিসন (লিভারপুল), এদেরসন (ফেনারবাচে), ওয়েভারতন (গ্রেমিও)
ডিফেন্ডার : অ্যালেক্স সান্দ্রো (ফ্ল্যামেঙ্গো), ব্রেমার (জুভেন্টাস), দানিলো (ফ্ল্যামেঙ্গো), দগলাস সান্তোস (জেনিত), গ্যাব্রিয়েল (আর্সেনাল), রজার ইবানেজ (আল-আহলি), লিও পেরেইরা (ফ্ল্যামেঙ্গো), মার্কিনিওস (পিএসজি), ওয়েসলি (রোমা)
মিডফিল্ডার : ব্রুনো গিমারেস (নিউক্যাসল), কাসেমিরো (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), দানিলো (বোতাফোগো), ফাবিনিও (আল-ইত্তিহাদ), লুকাস পাকেতা (ফ্ল্যামেঙ্গো)
ফরোয়ার্ড : এনদ্রিক (লিওঁ), গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি (আর্সেনাল), ইগর থিয়াগো (ব্রেন্টফোর্ড), লুইস এনরিকে (জেনিত), মাথেউস কুনিয়া (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড), নেইমার (সান্তোস), রাফিনিয়া (বার্সেলোনা), রায়ান (বোর্নমাউথ), ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (রিয়াল মাদ্রিদ)।
