ভালোবাসা ও কান্নার শহর মক্কা

আপডেট : ২১ মে ২০২৬, ০৪:৫৮ পিএম

পবিত্র হজ ও ওমরাহর সফর নিয়ে কিছু লিখতে গেলেই দম বন্ধ হয়ে আসে। সৌভাগ্যের এই সফরের কোন দিক নিয়ে লিখব, কোন দিক বাদ যাবে, এটা মেলাতে পারি না। আবার মনে হয়, থাক না সবকিছু নিয়েই কেন লিখতে হবে? কিছু বিষয় একান্ত নিজের থাকুক, সবকিছু প্রকাশ করতে হবে কেন? এমন সব ভাবনার মধ্যেই কিছু লিখতে হলো। হজ-ওমরাহর সফর নিয়ে আমার অনুভূতি একটু ভিন্ন, একটু আলাদা। যখনই এই সফর নিয়ে কোনো আলোচনা হয়, স্মৃতিচারণ করি, তখনই মনের মধ্যে খুশি, ভয়, উত্তেজনা, বিষণ্ণতা, আশঙ্কা, প্রাপ্তি ও বিরহ একসঙ্গে জেগে ওঠে। এত এত আবেগ-অনুভূতি মাথায় ভর করে, যা বলে বা লিখে বুঝানো মুশকিল।

 

২০১৭ সাল। প্রথম হজের সফর। কাফেলার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। তবে অচেনা শহরে যাত্রায় একবারও মনে হয়নি আমার সাথীরা অপরিচিত। সকালে হজক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু, ঢাকা বিমানবন্দরে উড়োজাহাজের অপেক্ষা, লম্বা জার্নি, জেদ্দা বিমানবন্দর নেমে প্রায় পাঁচ-ছয় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করে দুই ঘণ্টার বাস জার্নি শেষে মক্কায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল। টানা ২৪ ঘণ্টার সফরে ক্ষুধা-তৃষ্ণা ও ক্লান্তি ছাপিয়ে মনের মধ্যে বারবার উঁকি দিচ্ছে পবিত্র কাবার ছবি। মক্কার অলিগলি। ইবরাহিম (আ.)-এর গোড়াপত্তন করা শহরের দৃশ্য, রাসুল (সা.)-এর বেড়ে ওঠা শহরের রাস্তাঘাট।

হোটেলে পৌঁছে অজু-নাস্তা শেষে গন্তব্য কালো গিলাফে ঢাকা পবিত্র কাবা। ধীর পায়ে কাবার দিকে এগিয়ে চলছি, কবুতরের ওড়াউড়ির দৃশ্য, ইহরাম পরিহিত মানুষের আনাগোনা আর ক্লক টাওয়ারের দৃশ্য দেখতে দেখতে চলে আসি কাবার বহিরাঙ্গনে। কাবার বহিরাঙ্গনের সাদা আঙিনায় পা রাখতেই মনে ভিন্ন শিহরণ জেগে ওঠে। কিন্তু না আরও সামনে যেতে হবে। সবকিছু নতুন, চোখের সামনে দিনের আলোয় ঝলমল করছে মসজিদে হারামের বিশাল স্থাপনা, অপূর্ব কারুকাজ আর মানুষের ভিড় ছাপিয়ে বাদশাহ আবদুল আজিজ গেট দিয়ে মসজিদে হারামের ভেতরে প্রবেশ করি। কিছুক্ষণ পর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে একটু সামনে গিয়ে মাথা তুলে দেখি, আমি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে আলহামদুলিল্লাহ।

আল্লাহর শোকর, মনে হলো আমার জীবন সার্থক, দুচোখে বেয়ে নেমে আসছে কৃতজ্ঞতার পানি। আমি কাবার সামনে দাঁড়িয়ে, এটা স্বপ্ন নয়। দয়াময় আল্লাহ আমাকে ডেকে এনেছেন তার ঘরে। কৃতজ্ঞতায় সেজদায় লুটিয়ে প্রাণভরে দোয়া করি। কাবা দেখার পর শুরু হওয়া এই কান্না যেন থামতেই চায় না। এ কান্না আনন্দের, এ কান্না কৃতজ্ঞতার, এ কান্না ক্ষমা চাওয়ার, এ কান্না গুনাহ মাফের।

প্রথম হজের ৪২ দিনের সফরে দেখেছি, মক্কা-মদিনা মানেই কান্নার শহর। মাতাফে মানুষ কাঁদছে, তাওয়াফে কাঁদছে, সাঈতে কাঁদছে, নামাজে কাঁদছে, কোরআন তেলাওয়াতে কাঁদছে, কাবার সামনে বসে বসে দুহাত তুলে দোয়ায় কাঁদছে। দলে দলে কিংবা একাকী মানুষ আল্লাহর রহমত প্রার্থনা করছে, গুনাহ মাফের কথা বলছে, মনের চাওয়াগুলো নিবেদন করছে চোখের পানি ফেলে। এ শহরের ধূলিকণার সঙ্গে মিশে আছে কান্নার পানি। তৃষ্ণাকাতর শিশু ইসমাইল (আ.)-এর কান্নার সঙ্গে উদ্বিগ্ন মা হাজেরা (আ.)-এর কান্নার মধ্য দিয়ে যে শহরের সূচনা, সেখানে মানুষ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসবেন, চোখের পানি ঝরাবেন, এটাই রীতি, এটাই পরম্পরা।

হজের দিনগুলোতে মিনার তাঁবু থেকে সমস্বরে কান্নার আওয়াজ মনে হয় এখনো কানে আসছে। আর আরাফাতের ময়দানে তো মানুষ একজন আরেকজনের দিকে তাকাতেই ভুলে যায় কান্নার কারণে। মুজদালিফায় রাতযাপনে কেউ ঘুমায়, কেউ অঝোরে কাঁদে। কান্না থামে না ফরজ তাওয়াফ, বিদায়ি তাওয়াফ ও নফল তাওয়াফে।

কান্নার আবহে মসজিদে হারামের মিনার, গেট, কার্পেট, লাইট, জমজমের কনটেইনারগুলোকে আপন মনে হয়। মক্কায় যাত্রা শুরুর পরই ভাবতে থাকি, এই শহরকে কয়দিন পর থেকেই মিস করব। জানতাম, এই সফর শুরু না হতেই শেষ হয়ে যাবে। কয়দিন পর পুরো ব্যাপারটাকেই একটা স্বপ্ন মনে হবে। আরও জানতাম, এখানে আমাকে আবার ফিরে আসতে হবে। বারবার...।

মসজিদে হারামের ভেতর, এক গেট থেকে আরেক গেট, এক ফ্লোর থেকে আরেক ফ্লোর, মসজিদে হারামের চারপাশের অলিগলি, দোকানপাট, ফাইভস্টার হোটেলের শপিংমল আর পারফিউমের দোকানগুলোতে ঘুরে বেড়ানোর সময় সব যেন চোখে মাখিয়ে নিতাম। আহা! কী যে ঘোর! কী যে আবেদন!

সেই আবেদনই আরও কয়েকবার টেনে নিয়েছে মক্কা। কিন্তু প্রতিবারই নতুন মনে হয়েছে এই শহরকে। মসজিদে হারামের কাছে এখন আর পাহাড় তেমন নেই বললেই চলে। যাও দুয়েকটা আছে তাও কেটেকুটে সাফ করে ফেলছে। অদূরে পাহাড়গুলো ছুঁয়ে দেখতে মন চায় শুধু। ভাবতেই কেমন লাগে, এই পাহাড়গুলো আল্লাহর নবীকে দেখেছে, আর নবীর দৃষ্টিও এসব পাহাড়ে পড়েছে! এসব পাহাড় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষী হয়ে আছে। বাকি আর কিছুই নেই আগের যুগের। প্রতিনিয়ত এ শহর বদলাচ্ছে, উঁচু উঁচু ইমারতে ঢেকে গেছে মক্কা শহর আর মক্কার রাস্তাঘাট। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি, সেটা হলো কান্নার সুর। সেটা রয়ে গেছে আগের মতোই।

প্রকৃতি কতটা রুক্ষ হতে পারে, তা মনে হয় মক্কা ও মিনা প্রান্তরে না গেলে বুঝতাম না। কড়া তীব্র রোদ আর আগুনের হলকার মতো লু হাওয়ায় শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে যায়! অথচ ঠা-া লাগলে এই আগুনের মতো রোদটাই বড় মনোরম লাগে। সেখানেও মানুষ কাঁদে। নানা ভাষার নানা রঙের লোক শুধু কাঁদে, ভাষা বুঝি না, কথা বুঝি না, শুধু বুঝি সবাই আল্লাহর রহমত প্রত্যাশী, ক্ষমা প্রত্যাশী।

মক্কা নগরী বড় অদ্ভুত এক শহর! কেন যেন মনে হতো সব আবেগের বহিঃপ্রকাশ এখানে একটাই কান্না। আগেই বলেছি, চারপাশের সবাই কাঁদে। কেউ লুকিয়ে, কেউ নীরবে, কেউ সরবে। কেউ আল্লাহর ঘর জড়িয়ে, কেউ কাবার গিলাফ ধরে, কেউ কাবাকে জড়িয়ে, কেউ কাবার দরজা ধরে কাঁদে। আচ্ছা, মক্কাকে কি ‘কান্নার শহর’ বলা যাবে? নাকি, কান্নাকে যার যার একান্ত বিষয় হিসেবে রেখে দেওয়াই ভালো?

প্রথমবার মক্কা থেকে বিদায়ের কথা মনে হলে এখনো কান্না পায়। কথা ছিল, সকাল ১০টায় আমাদের বাস ছাড়বে মদিনার উদ্দেশ্যে। সবাই প্রস্তুত, কিন্তু গোলটা বাধে আমাকে নিয়ে। রাতেই সব গুছিয়ে ফজরের আগে মাতাফে চলে যাই, তখন স্বাভাবিক কাপড়ে মাতাফে যাওয়া যেত, ফজর পড়ে তাওয়াফ করছি তো করছি, মনে নেই হিসাব। শুধু এতটুকু জানি, একটু পর আমাকে এই কাবা ছেড়ে চলে যেতে হবে, যতক্ষণ আছি দেখি কাবাকে, মাতাফের সাদা মার্বেলে হাঁটি প্রাণ ভরে। আরেক ঢোক জমজমের পানি খাই তৃষ্ণা মেটাতে। এই তো চলে যাবে, আরেকবার তাওয়াফ করি, একটু গিলাফটা জড়িয়ে ধরি, কী যেন বলা বাকি ছিল আহকামুল হাকিমিনের কাছে, সেটা বলে যাই, এমন করতে করতে লম্বা সময় পেরিয়ে যায়।

এদিকে মুয়াল্লিম সাহেব ফোন করেই যাচ্ছেন, আমিও বের হই হই করে মসজিদে হারামের উম্মে হানির খুঁটির কাছে দাঁড়িয়ে মোনাজাত শুরু করি। কাবা প্রাঙ্গণের শেষ মোনাজাত, কাবাকে দেখার শেষ সুযোগ। এটা ভেবে কলিজাটা মোচড় দিয়ে ওঠে, খুঁটির আড়ালে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখে গার্ডরা সবাইকে সরিয়ে দিলেও আমাকে আরেকটু সময় দেয়। শেষে কাঁধে নরম হাত রেখে বুঝিয়ে দেয়, সময় শেষ। এবার এখান থেকে উঠে যেতে হবে। এই কয়দিন তো হারাম শরিফে ওঠাবসার খেলা অনেক চলেছে, পুলিশ এখানে উঠিয়ে দেয়, ওখানে বসি। কিন্তু আজ? চোখের পানিতে কাবাকে বিদায় জানাতে হচ্ছে। শরীর চলতে চায় না, মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। তার পরও পা চালাতে হলো মিসফালার দিকে, যেখানে বাস দাঁড়িয়ে আছে। গন্তব্য সোনার মদিনা, রাসুলের শহর। সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

লেখক : যুগ্ম-সম্পাদক, বার্তা২৪.কম

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত