ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম হজ। সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য জীবনে অন্তত একবার হজ পালন ফরজ। হজ আত্মশুদ্ধি, আত্মসংযম, ত্যাগ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও নৈতিক পুনর্জাগরণের অনন্য প্রশিক্ষণ। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লাখো মুসলমান একত্রিত হন পবিত্র মক্কা নগরীতে, একই পোশাকে, একই কণ্ঠে উচ্চারণ করেন ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’।
এই আহ্বান মানুষকে আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে বের করে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও মানবিক মূল্যবোধের পথে পরিচালিত করে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আজ সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, হজ শেষে ব্যক্তি ও সমাজে কতটুকু নৈতিক পরিবর্তন আসে? হজ পালনকারীদের জীবনযাপন, আচরণ, পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ববোধে কি কাক্সিক্ষত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়? যদি হজ একজন মানুষকে গুনাহমুক্ত ও আত্মশুদ্ধির পথে পরিচালিত করে, তবে সমাজে দুর্নীতি, প্রতারণা, অনৈতিকতা, মিথ্যাচার, বৈষম্য ও সহিংসতার বিস্তার কেন কমছে না? এই প্রশ্নগুলো আমাদের ভাবিয়ে তোলে এবং আত্মসমালোচনার সুযোগ তৈরি করে।
হজের মূল শিক্ষা হলো আল্লাহভীতি অর্জন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা হজ ও ওমরাহ আল্লাহর জন্য পূর্ণ করো।’ এই নির্দেশনায় হজকে নিছক একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং আত্মিক পরিবর্তনের একটি মহাসুযোগ হিসেবে দেখা হয়েছে। একজন হজযাত্রী যখন ইহরাম পরিধান করেন, তখন তিনি পৃথিবীর সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে নিজেকে কেবল একজন মানুষ হিসেবে আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করেন। ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান-অক্ষম, শাসক-শাসিত সবাই একই পোশাকে দাঁড়ান। এই সাম্যের শিক্ষা যদি ব্যক্তি জীবনে বাস্তবায়িত হয়, তবে সমাজে শ্রেণিবৈষম্য, অহংকার ও সামাজিক বিভাজন অনেকটাই কমে যাবে।
হজের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা আত্মসংযম। হজের সময় ঝগড়া-বিবাদ, অসৎ আচরণ ও পাপাচার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ রয়েছে। এটি মানুষকে ধৈর্য, সহিষ্ণুতা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেকেই হজ শেষে আবার আগের অভ্যাসে ফিরে যান। কেউ দুর্নীতিতে জড়ান, কেউ ঘুষ গ্রহণ করেন, কেউ মিথ্যা বলেন, কেউ মানুষের অধিকার ক্ষুণœ করেন। অথচ হজের প্রকৃত উদ্দেশ্যই ছিল নিজেকে বদলে ফেলা এবং একজন নৈতিক, সৎ ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে ফিরে আসা।
‘হাজি’ পরিচয় অনেক সময় সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু প্রকৃত সম্মান কেবল নামের আগে ‘হাজি’ যুক্ত হওয়ার মধ্যে নয়, বরং তার চরিত্র, আচরণ ও নৈতিকতার মধ্যেই নিহিত। একজন সত্যিকারের হাজি হবেন নম্র, বিনয়ী, দয়ালু ও ন্যায়পরায়ণ। তিনি মানুষের প্রতি সুবিচার করবেন, প্রতারণা করবেন না, মিথ্যা বলবেন না এবং সমাজের দুর্বল মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু যদি হজের পরও ব্যক্তি তার স্বভাব পরিবর্তন না করেন, তবে হজের শিক্ষার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে না।
আজকের সমাজে নৈতিক সংকট একটি বড় বাস্তবতা। দুর্নীতি, লোভ, হিংসা, প্রতারণা, সামাজিক বৈষম্য ও মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের সামাজিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পরিবারে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমছে, ব্যবসায় সততার সংকট বাড়ছে, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ে দায়িত্বহীনতা স্পষ্ট হচ্ছে। এমন সময়ে হজের শিক্ষা হতে পারে এক শক্তিশালী নৈতিক পুনর্জাগরণের উৎস। যদি হাজিরা তাদের জীবনে হজের আদর্শ ধারণ করেন, তবে সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের ধারা শুরু হবে।
রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও হজের শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতা মানুষকে অহংকারী করে তুলতে পারে, কিন্তু হজ শেখায় বিনয় ও জবাবদিহিতা। একজন নেতা যদি হজ থেকে ফিরে জনগণের কল্যাণে নিজেকে আরও নিবেদিত করেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তবে তা সমাজে নৈতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে। কেবল ধর্মীয় পরিচয় প্রদর্শন নয়, বরং ন্যায়, সততা ও জনকল্যাণে কাজই হওয়া উচিত প্রকৃত পরিবর্তনের লক্ষণ।
ব্যবসা-বাণিজ্যে নৈতিকতার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন ব্যবসায়ী হজ পালন করে এসে যদি পণ্যে ভেজাল মেশান, মাপে কম দেন বা গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করেন, তবে তার হজের আত্মিক শিক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। একজন সরকারি কর্মকর্তা যদি হজের পরও ঘুষ গ্রহণ করেন বা দায়িত্বে অবহেলা করেন, তবে হজ তার জীবনে নৈতিক পরিবর্তন আনতে পারেনি। একইভাবে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবীসহ সব পেশাজীবীর ক্ষেত্রেই হজের শিক্ষা প্রতিফলিত হওয়া প্রয়োজন।
লেখক : মহাপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন
