অস্ট্রেলিয়া থেকে ইমুর মাধ্যমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ সামালের সঙ্গে যোগাযোগ হয় একটি আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের। সামালকে উচ্চ বেতনে অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে চক্রটি গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ১ মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপে বিকাশের মাধ্যমে ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। চক্রটি একপর্যায়ে সামালের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়। এতে সামাল নিঃস্ব হয়ে পড়েন। গত ১৫ মার্চ সরাইল থানায় মামলা করেন সামাল।
এভাবে সামালের মতো অনেক তরুণ বিভিন্ন এজেন্সি ও দালালের মাধ্যমে বেশি বেতনের চাকরি, উন্নত জীবনের প্রলোভনে মানব পাচারকারীর খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। আবার অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টায় সাগরে অনেকের সলিল সমাধি হচ্ছে। অনেকের আবার যাত্রাপথে লিবিয়া, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে চক্রের হাতে নির্যাতন ও অপহরণের শিকার হন। দেশ থেকে টাকা পাঠিয়ে কারও কারও মুক্তি মিললেও অনেকের ভাগ্যে নির্মম পরিণতি ঘটে। এসব ক্ষেত্রে গ্রামাঞ্চলের মানুষদের বেশি টার্গেট করা হয়। এক দেশের কথা বলে অন্য দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এভাবে মধ্যপ্রাচ্যে ও ইউরোপ-আমেরিকায় পাঠানোর নামে প্রতারকরা হাতিয়ে নিচ্ছে হাজার কোটি টাকা।
জানা যায়, প্রশাসন নতুনভাবে সাজাচ্ছে মানব পাচার প্রতিরোধব্যবস্থা। ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে কঠোর আইন। নিয়ন্ত্রণে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চলছে দফায় দফায় বৈঠক। প্রস্তুত হচ্ছে পাচারকারীদের তালিকা। এসব ঘটনার সঙ্গে ট্রাভেল এজেন্সির যোগসাজশ থাকায় তাদের বিরুদ্ধে সরকার হার্ডলাইনে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ২ হাজার ৪৯২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পাচারকারীদের তালিকা প্রায় প্রস্তুত করে এনেছে পুলিশের দুটি বিশেষ ইউনিট। বিশেষ করে গুরুতর অভিযোগ থাকা এজেন্সিগুলোতে বাড়তি নজর দিচ্ছে পুলিশ। তাছাড়া এজেন্সির কর্ণধারদের রাজনৈতিক মতাদর্শও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানবপাচার প্রতিরোধে আমরা কঠোর হচ্ছি। দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনতে নতুন আইন তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি মানবপাচারকারীদের ব্যাংক হিসাবও তলবের প্রক্রিয়া চলছে। এর সঙ্গে জড়িত ট্রাভেল এজেন্সির বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। কাউকে ছাড় না দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
ভয়ংকররূপে পাচরকারীরা : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, কঠোর নজরদারির মধ্যেও থেমে নেই মানবপাচার। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দেশে চাকরি দেওয়ার নাম করে মানুষ পাচার করা হচ্ছে। বিভিন্ন রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মানবপাচার বেশি হচ্ছে। লিবিয়া, ইতালি, ফ্রান্সসহ ইউরোপে চাকরি দেওয়ার কথা বলেই লোকজনকে নেওয়া হচ্ছে। গত এক বছরে ভূমাধ্যসাগর দিয়ে ইতালিসহ অন্য দেশে পাড়ি দিতে গিয়ে ২ হাজারের বেশি লোক মারা গেছে। তারমধ্যে বাংলাদেশির সংখ্যাই বেশি। এসব পাচারের সঙ্গে কথিত রাজনীতিবিদ, বেবিচক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সির লোকজনই সম্পৃক্ত। দিনে দিনে ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে তারা।
বিশে^ বছরে আড়াই কোটি পাচার : সম্প্রতি পুলিশের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় আড়াই কোটি নারী-পুরুষ ও শিশু পাচারের শিকার হচ্ছে। তাদের যৌনকাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে, বলপূর্বক শ্রম ও ঋণ-দাসত্ব হিসেবে কেনাবেচা করা হচ্ছে। পাচারকারীদের দেশি ও বিদেশি চক্র আছে। তারা বছরে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে পাচারের ঘটনা বেশি। গ্রামাঞ্চলের মানুষকে লোভনীয় প্রস্তাব দিয়ে পাচার করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, পাচারকারীদের দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। পাচারকারীদের মধ্যে অনেক রাজনীতিবিদও আছেন। তারা প্রভাবশালী নেতাদের দোহাই দিয়ে অপকর্ম করে আসছেন।
এজেন্সির বিষয়ে খোঁজ : রিক্রুটিং এজেন্সি মালিকের ব্যবসা কার্যক্রম ও তাদের অতীত-ইতিহাস খুঁজতে একাধিক সংস্থা মাঠে নেমেছে। তবে অনেক মালিকের লাইসেন্সের ঠিকানা অনুযায়ী অফিস খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশের একটি বিশেষ ইউনিট। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এজেন্সির ঢাকার অফিস ও গ্রামের বাড়িতে একাধিক সংস্থার সদস্যরা গিয়ে খোঁজ নিচ্ছেন। মালিকদের ব্যবসা কার্যক্রমের পাশাপাশি তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শেরও তথ্য নেওয়া হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি এজেন্সির মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কিছুদিন আগে সাদা পোশাকের পুলিশ অফিসে এসেছিল। গত ৫ বছর ধরে কোন কোন দেশে লোক পাঠিয়েছি; তার মধ্যে কজন দেশে ফিরে এসেছে তার তালিকা চেয়েছে। ঢাকার অফিস ছাড়াও গ্রামের ঠিকানায় খোঁজ নিচ্ছে। কী কারণে সব রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের অফিস গোয়েন্দারা পরিদর্শন করছেন, সেটি জানি না। তবে স্বচ্ছতা থাকা ভালো। বিদেশে লোক পাঠানোর নামে যা হচ্ছে তা কিছুতেই মানা যায় না। বায়রার হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে ২ হাজার ৪৯২টি ট্রাভেল এজেন্সি আছে। সবাইকে নজরদারির মধ্যে আনা হোক।
পাচারের অদৃশ্য রুট : সিআইডির তথ্যানুযায়ী প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে ইতালি, ফ্রান্স, ভারত, পাকিস্তান, সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, লিবিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কুয়েত, ওমান, বাহরাইন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নারী, পুরুষ ও শিশুদের পাচার করা হচ্ছে। দিন দিন মানব পাচারের ঘটনা বেড়েই চলেছে। গেল তিন বছর সংস্থাটির তদন্তাধীন মামলা ছিল ১২২টি, ২০২৪ সালে ১১২টি ও ২০২৩ সালে ৮৬টি। চলতি বছরের এপ্রিল মাস পর্যন্ত মানব পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছে ৩৪৪ জন।
মূলত বাংলাদেশ থেকে জলপথে মানব পাচারে প্রধান রুট দুটি ব্যবহ্নত হয়। তারমধ্যে একটি সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া। আরেকটি বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার-থাইল্যান্ড হয়ে মালয়েশিয়া। ইউরোপসহ অন্যান্য দেশে বাংলাদেশ থেকে বিমানপথে মানব পাচারের রুটগুলো হচ্ছে নেপাল, দ্বুাই, মিসর ও লিবিয়া হয়ে ইতালি; ব্রাজিল, মেক্সিকো হয়ে যুক্তরাষ্ট্র; মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া হয়ে অস্ট্রেলিয়া; দুবাই হয়ে সার্বিয়া বা মেসিডোনিয়া; নেপাল হয়ে কানাডা; সৌদি আরব হয়ে রাশিয়া ও থাইল্যান্ড হয়ে কম্বোডিয়া।
নিঃস্ব হচ্ছে হাজারও পরিবার : পুলিশ সদর দপ্তরের একজন ডিআইজি দেশ রূপান্তরকে বলেন, মানবপাচার চক্রের কার্যক্রম থেমে নেই এবং তা খুবই উদ্বেগজনক। লিবিয়া, তুরস্ক, গ্রিস, ইতালি, স্পেনে পাঠানোর কথা বলে পাচারকারী চক্র সাধারণ মানুষ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ইউরোপে নিতে বাংলাদেশ থেকে প্রথমে দালালরা লিবিয়ায় পাঠায়। সেখান থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে নৌকায় করে ইতালি পাঠায়। এতেই ঘটছে ভয়ংকর ঘটনা। তাছাড়া পাচারকারী চক্র পাশবিক নির্যাতন করে তার ভিডিও পাঠিয়ে স্বজনদের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায় করছে। টাকা দিতে না পারলে অনেককের জীবনও শেষ করে দিচ্ছে। আমরা পাচারকারীদের তালিকা তৈরি করছি। তালিকার মধ্যে বেশিরভাগই আছেন প্রভাবশালী। কিছুদিন আগে পুলিশের সবকটি ইউনিটকে নির্দেশ দেওয়া হয় মানব পাচার চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে। অধিকাংশ এজেন্সির নানা অপকর্মের তথ্য পেয়েছি।
প্রতারিত হয়ে দেশে ফিরছেন অনেকেই : পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যনুযায়ী- ২০১৯ সালে ৩১৪৪, ২০২১ সালে ১৮১১, ২০২২ সালে ৬০২৯, ২০২৩ সালে ২৯১৬, ২০২৪ সালে ৩৩৭৫ ও ২০২৫ সালে ১৮৯১ জন দেশে ফিরেছেন। গত ১৯ মে সমুদ্রপথে অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টাকালে লিবিয়ায় আটক হওয়া ১৭০ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তারা সবাই লিবিয়ার বেনগাজির গানফুদা ডিটেনশন সেন্টারে আটক ছিলেন। তারা মানবপাচারকারী চক্রের প্ররোচনায় ইউরোপ যাওয়ার উদ্দেশ্যে লিবিয়ায় প্রবেশ করেন। তাদের অনেকেই সেখানে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হন।
সব সংস্থাই পাচারের ঘটনায় সম্পৃক্ত : কঠোর নজরদারির মধ্যেও থেমে নেই মানব পাচার। প্রতিনিয়তই মানব পাচারের ঘটনা ঘটছে। রিক্রুটিং এজেন্সি ছাড়াও বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্টের মাধ্যমেও মানবপাচার হচ্ছে। পাচারের সঙ্গে বেবিচক, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস, বিভিন্ন এয়ারলাইনস ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ১১২ জনকে কালো তালিকাভুক্তও করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে মন্ত্রণালয়। বিমানবন্দরগুলোতেও মানবপাচারকারী গ্রুপ সক্রিয় আছে।
পাচারকারীর সংখ্যা বেশি শরীয়তপুরে : অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শরীয়তপুরে আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সদস্যদের অবৈধ কার্যক্রম অনেক বেশি। পাচারকারীদের তালিকা তৈরি করেছি। সেটি আরও হালনাগাদ করা হচ্ছে। তাদের নজরদারি করছি। তাছাড়া খুলনা, মাদারীপুর, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ঢাকা, রংপুর, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ প্রায় প্রতিটি জেলা থেকেই মানব পাচার হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
৮০ জনের নামে রেড নোটিস : পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, গত দুই বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের ৮০ জন মানব পাচারকারীর নামে ইন্টারপোল রেড নোটিস জারি করেছে। তার মধ্যে মিন্টু মিয়া নামে এক বাংলাদেশিকে আন্তর্জাতিক মাফিয়া বলে অবহিত করা হয়েছে। বর্তমানে সারা বিশ্বের ৭ হাজার ৩৬৮ জন অপরাধীর নাম আছে ইন্টারপোলের তালিকায়। বাংলাদেশিদের বিষয়ে আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। তাদের ধরার চেষ্টা করছি। বেবিচক, বিমান, ট্রাভেল এজেন্টসহ অনেকের নামে একটি প্রতিবেদন আছে। তালিকাভুত্তদের প্রোফাইল সংগ্রহ করা হচ্ছে। বেশি বেতনের ভালো চাকরি, উন্নত জীবনের প্রলোভনে পড়ে লোকজন পড়েন মানবপাচারকারীদের খপ্পরে। জমি, বসতভিটা বিক্রি করে শেষ সম্বলটুকু তাদের হাতে তুলে দিয়ে রক্ষা হয় না তাদের।