বিশ্বশক্তির নতুন মানচিত্র

আপডেট : ২২ মে ২০২৬, ০৮:১১ পিএম

চীনে একটি পুরনো প্রবাদ আছে দক্ষ শিকারি কখনো খরগোশের পেছনে ছোটে না; সে বরং অপেক্ষা করে সেই জায়গায়, যেখানে একদিন খরগোশকে আসতেই হবে। শি জিনপিং সম্পর্কে মতভেদ থাকতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় পরিষ্কার, তিনি অসাধারণ ধৈর্য নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল সাজাতে পারেন। আজকের বিশ^রাজনীতির দিকে তাকালে মনে হয়, সেই অপেক্ষার ফল এখন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ভ্লাদিমির পুতিন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প  দুজনেই আলাদাভাবে বেইজিং সফর করেছেন। ঘটনাটি নিছক কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; এটি বর্তমান বিশে^র ক্ষমতার পরিবর্তিত ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। এক সময় আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় চীন ছিল প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি। এখন সেই চীনই ধীরে ধীরে বৈশ্বিক রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। এই সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অংশীদারত্ব’ বলা হলেও বাস্তবে এটি অনেকটাই নির্ভরতার সম্পর্ক। চীন আজ রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের প্রধান ক্রেতা। কিন্তু এখানেও নিয়ন্ত্রণের ভারসাম্য সমান নয়। রাশিয়া বিক্রি করতে বাধ্য আর চীন কিনছে নিজের সুবিধামতো শর্তে। দ্বিতীয় সাইবেরিয়া পাইপলাইন প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রতা, সেই বাস্তবতার প্রতিফলন। মস্কো এটি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চায়, কিন্তু বেইজিংয়ের মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কারণ চীন জানে, বিকল্প বাজার হারিয়ে রাশিয়ার যাওয়ার পথ সীমিত।

বর্তমানে রাশিয়ার অবস্থার সঙ্গে সেই ইতিহাসের মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও, অর্থনৈতিক নির্ভরতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসরকে সীমিত করে। এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দক্ষিণ এশিয়াতেও পড়ছে। ভারত দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে একটি কৌশলগত ভারসাম্য হিসেবে ব্যবহার করেছে। কিন্তু এখন মস্কো যত বেশি বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে, ততই নয়াদিল্লির অস্বস্তি বাড়ছে। রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিটি নতুন অস্ত্রচুক্তি কিংবা জ্বালানি সমঝোতার পেছনে এখন এক ধরনের চীনা প্রভাব কাজ করছে। ভারত বিষয়টি বুঝতে পারছে, যদিও প্রকাশ্যে খুব বেশি বলছে না। অন্যদিকে, ট্রাম্পের বেইজিং সফর ভিন্ন ধরনের একটি সংকেত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশে^র সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি এবং প্রযুক্তিগতভাবে শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্র। কিন্তু একই সঙ্গে ওয়াশিংটন এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে চীনকে বাদ দিয়ে বৈশি^ক অর্থনীতি কিংবা সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন করপোরেট জগতের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উপস্থিতি, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হিসেবে ধরা পড়েছে। এটি এমন এক আমেরিকার ছবি তুলে ধরেছে যে একদিকে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী, অন্যদিকে আবার চীনের বাজার, উৎপাদন ব্যবস্থা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। শি জিনপিং এই বাস্তবতাকে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন। তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন, একবিংশ শতাব্দীর বিশে^ কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রযুক্তি, অবকাঠামো, বাণিজ্য, জ্বালানি এবং সরবরাহ ব্যবস্থাই এখন নতুন ক্ষমতার ভিত্তি। আর প্রতিটি ক্ষেত্রে, চীন ধীরে ধীরে নিজের অবস্থানকে শক্ত করেছে। বিশেষ করে, বিরল মৃত্তিকা (রেয়ার আর্থ) খনিজের ক্ষেত্রে চীনের আধিপত্য এখন পশ্চিমা বিশে^র জন্য বড় কৌশলগত উদ্বেগ। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, সেমিকন্ডাক্টর এবং প্রতিরক্ষা শিল্প সব ক্ষেত্রেই এই খনিজ অপরিহার্য। যখন চীন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের মতো পদক্ষেপ নেয়, তখন ওয়াশিংটন বুঝতে পারে যে, অর্থনৈতিক নির্ভরতা শুধু বাণিজ্যের বিষয় নয়; এটি ভূরাজনৈতিক প্রভাবেরও হাতিয়ার। তাইওয়ান ইস্যুতেও একই বাস্তবতা দেখা যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে তাইওয়ানের প্রতি সমর্থন জানালেও, সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর প্রশ্নে অত্যন্ত সতর্ক। কারণ সবাই জানে, তাইওয়ান প্রণালিতে কোনো বড় সংঘাত শুরু হলে, তার প্রভাব কেবল সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং প্রযুক্তি সরবরাহ ব্যবস্থাও বড় ধরনের ধাক্কা খাবে। আর এই বাস্তবতা চীনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান দিয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীন তার উত্থানকে সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করতে চায়নি। বরং তারা নিজেদের এমন এক অবস্থানে নিয়ে গেছে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংকট সমাধানে তাদের অংশগ্রহণ প্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠছে। মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতি, আফ্রিকার অবকাঠামো উন্নয়ন, গ্লোবাল সাউথের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব সব ক্ষেত্রে বেইজিং এখন সক্রিয় এবং প্রভাবশালী।

ইরান সংকটের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোও, এই বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তিতে শীর্ষে থাকলেও, প্রতিটি সংকটের সমাধান সামরিক উপায়ে সম্ভব নয়। আফগানিস্তান, ইরাক এবং লিবিয়ার অভিজ্ঞতা ওয়াশিংটনকে বুঝিয়েছে যে, আধুনিক বিশ্বে প্রভাব বিস্তার আর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এক বিষয় নয়। আর চীন এই সীমাবদ্ধতাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করেছে। তবে এটাও সত্য, বিশ^ এখনো পুরোপুরি চীনের পক্ষে চলে যায়নি। ইউরোপের অনেক দেশ এখনো বেইজিংয়ের রাজনৈতিক মডেল নিয়ে দ্বিধায় আছে। মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং প্রযুক্তিগত নজরদারি নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বাস্তবতাও আছে। বিশ্ব অর্থনীতির এত বড় অংশ হয়ে উঠার পর, চীনকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করা কার্যত অসম্ভব। চীনের আসল শক্তি সম্ভবত এখানে। তারা বিশ্বের কাছে নিজেদের অপরিহার্য করে তুলেছে। গণতান্ত্রিক দেশগুলোর একটি সীমাবদ্ধতা হলো, তাদের নীতিনির্ধারণ অনেক সময় নির্বাচনী চক্রের ভেতর আটকে দেয়। সরকার বদলায়, অগ্রাধিকার বদলায়, কৌশল বদলায়। কিন্তু চীন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে, ধীরে ধীরে তার অবস্থান তৈরি করেছে। তারা এমন বাস্তবতা তৈরি করে, যা অন্যদের মেনে নিতে হয়। আজকের চীন অনেকটাই সেই অবস্থানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্প এবং পুতিনের বেইজিং সফরের আসল তাৎপর্য এখানেই। এটি শুধু দুই নেতার সফরের গল্প নয়; বরং এমন এক বিশে^র প্রতিচ্ছবি, যেখানে আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্র পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে।বিশ্ব হয়তো সাংস্কৃতিকভাবে চীনা হয়ে উঠছে না, কিন্তু আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের গুরুত্ব বাড়ছে। ওয়াশিংটন কিংবা মস্কো দুই দেশের বাস্তবতা ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু তারা একই সত্যের মুখোমুখি। সেই সত্য হলো, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় চীনকে আর উপেক্ষার সুযোগ নেই। সম্ভবত এটাই একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন।

লেখক

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত