চাঁদার ভাগ যায় শীর্ষ নেতাদের পকেটেও

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৭:১৭ এএম

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়ক ও ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে বেড়েছে ছাত্রদলের একাংশের দৌরাত্ম্য। গভীর রাতে মাছের পোনাবাহী গাড়ি আটকে ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি, দূরপাল্লার বাস কাউন্টার ভাঙচুর ও মারধরের ঘটনায় পরিবহন শ্রমিক ও মাছের পোনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, এসব ঘটনায় ছাত্রদলের কয়েকজন নেতার নাম ঘুরেফিরে সামনে এলেও শীর্ষ নেতারাও জড়িত থাকায় দিন দিন মহাসড়কটিতে এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলছে।

অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রদলের সভাপতি মো. মোশাররফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্ত ও সাংগাঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমানের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মহাসড়কে এসব চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। চাঁদার টাকার ভাগ তাদের পকেটেও যায় বলে বিশ্বস্ত সূত্র নিশ্চিত করেছে।

মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে পটুয়াখালী থেকে আসা চিংড়ির রেণুবাহী একটি গাড়ি বিশ^বিদ্যালয় সংলগ্ন বরিশাল জিরো পয়েন্ট থেকে ধাওয়া করে কাছেই ভোলা রোডে নিয়ে আটক করা হয়। গাড়ি আটকে বাসের হেলপার ও ড্রাইভারকে মেরিন একাডেমির নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে মারধর করে ভয়ভীতি দেখিয়ে পোনার মালিককে কল দিয়ে টাকা দাবি করা হয় পাঁচ লাখ। পরে মালিক ৯৯৯-এ কল দিয়ে সাহায্য চান বন্দর থানায়। কিন্তু সাহায্য না পেয়ে বিকাশে তিনটি নম্বরে মোট ৯৪ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেন। বিকাশের লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ এই প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।

পরে প্রথম গাড়িটি আটকের খবর পেয়ে চিংড়ির রেণু বহনকারী দ্বিতীয় কালো রঙের একটি হাইয়েস মাইক্রোবাসকে জিরো পয়েন্টে থামার সংকেত দেওয়া হলে চালক  দ্রুত গাড়িটি নিয়ে রুপাতলীর দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে একটি মোটরসাইকেল ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও একজন আহত হয়। পরে ওই গাড়ির পিছু নেয় ববি ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। গাড়িটি রুপাতলী ট্রাফিক পুলিশ বক্সের কাছে পুলিশের টহল গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালে ববির ৭/৮ জন শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলকর্মী পুলিশের সামনেই মাইক্রোবাসের চালক ও হেলপারকে মারতে থাকে। এতে ড্রাইভার ও হেলপার মারাত্মক আহত হন। এ সময় তারা মাইক্রোবাসটির গ্লাস ও অন্যান্য অংশে ভাঙচুর করে। আহত শিক্ষার্থী ববির ১০ ব্যাচের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলকর্মী মো. আরাফাত।

এদিকে গত সোমবার ববি সংলগ্ন ভোলার মোড়ে ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজিদুল ইসলাম দূরপাল্লার বাস জীদান এন্টারপ্রাইজ পরিবহনের কাউন্টারে ভাঙচুর করে ও ভয়ভীতি দেখায়। পরে যদিও ছাত্রদল সভাপতি মো. মোশারফ হোসেন, সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসাইন শান্ত ও সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইত্তেসাফ আর-রাফির উপস্থিতিতে ঘটনার মীমাংসা হয়।

এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি রাত ১১টার দিকে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কের তালুকদার মার্কেট এলাকায় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মধ্যরাতে ভোলা-বরিশাল মহাসড়কে ইলিশ মাছের গাড়ি আটকে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি ও ড্রাইভারকে মারধরের অভিযোগ উঠেছিল। চাঁদাবাজির হাত থেকে রেহাই পেতে ৯৯৯-এ কল দিয়ে পুলিশের কাছে সহায়তা চেয়ে ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে রক্ষা পান ট্রাকচালক।

মাছের গাড়ি আটকে মহাসড়কে চাঁদাবাজির ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটির সহ-সভাপতি মিয়া বাবুল, সহ-সভাপতি মো. মিথুন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. স্বজন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মো. ইমরান মাহমুদসহ একাধিক নেতাকর্মী।

অভিযুক্ত এসব নেতাকর্মীকে একাধিকবার কল করলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

তবে জানতে চাইলে আহত ছাত্রদলকর্মী মো. আরাফাত বলেন, ‘আমি ফজরের নামাজ পড়ে ভোর ৫টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঘুরতে গিয়েছিলাম এমন সময় পেছন থেকে এসে একটি হাইয়েস গাড়ি আমার মোটরসাইকেলে ধাক্কা দেয়। এতে আমি পড়ে গিয়ে আহত হই। আমি শেরে বাংলা মেডিকেলে সার্জারি বিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়ে এখন বাসায় আছি।’

ভুক্তভোগী হাইয়েস মাইক্রোবাসের মালিক মো. মুহসিন বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আমার গাড়িটি আটকানোর চেষ্টা করে চাঁদাবাজির জন্য। আগে থেকে তথ্য পেয়ে আমার গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি টান দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তারা গাড়িতে ইট মারে, গাড়ির সামনের গ্লাস ভেঙে যায়। পরে ধাওয়া করে। রুপাতলী এসে পুলিশ দেখে ড্রাইভার গাড়ি থামায় কিন্তু ওরা পুলিশের সামনে আমার ড্রাইভারকে বেদম মারধর করেছে। আমার গাড়ির প্র্রায় ৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। পরে থানায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন অফিসার ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের আলোচনার মাধ্যমে মাছের গাড়ি ছেড়ে দিয়েছে।’

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান জানান, মহাসড়কে মাছের গাড়ি আটকে চাঁদাবাজির বিষয়টি তার জানা নেই এবং বলেন ‘আমাদের নাম ব্যবহার করে ছাত্রদলের কেউ যদি এমন চাঁদাবাজির সঙ্গে যুক্ত থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

চিংড়ি রেণু উৎপাদনকারী হ্যাচারি মালিক জাহাঙ্গীর বলেন, ‘আমার দুটো চিংড়ির রেণু বহনকারী গাড়ি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা আটক করে চাঁদা দাবি করেছে। আমি প্রথমে ৯৯৯-এ কল দিয়ে কোনো প্রতিকার পাইনি। পরে আমার থেকে যারা মাছ কিনেছে তারা বাধ্য হয়ে বিকাশে প্রায় দেড় লাখ টাকা চাঁদা দিয়ে গাড়ি উদ্ধার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব ছাত্রদল নেতা এর সঙ্গে জড়িত তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি আমরা।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমাদের অবস্থান একদম পরিষ্কার। দলের নাম ব্যবহার করে যদি কেউ অন্যায় অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকে এবং যদি প্রমাণিত হয় তাহলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিকভাবে ব্যবস্থা  নেব। আমি ব্যক্তিগতভাবে এটার বিরুদ্ধে অবশ্যই পদক্ষেপ নেব।’

বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছেলেকে মোটরসাইকেলসহ মেরে দেয় একটি হায়েস মাইক্রোবাস পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঐটা ধাওয়া করে। পরে মাইক্রোবাস চালক পুলিশের কাছে ৯৯৯-এ কল দিয়ে সাহায্য চাইলে পুলিশ তাদের থানায় নিয়ে আসে। এবং যেহেতু এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা তাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ডাকা হয়েছিল। বিষয়টি মীমাংসা করে দেওয়া হয়েছে। মাছের গাড়ি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গাড়ি আটক করে চাঁদাবাজির বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ওসি বলেন, এমন ঘটনা ঘটছে না তা আমি বলব না। তবে বিষয়টি যেহেতু বন্দর থানাধীন, তাই সংশ্লিষ্ট পুলিশ এটার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত