মঞ্চ

দর্পণে শরৎশশী : আজও ক্ল্যাসিক, আজও সমকালীন

দর্পণে শরৎশশী
রচনা : মনোজ মিত্র
নির্দেশনা : কামাল আহমেদ
সময় ও স্থান : ২২-২৩ জানুয়ারি ২০২৬, সন্ধ্যা ৭টা, বাংলাদেশ মহিলা সমিতি, ঢাকা
কুশীলব : নাজনীন হাসান চুমকি (মনোরমা), ব্রততি বিথু (শরৎশশী), আব্দুল কুদ্দুস মাখন (নাটুলাল), চূড়োমামা (মাসুম রেজা) প্রমুখ।

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম

বাংলাদেশের মঞ্চনাট্যচর্চার ইতিহাসে কিছু প্রযোজনা সময়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে লিভিং-মঞ্চ অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়েছে। এসব নাটক হয়ে উঠেছে সমাজ, স্মৃতি ও প্রতীকের চলমান ব্যাখ্যা। দেশ নাটক প্রযোজিত দর্পণে শরৎশশী সেই বিরল নাট্য-নির্মাণগুলোর একটি, যা একই সঙ্গে ক্ল্যাসিক ও সমকালীন। নাটকটি আখ্যান ও প্রতীক, রিয়েলিটি এবং সাইকোলজিক্যাল অ্যাবস্ট্রাকশনের ভেতর জটিল দ্বৈত সম্পর্ক তৈরি করে, ফলে দর্শক নিজের চেতনার ভেতরেই নাটকটিকে পুনর্নির্মাণ করতে বাধ্য হয়।

নাট্যকার মনোজ মিত্র নাটকে যে থিয়েট্রিক্যাল স্ট্রাকচার তৈরি করেছেন, তা বাস্তববাদী নাট্যধারার সীমা অতিক্রম করে সিম্বলিক মর্ডানিজমের দিকে অগ্রসর হয়েছে। চরিত্রগুলো ব্যক্তিমানুষে সীমায়িত নয়, তারা সামাজিক ধারণা, মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা এবং নৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতীকী বাহক। কেন্দ্রীয় চরিত্র শরৎশশী; সে একদিকে নারীত্বের আদর্শায়িত প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে সামাজিক কাঠামোর মধ্যে আটকে থাকা বিভক্ত আত্মসত্তা। এই দ্বৈত অবস্থান তাকে ফরাসি মনোবিশ্লেষক লাকানিয়ান দৃষ্টিতে ‘ফ্রাগমেন্টেড সেলফ’-এ পরিণত করেছে, যেখানে আত্মপরিচয় কখনোই সম্পূর্ণ নয়, সবসময় প্রতিফলনের ভেতর দিয়ে অসম্পূর্ণভাবে উপলব্ধি করা যায়।

নাটকে মনোরমা চরিত্র একজন নারীর অভ্যন্তরীণ সংকট, সামাজিক চাপ এবং আত্মপরিচয়ের লড়াইকে অত্যন্ত সংযত অথচ তীব্রভাবে তুলে ধরেছে। ইন্দ্রনাথ চরিত্রটি পুরুষতান্ত্রিক অবস্থান ও মানবিক দুর্বলতাকে পাশাপাশি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এই নাটকে দর্পণকে মিশেল ফুকোর mirror as heterotopia ধারণায় বিকল্প বাস্তবতার স্থান হিসেবে দেখা যায়, যেখানে চরিত্ররা নিজেদের সামাজিক পরিচয়ের বাইরে গিয়ে অন্তর্গত সত্যের মুখোমুখি হয়। তবে এই মুখোমুখি হওয়া মুক্তিদায়ক নয়, বরং তা এক ধরনের অস্তিত্বগত অস্বস্তি তৈরি করে। দর্পণ এখানে সত্যকে প্রকাশ করে না, সত্যের অসম্পূর্ণতা উন্মোচন করে দেয়।

নাটকটির নির্দেশনায় আলী যাকেরের নান্দনিক চিন্তার ধারাবাহিকতা স্পষ্ট। একে মিনিমালিস্টিক ও সেমিওটিক স্টেজিংয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়। মঞ্চ যেখানে শূন্যতার নান্দনিকতা ধারণ করেছে। আলো ও অন্ধকারের ব্যবহার ভিজ্যুয়াল টুল হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার পাশাপাশি মানসিক অবস্থা নির্দেশ করে। এই আলো-ছায়ার দ্বন্দ্ব দর্শকের ব্যক্তিগত স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাকে আঘাত করে এবং নাট্য-অভিজ্ঞতাকে ব্যক্তিগত স্তরে নিয়ে যায়।

পুনঃমঞ্চায়নের ক্ষেত্রে নাটকটি লিভিং আর্কাইভের মর্যাদা পেয়েছে। নতুন প্রজন্মের অভিনেতা ও টেকনিক্যাল টিম মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে নাটকের প্রতীকী অর্থকে সমকালীন বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত করেছে। এই প্রক্রিয়া ফস্টারের আর্কাইভাল ইমপালস ধারণায় দেখা যায়, যেখানে ভবিষ্যতের অর্থ নির্মাণের জন্য অতীতকে পুনরাবিষ্কার করা হয়ে থাকে।

অভিনয়ের ক্ষেত্রে সবাই প্রথাগত চরিত্রাভিনয় থেকে সরে গিয়ে ‘gestural theatre’-এর দিকে মন দিয়েছেন। চরিত্রের অভ্যন্তরীণ মনস্তত্ত্ব এখানে সরাসরি সংলাপে প্রকাশিত না হয়ে আঙ্গিক ভাষা এবং নীরবতায় প্রতিফলিত হয়েছে। এই নীরবতা ব্রেখটীয় ‘অ্যালিয়েনেশন ইফেক্ট’-এর মতো কাজ করেছে, যা দর্শককে আবেগে না ডুবিয়ে বিশ্লেষণাত্মক দূরত্বে নিয়ে গেছে।

কস্টিউম ও মেক-আপের ব্যবহারেও অতিরঞ্জিত নান্দনিকতার পরিবর্তে সংযত ভিজ্যুয়াল কোড ব্যবহার করা হয়েছে, যা চরিত্রের সামাজিক অবস্থান এবং মানসিক অবস্থার মধ্যকার টানাপড়েনকে দৃশ্যমান করে তুলেছে। এই সংযত ব্যবহার নাটকটিকে বাস্তবতার প্রতীকী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। সংগীত ও সাউন্ড ডিজাইন এই প্রযোজনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সংগীত নাটকটিতে প্রায় নীরবতা হয়ে বেজেছে; যে নীরবতা দর্শকের চিন্তাকে সক্রিয় করে নাটকীয় অর্থকে ব্যক্তিগত ব্যাখ্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

দর্পণে শরৎশশীকে বলা যায়, পোস্ট-রিয়ালিস্ট থিয়েটার, যা দর্শককে একক-অর্থে স্থির হতে দেয় না। বহুমাত্রিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্র তৈরি করে। যেখানে দর্শক নিজস্ব সামাজিক অবস্থান ও মনস্তাত্ত্বিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নাটকটিকে পুনর্গঠন করে। বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের পরিসরে এ ধরনের প্রযোজনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যেখানে জ্ঞান, স্মৃতি এবং সমাজ একে অপরকে প্রশ্ন করে। দর্পণে শরৎশশী সেই প্রশ্নেরই দীর্ঘস্থায়ী, অস্বস্তিকর কিন্তু নান্দনিকভাবে গভীর অনিশ্চয়তা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত