মুসলিম আইনে বিবাহ বিচ্ছেদঃ  নারী-পুরুষের অধিকার কোথায়

আপডেট : ২৩ মে ২০২৬, ০৯:২৬ পিএম

মুসলিম আইনে বিবাহ একটি ধর্মীয় দিকসম্পন্ন দেওয়ানি চুক্তি। এই চুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করা। তবে যখন বৈবাহিক সম্পর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যেখানে একসাথে বসবাস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে, তখন ইসলাম বিবাহ বিচ্ছেদের সুযোগ প্রদান করেছে।

ইসলামে তালাককে বৈধ হলেও অপছন্দনীয় কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—`আল্লাহর নিকট বৈধ কাজসমূহের মধ্যে সবচেয়ে ঘৃণিত হলো তালাক।'

অর্থাৎ ইসলাম চায় বিবাহ টিকে থাকুক, কিন্তু পারস্পরিক সম্পর্ক চরমভাবে ভেঙে গেলে বিচ্ছেদকে অনুমোদন দেয়। 

মুসলিম আইনে বিবাহ বিচ্ছেদের শ্রেণিবিভাগঃ

মুসলিম আইনে বিবাহ বিচ্ছেদ সাধারণত দুইভাবে সংঘটিত হয়।

১। পক্ষদ্বয়ের কারও মৃত্যুর মাধ্যমে

২। পক্ষদ্বয়ের কার্যকলাপের মাধ্যমে

১। পক্ষদ্বয়ের কারও মৃত্যুর মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদঃ  স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যু ঘটলে বিবাহ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটিকে বিবাহের স্বাভাবিক সমাপ্তি বলা হয়। স্ত্রীর মৃত্যু হলে স্বামী তাৎক্ষণিকভাবে পুনরায় বিবাহ করতে পারেন। তবে স্বামীর মৃত্যু হলে স্ত্রীকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়, যাকে “ইদ্দত” বলা হয়। ইদ্দতের সময়কাল সাধারণভাবে ৪ মাস ১০ দিন কিন্তু স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান জন্মদান পর্যন্ত। 

২। পক্ষদ্বয়ের কার্যকলাপের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদঃ এই প্রকার বিচ্ছেদকে চার ভাগে বিভক্ত করা যায়—

ক) স্বামীর মাধ্যমে- ১। তালাক, ২। ইলা, ৩। জিহার

খ) স্ত্রীর মাধ্যমে- ১। তালাক-ই-তাফউইজ

গ) পারস্পরিক সম্মতিতে- ১। খুলা, ২। মুবারাত

ঘ) আদালতের মাধ্যমে- ১। লি’আন , ২। ফাসখ 

 

(ক) স্বামীর মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ

১। তালাক

“তালাক” শব্দের অর্থ পরিত্যাগ বা সম্পর্কচ্ছেদ। আইনগত অর্থে, স্বামী কর্তৃক নির্দিষ্ট শব্দ উচ্চারণের মাধ্যমে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান ঘটানোকে তালাক বলা হয়।

তালাক দুই প্রকার। যথাঃ

১। তালাক-আল-সুন্নাহ , ২। তালাক-আল-বিদআত বা তালাক-আল-বাইন

১। তালাক-আল-সুন্নাহঃ এটি ইসলামে অনুমোদিত ও উত্তম পদ্ধতি। এর দুইটি ধরন রয়েছেঃ

(ক) আহসান পদ্ধতিঃ এ পদ্ধতিতে স্ত্রী পবিত্র অবস্থায় (তুহর) থাকাকালে স্বামী একবার তালাক ঘোষণা করেন। এরপর স্ত্রী তিন মাস ইদ্দত পালন করেন। এটি সবচেয়ে উত্তম ও সুন্নতসম্মত তালাক।

এই সময়ের মধ্যে স্বামী তালাক প্রত্যাহার করতে পারেন অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপিত হলে তালাক বাতিল হয়ে যায়।

 (খ) হাসান পদ্ধতিঃ এ পদ্ধতিতে পরপর তিনটি পৃথক তুহর কালে তিনবার তালাক ঘোষণা করা হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় ঘোষণার পর তালাক প্রত্যাহারযোগ্য থাকে। তৃতীয় ঘোষণার পর তালাক চূড়ান্ত ও অপ্রত্যাহারযোগ্য হয়ে যায়। মাসিক হয় না এমন স্ত্রীর ক্ষেত্রে প্রতি ৩০ দিন অন্তর তালাক ঘোষণা করতে হয়।

২। তালাক-আল-বিদআত বা বাইনঃ এটি ইসলামে অপছন্দনীয় ও অনিয়মিত পদ্ধতি। এ তালাক উচ্চারণের সাথে সাথে কার্যকর ও অপ্রত্যাহারযোগ্য হয়ে যায়। এটির দুইটি ধরন রয়েছেঃ

(ক) একসাথে তিন তালাকঃ একবারে “আমি তোমাকে তিন তালাক দিলাম” বলা অথবা একই তুহরে তিনবার তালাক ঘোষণা করা। এক্ষেত্রে তালাক তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হয়। 

 (খ) একক অপ্রত্যাহারযোগ্য ঘোষণাঃ এক্ষেত্রেও তালাক সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয়।

যেমনঃ “আমি তোমাকে চিরতরে তালাক দিলাম।”

মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী তালাকের প্রক্রিয়াঃ

এই আইনের ধারা ৭ অনুযায়ী -

ক। স্বামী তালাক দেওয়ার পর অবিলম্বে লিখিতভাবে ইউনিয়ন পরিষদ/পৌরসভার চেয়ারম্যানকে নোটিশ প্রদান করবেন এবং স্ত্রীর নিকট একটি অনুলিপি পাঠাবেন।

খ। নোটিশ না দিলে স্বামী এক বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা ১০,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।

গ। নোটিশ প্রদানের ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হবে, যদি এর পূর্বে তা প্রত্যাহার না করা হয়।

ঘ। চেয়ারম্যান ৩০ দিনের মধ্যে সালিশি পরিষদ গঠন করবেন এবং পুনর্মিলনের চেষ্টা করবেন।

ঙ। স্ত্রী গর্ভবতী হলে সন্তান জন্মদান বা ৯০ দিনের মধ্যে যেটি পরে হবে, সেই সময়ে তালাক কার্যকর হবে।

চ। একই স্বামীর সাথে পুনর্বিবাহের ক্ষেত্রে হিল্লা বিবাহ প্রয়োজন হবে না, যদি না এটি তৃতীয় তালাক হয়। 

 ২. ইলাঃ ইলা অর্থ শপথ। যখন স্বামী শপথ করেন যে তিনি স্ত্রীর সাথে সহবাস করবেন না এবং টানা চার মাস সহবাস থেকে বিরত থাকেন, তখন তালাক কার্যকর হয়।

৩. জিহারঃ যখন স্বামী স্ত্রীকে তার মা বা নিষিদ্ধ সম্পর্কের নারীর সাথে তুলনা করেন, তখন তাকে জিহার বলা হয়। এ অবস্থায়- স্ত্রী স্বামীর নিকট যেতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন, স্বামীকে কাফফারা (ক্ষতিপূরণ) দিতে হয়,  কাফফারা না দিলে স্ত্রী আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ চাইতে পারেন।

(খ) স্ত্রীর মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ

তালাক-ই-তাফউইজ: সাধারণত তালাক দেওয়ার ক্ষমতা স্বামীর হাতে থাকে। তবে স্বামী চাইলে নির্দিষ্ট শর্তে সেই ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করতে পারেন। এটি “তালাক-ই-তাফউইজ” নামে পরিচিত। মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন, ১৯৭৪ এর কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে এ ক্ষমতা অর্পণের বিধান রয়েছে।

(গ) পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ

১। খুলাঃ খুলা হলো স্ত্রীর উদ্যোগে সংঘটিত বিচ্ছেদ, যেখানে স্ত্রী স্বামীকে ক্ষতিপূরণ বা দেনমোহর ত্যাগের বিনিময়ে বিচ্ছেদ লাভ করেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হলে স্ত্রী খুলার আবেদন করতে পারেন। স্বামীর সম্মতি প্রয়োজন হলেও আদালতের মাধ্যমেও খুলা লাভ করা যায়।

খুরশিদ বিবি বনাম মুহাম্মদ আমিন মামলায় আদালত দাম্পত্য অসামঞ্জস্যতাকে খুলার বৈধ কারণ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২। মুবারাতঃ যখন স্বামী ও স্ত্রী উভয়েই পারস্পরিক সম্মতিতে বৈবাহিক সম্পর্কের অবসান চান, তখন তাকে মুবারাত বলা হয়। এটি একটি একক ও অপ্রত্যাহারযোগ্য তালাক হিসেবে গণ্য হয় এবং স্ত্রীকে ইদ্দত পালন করতে হয়। 

ঘ) আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ

১। লি’আনঃ যখন স্বামী স্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের মিথ্যা অভিযোগ আনেন, তখন লি’আন প্রযোজ্য হয়। ইসলামে ব্যভিচার প্রমাণের জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী প্রয়োজন। মিথ্যা অভিযোগের ক্ষেত্রে স্ত্রী আদালতে বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।

নুরজাহান বিবি বনাম মোহাম্মদ কাজিম আলি মামলায় আদালত লি’আনের ভিত্তিতে বিচ্ছেদকে অপ্রত্যাহারযোগ্য বলে রায় দেন।

২। ফাসখঃ ফাসখ অর্থ বিচারিক বাতিলকরণ। মুসলিম বিবাহ বিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯ এর ধারা ২- অনুযায়ী স্ত্রী নিম্নোক্ত কারণে আদালতের মাধ্যমে ফাসখ চাইতে পারেন। ফাসখের কারণসমূহঃ

১। স্বামীর সন্ধান চার বছর ধরে না পাওয়া গেলে

২। দুই বছর ভরণপোষণ না দিলে

৩। সাত বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড হলে

৪। তিন বছর বৈবাহিক দায়িত্ব পালন না করলে

৫। স্বামী অক্ষম হলে

৬। স্বামী মানসিক ভারসাম্যহীন বা গুরুতর রোগে আক্রান্ত হলে

৭। অপ্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় বিবাহ হলে এবং প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে বিবাহ প্রত্যাখ্যান করলে

৮। স্বামী নিষ্ঠুর আচরণ করলে

মুসলিম আইনে বিবাহ বিচ্ছেদের বিধান মূলত মানবিক ও বাস্তবতাভিত্তিক। তবে এই বিচ্ছেদ যেন হঠাৎ অন্যায় বা আবেগপ্রসূত না হয়, সেজন্য বিভিন্ন শর্ত, পদ্ধতি ও আইনগত প্রক্রিয়া নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমান সমাজে পারিবারিক বিরোধ বৃদ্ধি পাওয়ায় এসব বিধান সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি। একইসাথে নারী-পুরুষ উভয়ের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনসম্মত ও দায়িত্বশীলভাবে এ বিধানগুলোর প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত