রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানার বক্তব্য ঘিরে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। মিরপুর এলাকার ডলার নামে আরেক ব্যক্তিও রামিসা হত্যায় জড়িত বলে বারবার দাবি করছেন তিনি। গতকাল বুধবারও আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানিতে ডলার জড়িত বলে দাবি করেন সোহেল। কিন্তু শুরু থেকেই সোহেল ও তার স্ত্রী স্বপ্না ছাড়া ঘটনার সঙ্গে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির জড়িত থাকার প্রমাণ পায়নি পুলিশ। তা ছাড়া অভিযুক্ত সোহেল রানাও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে অন্য কারও নাম বলেননি। কিন্তু বিচার কার্যক্রমের মাঝপথে ডলারের নাম আসায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে পুলিশ।
যদিও মামলাটির আইনজীবী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে ওই নামের (ডলার) কারও সম্পৃক্ততা মেলেনি। এ জন্য অভিযোগপত্রে তার নাম দেওয়া হয়নি। তাদের মতে, এ ধরনের আসামি বিচার কার্যক্রমে সময়ক্ষেপণ, জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং নিজেকে রক্ষায় নানা ধরনের বিতর্কিত তথ্য দিয়ে থাকেন। তবে আদালত নির্দেশ দিলে ডলারকে আটক করে প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদের কথা জানিয়েছে পুলিশ।
এ বিষয়ে জানতে ফৌজদারি আইনবিদ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক বিশেষ প্রসিকিউটরিয়াল উপদেষ্টা এহসানুল হক সমাজী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তি ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ার পর বিচারকালীন ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে ভিন্ন বা অতিরিক্ত কোনো বক্তব্য দিলে তা বিধি অনুযায়ী আসামিকেই প্রমাণ করতে হবে। অর্থাৎ আসামি সোহেল রানাকেই প্রমাণ করতে হবে ঘটনার সঙ্গে ডলার জড়িত। সেটি হোক সাক্ষীর মাধ্যমে কিংবা অন্য উপায়ে।
এদিকে ঘটনার সঙ্গে ডলার জড়িত বলে সোহেলের দাবির পর প্রশ্ন উঠেছে কে এই ডলার? আদৌ কি তিনি জড়িত, নাকি বিচার প্রক্রিয়ার মাঝপথে এটি নতুন কোনো কৌশল? এ বিষয়ে জানতে এবং ডলারের অস্তিত্ব নিশ্চিত হতে অনুসন্ধান করে দেশ রূপান্তর।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই ডলারের বাসা পল্লবী এলাকাতেই। সোহেল যে ভাড়া বাসায় শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে, সেই বাড়ির তিন-চারটি বাড়ির পর ডলারের বাড়ি। এই ডলার মাদকাসক্ত এবং পেশায় অটোরিকশাচালক। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ডলার অটোরিকশাচালক হওয়ায় রিকশার গ্যারেজ মেকানিক সোহেলের সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল। তার গ্যারেজে যাতায়াত ছিল। ডলার আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী নয়। তবে তাদের পরিবার অবস্থাসম্পন্ন। তারা বাড়ির মালিক। ডলার নেশার টাকা জোগাতে অটোরিকশা চালায়। ডলাররা পাঁচ ভাই, দুই বোন। ভাইদের মধ্যে ডলার সবার ছোট।
রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপপরিদর্শক ওহিদুজ্জামান ভূঁইয়া গত মঙ্গলবার আদালতকে জানিয়েছেন, এ ঘটনায় ডলারের জড়িত থাকার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গতকাল বুধবার তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে ডলারের কোনো সম্পৃক্ততা মেলেনি। ডিজিটাল তদন্তেও ঘটনাস্থলে তার উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এ জন্য চার্জশিটে ডলারের নাম দেওয়া হয়নি। তদন্ত ও সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা গেছে, ধর্ষণ ও হত্যার পর আসামি সোহেল জানালার গ্রিল কেটে পালিয়েছেন। তিনি একাই পালিয়েছেন। ঘটনাস্থলে ডলার নামে কেউ ছিল না। সোহেল ও তার স্ত্রী জিজ্ঞাসাবাদের সময়ও ডলারের বিষয়ে কিছু বলেনি। এখন কারাগারে গিয়ে হয়তো কারও শেখানো কথা বলে বিচারকাজে ঝামেলা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছেন।
তদন্ত কর্মকর্তা ওহিদুজ্জামান ভূঁইয়া আরও বলেন, খোঁজ নিয়ে দেখেছি ডলারের সঙ্গে সোহেল রানার পূর্বশত্রুতা রয়েছে। এ জন্য হয়তো ডলারকে জড়ানোর চেষ্টা করছেন। তবে মামলাটি তিনি তদন্ত করলেও গুরুত্ব বিবেচনায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও নজর রেখেছিল। এখানে সম্পৃক্ত কাউকে বাদ দেওয়া বা নির্দোষ কাউকে জড়ানোর সুযোগ নেই। ডলারকে আটক কিংবা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে কি না জবাবে তিনি বলেন, আদালত আদেশ না দিলে আটক করতে পারি না। তবে আদালত নির্দেশ দিলে ডলারকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
তদন্ত কর্মকর্তা এমনটি বললেও ঘটনার সঙ্গে ডলারের নাম বারবার উঠে আসায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে পুলিশ। এ নিয়ে পুলিশের মিরপুর বিভাগের এবং ডিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা একাধিকবার বৈঠক করেছেন। সোহেলের দাবি অনুযায়ী, আসলেই ডলার জড়িত কি না, সেই বিষয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। তবে মামলার তদন্তসংশ্লিষ্টরা জোর দিয়ে ঊর্ধ্বতনদের বলেছেন, ডলারের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। থানা পুলিশের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাও ঘটনাটির ওপর নজর রেখেছিল। তাদের ছায়া তদন্তেও এ রকম কিছু উঠে আসেনি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডলারের বিষয় নিয়ে পুলিশ বিব্রতবোধ করছে।
জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসামি সোহেল রানা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া জবানবন্দিতে রামিসা হত্যায় জড়িত অন্য কারও নাম বলেননি কিংবা ইঙ্গিত করেননি। যদি করতেন তাহলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সেটি তদন্ত করে বের করতেন। কিন্তু হঠাৎ করে আরেকজনের নাম বলার কারণ হচ্ছে আসামির এক ধরনের চতুরতা এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে বিচার কার্যক্রমকে ভিন্ন দিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।
নৃশংস এ হত্যা মামলায় ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে গতকাল বুধবার আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি শেষ হয়েছে। শুনানিতে আসামি সোহেলের উদ্দেশে বিচারক বলেন, এ মামলায় তার বিরুদ্ধে ১৬ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। এরপর আদালত সোহেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ও সাক্ষীদের সাক্ষ্য পড়ে শোনান। পরে সোহেল বিচারককে উদ্দেশ করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং জানান, ডলার নামের একজনও এ ঘটনায় জড়িত। তাকেও ধরা হোক। এর আগে গত সোমবার অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষে আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সামনেও একই দাবি করেন সোহেল।
এদিকে রামিসা হত্যার সঙ্গে ডলারের জড়িত থাকার কথা ওঠার পর থেকে তাকে কেউ এলাকায় দেখেনি। এমনকি পরিবারের কেউ তার সন্ধান দিতে পারেননি। খোঁজে ডলারের বড় ভাই সেলিম রায়হানের সন্ধান মিললেও তিনি জানাতে পারেননি ডলারের বর্তমান অবস্থান। সেলিম বলেন, গত ১৯ বছর ধরে পরিবারের কারও সঙ্গেই ডলারের সম্পর্ক নেই। বাড়ি ভাগাভাগির পর ভাই-বোন যে যার মতো বসবাস করছেন। ডলার তার মতো থাকে, নেশা করে। এ জন্য পরিবারের কেউ তাকে পাত্তা দেয় না। গণমাধ্যমে তিনিও দেখেছেন, ডলারের ওপর দায় চাপিয়েছে সোহেল। এত বড় নৃশংসতায় ডলার ন্যূনতম সম্পৃক্ত থাকলে তারও ফাঁসি হোক, সেটি তারাও চান। তবে ডলার কোথায় আছেন সেটি জানেন না তিনি।
ডলারের বিষয়ে জানতে চাইলে আসামিপক্ষের রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মূসা কালিমুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, বুধবার আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানিতে আসামি সোহেল আদালতকে বলেছেন রামিসা হত্যায় ডলার নামের এক ব্যক্তিও জড়িত। তবে সোহেলের এ বক্তব্য আদালত বিবেচনা করবেন কি না তা আদালতের বিষয়।
রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বলেন, সোহেল এখন নিজেকে রক্ষা করতে ডলার নামে আরেকজনের নাম বলছে। আমার দৃঢ বিশ^াস ওর মিথ্যা কথা কেউ বিশ^াস করবে না। উল্লেখ্য, গত ১৯ মে পাশের ভাড়াটিয়া সোহেল রানা ধর্ষণ ও হত্যা করে আট বছর বয়সী শিশু রামিসাকে। এ ঘটনায় সোহেল ও তার স্ত্রীকে আসামি করে মামলা করেন রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান। সেই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে গতকাল বুধবার আসামিপক্ষের আত্মপক্ষ সমর্থন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার যুক্তিতর্কের শুনানি হবে।
