‘আমি দোষ করেছি, ডলারও করেছে’ আদালতে সোহেল

আজ যুক্তিতর্কের শুনানি

আপডেট : ০৪ জুন ২০২৬, ০২:২৯ এএম

পল্লবীতে শিশু রামিসাকে (৭) ধর্ষণের পর হত্যা মামলায় সবশেষ ধাপ যুক্তিতর্কের শুনানি হবে আজ বৃহস্পতিবার। গতকাল বুধবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন শুনানির জন্য এদিন ধার্য করেন। গতকাল আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার আত্মপক্ষ সমর্থন করে বক্তব্য দেয়। সোহেল রানা প্রথমে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে। যদিও পরে দোষ স্বীকার করে বলে, ‘আমি দোষ করেছি, ডলারও করেছে, আমাকে মাফ করে দিয়েন। আমার স্ত্রী কোনো দোষ করে নাই।’ আত্মপক্ষ সমর্থন করে সোহেলের স্ত্রী স্বপ্না নিজেকে নির্দোষ দাবি করে।

এর আগে গত মঙ্গলবার প্রধান আসামি অভিযুক্ত সোহেল রানা আদালত থেকে বেরিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের দায় চাপায় ডলার নামে এক ব্যক্তির ওপর। ওই দিন আসামি বলে, তিনি (সোহেল রানা) শুধু রামিসাকে দুই টুকরো করেছে। ধর্ষণ এবং হত্যা করেছে ডলার নামের মিরপুর-১১ নম্বর এলাকার একজন ধনী ব্যক্তি। যদিও মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ও পুলিশ বলছে, অভিযোগ থেকে নিজেকে বাঁচাতে আসামি সোহেল বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।

গতকাল সকাল ১১টা ১০ মিনিটে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামলাটির বিচারকাজ শুরু করেন। সোহেল রানা ও তার স্বপ্নাকে সকাল ১১টায় এজলাসে হাজির করা হয়। এর আগে সকাল সোয়া ৮টায় তাদের কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। এরপর তাদের মহানগর দায়রা আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়। বিচার কার্যক্রমের শুরুতে বিচারক মাসরুর সালেকীন ১৬ জন সাক্ষীর রেকর্ড করা সাক্ষ্য আসামিদের পড়ে শোনান। রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি আজিজুর রহমান দুলু ও আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী মুসা কালিমুল্যাহসহ অন্যান্য আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত ছিলেন। একপর্যায়ে আসামি সোহেল আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘স্যার আমি নির্দোষ। আমাকে মাফ করে দ্যান।’ আবার বলেন, ‘আমার সঙ্গে ডলার ছিল। সেটা কেউ দেখে নাই। তাকে ধরেন স্যার। সেও তো দোষী।’

গত মঙ্গলবার একদিনে ১৬ জনের সাক্ষ্য নেয় ট্রাইব্যুনাল। এদিন সাক্ষ্যগ্রহণের পাশাপাশি তাদের জেরাও করা হয়। এর আগে গত সোমবার মামলার দুই আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় একই আদালত। মঙ্গলবার রামিসার বাবা মামলার বাদী আব্দুল হান্নান মোল্লা ও মা পারভীন আক্তার, বড় বোন, ফুফু মাহমুদা আক্তার, চাচা মিজানুর রহমান লিটন, বাসার চতুর্থ তলার বাসিন্দা মনির হোসেন, প্রতিবেশী জাকিরুল ইসলাম রাজু, দ্বিতীয় তলার বাসিন্দা শেখ আবু সামা, ফুপা মনিরুজ্জামান শাহীন, কনস্টেবল রোমা আক্তার, কনস্টেবল শরীফ মিয়া, এসআই ইকবাল হোসেন, চিকিৎসক নাসাদ জাবিন, মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আমিনুল ইসলাম জুনাইদ, এসআই রাশেদুল ইসলাম ও তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. অহিদুজ্জামান স্বাক্ষ্য দেন। তবে রামিসার বোন রাইসা আক্তার  অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় ক্যামেরা কোর্টে  সাক্ষ্য নেয়  ট্রাইব্যুনাল।

গত ২৪ মে সোহেল রানা ও তার স্ত্রীকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার এসআই (উপ-পরিদর্শক) অহিদুজ্জামান। গত ২৩ মে বিকেলে রামিসার ডিএনএ রিপোর্ট তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

মামলা সূত্রে জানা যায়, রামিসা পপুলার মডেল হাইস্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল।  ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হলে অভিযুক্ত সোহেল রানার স্ত্রী স্বপ্না তাকে কৌশলে রুমের ভেতরে নেন। ওই দিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রামিসাকে স্কুলে যাওয়ার জন্য খোঁজাখুঁজি করতে থাকেন তারা একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান । ডাকাডাকির পর কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং অন্য ফ্ল্যাটের লোকজন দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। এরপর আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মাথাবিহীন মরদেহ এবং মাথা রুমের ভেতরে একটি বড় বালতির মধ্যে দেখতে পান। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ এর মাধ্যমে কল পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সোহেল রানা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়।

জবানবন্দিতে আসামি বলেন, ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রামিসা ঘর থেকে বের হলে তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার তাকে রুমের ভেতরে নিয়ে যায়। এরপর বাথরুমে নিয়ে ছোট্ট রামিসাকে ধর্ষণ করে সোহেল। এর মধ্যে শিশু রামিসার মা দরজায় কড়া নাড়তে থাকেন। এ সময় সোহেল তাকে গলা কেটে হত্যা করে। পরে মরদেহ গুম করার জন্য তার মাথা ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে গলা থেকে আলাদা করে। এরপর দুই হাত কাঁধ থেকে আংশিক বিচ্ছিন্ন করে মরদেহ বাথরুম থেকে শয়নকক্ষে এনে খাটের নিচে রাখে। ঘটনার সময় তার স্ত্রী একই রুমে ছিল। পরে জানালার গ্রিল কেটে পালিয়ে যায় সোহেল। এ ঘটনার দিন দুজনকে আসামি করে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করে শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা। মামলার প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় স্বপ্না আক্তারকে। পরে সোহেল রানাকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত