যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে পারলেও, ইরানিদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে অর্থনীতি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক চাপ সামাল দেওয়া। উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টাপাল্টি হামলায় পুনরায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কার সঙ্গে দেশটির জনগণের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে মূল্যস্ফীতির লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ সংকট, ভিন্নমত দমন এবং বেকারত্ব। কয়েক দশকের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি শুধু বিপর্যস্তই হয়নি; দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইরানে মুদ্রাস্ফীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পণ্য ও সেবামূল্য পরিমাপক ভোক্তা মূল্যসূচক গত বছরের মে মাসের তুলনায় এ বছরের মে মাসে ৭৭.২ শতাংশে পৌঁছেছে। সংস্থাটি আরও জানায়, এই হার গত এপ্রিল মাসের চেয়ে ৮.৫ শতাংশ বেশি। ওষুধ, ট্যাক্সি ভাড়া, তামাক এবং যোগাযোগ ব্যয়ের মতো দৈনিক ও সাধারণ প্রয়োজনীয় খাতের মুদ্রাস্ফীতি আগের বছরের চেয়ে ১১৩.৮ শতাংশ বেড়েছে। যুদ্ধের কারণে ইরানের মুদ্রা রিয়াল চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যুদ্ধ নতুন করে শুরুর অনিশ্চয়তা এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্যের আবরণ সরে গেলে বহু পুরনো সংকট আবারও সামনে চলে আসতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে ইরানের অর্থনীতি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ১৩০ শতাংশ, আর মাংস ও মুরগির দাম বেড়েছে ১৭৬ শতাংশ। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুদ্ধ শেষ হলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে না। বরং অর্থনৈতিক চাপ আরও প্রকট হতে পারে। ইরানের সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, যুদ্ধের আগে যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট বিক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল, সেগুলোর কোনো সমাধান হয়নি। নৌঅবরোধ, মূল্যবৃদ্ধি এবং ইন্টারনেট সীমাবদ্ধতার কারণে লাখো মানুষের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের মতে, আনুষ্ঠানিকভাবে অসন্তোষ প্রকাশের সুযোগ সীমিত থাকায় যেকোনো সময় নতুন করে জনঅসন্তোষ দেখা দিতে পারে।
অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন, উৎপাদন সচল রাখতে জনগণকে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টার বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য প্রস্তুত থাকতে হতে পারে। যদিও সরকার তাৎক্ষণিক লোডশেডিংয়ের আশঙ্কা নাকচ করেছে, তবুও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। অনেকের আশা, যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অবরোধ শিথিল হলে ইরান কিছুটা স্বস্তি পাবে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কেবল বিদেশি অর্থপ্রবাহ বড় পরিবর্তন আনবে না। কার্যকর সংস্কার এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া অর্থনৈতিক সংকট কাটানো কঠিন হবে।
যুদ্ধের মধ্যেও ভিন্নমত দমন, মৃত্যুদণ্ড এবং নাগরিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক থামেনি। সংস্কারপন্থি গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক উদারতা ও ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বহুত্ববাদের সুযোগ এখনো সীমিত। তাদের ভাষ্য- ইরানের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যুদ্ধ জেতা নয়, শান্তি টিকিয়ে রাখা। অর্থনৈতিক অবরোধ অব্যাহত থাকলে এবং পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় পুঁজি ও প্রযুক্তি না এলে যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সাময়িক সংকট হয়ে থাকবে না; বরং তা দেশটির সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার স্থায়ী অংশ হয়ে উঠতে পারে।
এর আগে ১৯৪২ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইরান সবচেয়ে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি দেখেছিল। সে সময় ব্রিটিশ ও সোভিয়েত বাহিনী ইরান আক্রমণ করে দেশটির রেল ব্যবস্থা দখল করে নিলে খাদ্যসরবরাহ বিঘ্নিত হয়েছিল। সেই খাদ্যসংকট তীব্র মুদ্রাস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষের জন্ম দেয়। ক্ষুধা ও টাইফাসের প্রাদুর্ভাবে তখন বহু মানুষ মারা গিয়েছিল। ইরানের একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বামদাদ ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক স্টাডিজ বর্তমানের এই পরিসংখ্যানকে ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নজিরবিহীন হার’ বলে বর্ণনা করেছে। চলতি বছরের বিমান হামলাগুলো ইরানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং তেলশিল্পের ব্যাপক ক্ষতি করেছে। এর পাশাপাশি মার্কিন নৌ-অবরোধের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজগুলোকে আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া, যা দেশটির আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। লড়াই সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার পরও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকার লড়াই করায় কর রাজস্ব কমে গেছে। ২০১৫ সালে যেখানে প্রতি ডলারের বিপরীতে রিয়ালের বিনিময় হার ছিল ৩২ হাজার, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১৭ লাখ রিয়ালের বেশিতে।
