দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ০২:২৭ পিএম

দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সনদনির্ভর ধারা থেকে বের করে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষায় রূপান্তরের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে নিজেদের প্রস্তুত করতে না পারলে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, ফরেনসিক বিজ্ঞান, প্রোগ্রামিং, ডিজিটাল উদ্যোক্তা উন্নয়ন, ডিজিটাল যোগাযোগ, জ্ঞানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, উপস্থাপন দক্ষতা, নেতৃত্ব এবং আর্থিক সচেতনতার মতো দক্ষতাগুলো ছাড়া আধুনিক শিক্ষাক্রম পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

রবিবার (৭ জুন) ‘জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্তি’ শীর্ষক জাতীয় প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিয়ে আলোচকদের বক্তব্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী শাসন শুধু জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারই কেড়ে নেয়নি, শিক্ষা ব্যবস্থাকেও প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিল। তবে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে এখন ঘুরে দাঁড়ানোর সময় এসেছে এবং দেশের সামনে যে বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে, তা জাতিকে নতুন উদ্দীপনা জোগাচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ অর্জন থেকে শুরু করে ইতিহাসের প্রতিটি পর্যায়ে যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের প্রতি প্রকৃত সম্মান জানাতে হলে একটি জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে হবে। 

তিনি উল্লেখ করেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় দেশের আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চশিক্ষা বিস্তারে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কারণ, সারা দেশে এর অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি এবং সেখানে প্রায় ৪০ লাখ শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। ইতোমধ্যে এক কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন।

তারেক রহমান বলেন, উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করা এবং শহর-গ্রামের শিক্ষার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক ব্যবহার মানুষের সামনে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ব্যবস্থার কারণে অনেক পুরোনো পেশা ঝুঁকির মুখে পড়েছে কিংবা বিলুপ্ত হয়েছে, আবার একই সঙ্গে অসংখ্য নতুন কর্মক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে। এ বাস্তবতায় সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাস্তবমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার কোনো বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, জেনেটিক প্রকৌশল, জীবপ্রযুক্তি, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, শিল্প ইন্টারনেট অব থিংস, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, ন্যানোপ্রযুক্তি, ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তি এবং পঞ্চম প্রজন্মের বেতার প্রযুক্তির মতো বিষয়গুলোর প্রতি উদাসীন থাকলে ভবিষ্যতে সাফল্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। এ কারণে বর্তমান সরকার প্রাক-প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্রমকে বাস্তবভিত্তিক, বহুমুখী, কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার কাজ শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই সময়ে শিক্ষাক্রম সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। সেই বাস্তবতা উপলব্ধি করেই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সময়োপযোগী, আধুনিক ও বাস্তবমুখী পাঠ্যক্রম প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা বিষয়ে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির এই আয়োজন সেই উদ্যোগেরই বাস্তব প্রতিফলন।

তিনি আরও বলেন, শিক্ষা এখন শুধু ব্যক্তিগত উন্নয়নের বিষয় নয়; প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা তৈরির প্রধান নিয়ামক। তাই উচ্চশিক্ষাকে আরও কর্মমুখী করতে শিল্পখাত ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-শিক্ষাঙ্গন সংযোগ বাধ্যতামূলক করা সময়ের দাবি।

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এই সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ জরুরি হলেও নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, একজন মানবিক মানুষ হয়ে ওঠার জন্য নৈতিক শিক্ষা অপরিহার্য। প্রযুক্তিনির্ভরতা ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, মানবিকতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়েও অধিক গুরুত্ব দিতে হবে।

উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হলেও অনেককে বেকার থাকতে হয়। এর অন্যতম কারণ হলো একাডেমিক সনদ অর্জন করলেও ব্যবহারিক, প্রাযুক্তিক ও কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি। এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও বাস্তবমুখী করতে শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্প-শিক্ষাঙ্গন সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে বিভাগীয় শহরগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা অর্জন করতে পারবেন এবং শিক্ষা জীবন শেষে বেকার না থেকে কর্মজীবনে দ্রুত প্রবেশের সুযোগ পাবেন।

ক্যাম্পাসভিত্তিক উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী ব্যবসায়িক ধারণাকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় ‘সিড ফান্ডিং’ বা উদ্ভাবনী অনুদান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর মাধ্যমে তরুণ উদ্যোক্তারা নতুন ও সৃজনশীল ব্যবসায়িক ধারণা বাস্তবায়ন করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারবেন। শিক্ষার্থী অবস্থায় অর্জিত বাস্তব দক্ষতা তাঁদের শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, বরং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী উদ্যোক্তা হিসেবেও গড়ে তুলবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষকের জ্ঞান, দক্ষতা, সততা ও অঙ্গীকারের ওপর শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য নির্ভর করে। তাই শিক্ষকদের শুধু পাঠদান নয়, শিক্ষার্থীদের সামনে আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবেও গড়ে উঠতে হবে। একই সঙ্গে তাঁদের সমাজ পরিবর্তনের অগ্রদূত ও পথপ্রদর্শকের ভূমিকাও পালন করতে হবে।

তিনি দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, দেশের তরুণদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা গেলে খুব শিগগিরই বাংলাদেশ বিশ্বের কাছে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর রাষ্ট্রের আদর্শ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারবে। তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, নিজেদের যথাযথভাবে গড়ে তুলতে পারলে তারাই হবে আগামী দিনের সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও মানবিক বাংলাদেশের নির্মাতা। প্রযুক্তিগত জ্ঞানের পাশাপাশি ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধেও নিজেদের সমৃদ্ধ করতে হবে।

বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি তৃতীয় একটি ভাষা শেখার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি তৃতীয় একটি ভাষা আয়ত্ত করতে পারে, তাহলে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ আরও বিস্তৃত হবে।

তিনি বলেন, জনগণের কাছে দায়বদ্ধ এই সরকার একটি জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ গড়ে তুলতে চায়। আর সেই সমাজ গঠনের ভিত্তি হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিক্ষা, গবেষণা, মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।

জাতীয় উন্নয়নকে সম্মিলিত যাত্রা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাজ নয়। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, নাগরিক সমাজ এবং শিল্পখাত- সবার সমন্বিত সহযোগিতার মাধ্যমেই কাঙ্ক্ষিত অগ্রযাত্রা সম্ভব। ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে পারলে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

বক্তব্যের শেষাংশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, এমন একটি কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যা শুধু চাকরি দেবে না; বরং দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি করবে, জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তর করবে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করবে। এই শিক্ষা শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়, সামাজিক রূপান্তরের ভিত্তিও নির্মাণ করবে এবং জাতীয় সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত