দীর্ঘ ৪০ বছর পর গত মার্চে যখন ইরাক জাতীয় ফুটবল দল ২০২৬ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করল, তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে উঠেছিলেন ইরাকি সমর্থক আবদুল্লাহ আদনান। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠেয় নরওয়ে ও ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের টিকিটও কিনে ফেলেছিলেন তিনি। কিন্তু স্টেডিয়ামে বসে দেশের জন্য গলা ফাটানোর সেই স্বপ্ন এখন মার্কিন ভিসা নীতির বেড়াজালে আটকে গেছে।
আদনানের মতো এমন হাজারো ফুটবল অনুরাগী এখন চরম হতাশ। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি সাম্প্রতিক ডেটা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এবারের বিশ্বকাপে যোগ্যতা অর্জনকারী দেশগুলোর এক-চতুর্থাংশেরও বেশি দেশের সমর্থকরা যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, কড়া নিয়মকানুন এবং উচ্চ ভিসা প্রত্যাখ্যান হারের মুখোমুখি হচ্ছেন।
ইরাক সরাসরি ট্রাম্প প্রশাসনের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না থাকলেও আদনানের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি। ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা জনিত কারণে ইরাকে মার্কিন দূতাবাস তাদের নিয়মিত কনস্যুলার সেবা স্থগিত রেখেছে। ফলে ভিসা ইন্টারভিউ দেওয়ার কোনো সুযোগ দেশের ভেতরে নেই।
ভিসার আশায় আদনান প্রতিবেশী দেশ জর্ডানে গেলেও সেখান থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়, কারণ তিনি জর্ডানের নাগরিক নন। টিকিট এবং এই ভ্রমণের পেছনে ইতিমধ্যে তার ১,৮০০ মার্কিন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়ে গেছে। তুরস্ক গিয়ে চেষ্টা করার সময় ও সুযোগ না থাকায় শেষ পর্যন্ত তিনি বিশ্বকাপের আশা ছেড়ে দিয়েছেন।
ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা ও আফ্রিকান সমর্থকদের ক্ষোভ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কড়া অভিবাসন নীতির অংশ হিসেবে তৈরি করা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে এবারের বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা চার দেশ—হাইতি, ইরান, সেনেগাল এবং আইভরি কোস্ট। এসব দেশের নাগরিকদের ওপর পর্যটক ও সাধারণ দর্শক ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
আইভরি কোস্টের অফিশিয়াল সমর্থক গোষ্ঠীর প্রতিনিধি জুলিয়েন কুয়াদিও আদোনিস ক্ষোভ প্রকাশ করে একে এক ধরনের 'বর্ণবৈষম্য বা বিভাজন' বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, "ইউরোপের কোনো দেশকে এমন বিধিনিষেধের মুখে পড়তে হয়নি, তাহলে আফ্রিকার ওপর কেন এই কোপ? ফুটবল হলো একটা প্রদর্শনী, আর প্রদর্শনীর জন্য দর্শক অপরিহার্য। যে দেশ অন্য দেশের সমর্থকদের স্বাগত জানাতে পারে না, তাদের বিশ্বকাপ আয়োজন করতে দেওয়া উচিত নয়।"
অথচ বিশ্বের ৪২টি ধনী দেশের নাগরিকরা মাত্র ৪০ ডলার খরচ করে অনলাইনের মাধ্যমে কোনো ভিসা ছাড়াই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন, যার মধ্যে আফ্রিকার কোনো দেশ নেই। সাধারণ দর্শকদের জন্য মার্কিন ভিসার আবেদন ফি ১৮৫ ডলার, যেখানে কঠোর ইন্টারভিউয়ের মুখোমুখি হতে হয়।
৪২ শতাংশের বেশি ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার
বিবিসি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের (অক্টোবর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত) তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া ৪৮টি দেশের মধ্যে ১১টি দেশের নাগরিকদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার ৪০ শতাংশের বেশি। এই তালিকায় থাকা দেশগুলো হলো—ইকুয়েডর, মিশর, হাইতি, আলজেরিয়া, উজবেকিস্তান, কেপ ভার্দে, জর্ডান, ইরান, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো, ঘানা এবং সেনেগাল।
জর্ডানের ফুটবল সমর্থক সমিতির প্রধান আবু কাস, যার নিজের ভিসার আবেদনও ৪২টি নথিপত্র দেখানোর পরও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, তিনি বলেন, 'এই বিশ্বকাপ আমাদের মতো আরবদের জন্য নয়, এটা কেবল ওদের (পশ্চিমাদের) জন্য। ফ্যান অ্যাসোসিয়েশনের প্রধানেরই যদি ভিসা না হয়, তবে সাধারণ সমর্থক কার হবে?"
ভিসা জটিলতা কমাতে ফিফা টিকিট ক্রেতাদের জন্য 'ফিফা পাস' ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মাধ্যমে দ্রুত ইন্টারভিউয়ের তারিখ পাওয়া যায়। তবে অভিবাসন আইনজীবীরা বলছেন, এটি প্রক্রিয়া দ্রুত করলেও ভিসা পাওয়ার নিশ্চয়তা বাড়ায় না। এমনকি ভিসা থাকলেও মার্কিন সীমান্তে বর্ডার কর্মকর্তারা যে কাউকে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন।
এদিকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র জানিয়েছেন, তারা ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত এবং অধিকাংশ বিদেশি সমর্থকের ভিসার প্রয়োজন নেই কারণ তারা কানাডা বা ভিসা-মুক্ত ৪২টি দেশের নাগরিক। তবে দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতিটি আবেদন কঠোরভাবে যাচাই করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ওয়ানডে বা ট্যুরিস্ট ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অবৈধভাবে থেকে যাওয়ার (ওভারস্টে) আশঙ্কার কারণেই এই কড়াকড়ি বলে জানিয়েছে মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি।
যৌথ আয়োজক হলেও ১০৪টি ম্যাচের মধ্যে ফাইনালসহ ৭৮টি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে। অন্য দুই আয়োজক দেশ কানাডা ও মেক্সিকোর ভিসা নীতি ভিন্ন হলেও কূটনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক দেশের সমর্থক সেখানেও বিপাকে পড়েছেন।
ভেরেভকে পঞ্চম সেটে টেনে নিয়ে আর পারলেন না কোবল্লি