কুবি শিক্ষার্থী ও তার মাকে হত্যা, ৯ মাসেও হয়নি চার্জশিট

আপডেট : ০৮ জুন ২০২৬, ০৬:২৭ পিএম

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন রিনথী ও তার মা তাহমিনা বেগম হত্যাকাণ্ডের ২৭২ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি। আলোচিত এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি আদালতে দোষ স্বীকার করলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্বের কারণে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, গত বছর ৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় সুমাইয়া আফরিন ও তার মা তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়। ঘটনার দিনই অভিযান চালিয়ে মোবারক হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার ১ নম্বর আমলি আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন। একপর্যায়ে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেলেও বিচার সম্পন্ন হয়নি। আসামীর স্বীকারোক্তির পরেও বিচারিক কার্যক্রম ও শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার ও সুমাইয়ার সহপাঠীরা।

সুমাইয়া আফরিনের সহপাঠী মেহেদী হাসান শাহিন বলেন, তৎকালীন পুলিশ, প্রশাসন, ইন্টেরিম সরকারকে বাঁচানোর জন্য এই ঘটনাটাকে ধামাচাপা দিয়েছিল। ভাইরাল হয়নি আমরা বিচারও পাইনি। বাংলাদেশে তো ভাইরাল না হলে আবার বিচার পাওয়া যায় না। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন থাকবে যেন এই নৃশংসতার বিচার আমরা পাই। ধর্ষক যেন পার না পেয়ে যায়। এর ব্যতিক্রম হলে আমরা সারাদেশ আন্দোলনের ডাক দিব।

এবিষয়ে নিহত সুমাইয়ার বড়ো ভাই মো. সাইফুল বলেন, এটা ওনাদেরও একটু গাফিলতি থাকতে পারে। গাফিলতি না থাকলে তো এত দেরি হওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিচার প্রক্রিয়া হচ্ছে সরকারি মহল থেকে যত চাপ দেওয়া হবে, তত দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। সবার জন্য সমান সুবিধা থাকে না, আমার দৃষ্টিকোণ থেকে তাই মনে হয়।

তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার একটাই দাবি, যত দ্রুত সম্ভব বিচার কার্যক্রম শুরু করা এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আর কোনো বিলম্ব না করে মামলার বিচার সম্পন্ন করা।

মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিহত পরিবারের পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সোহেল হোসাইন বলেন, মামলাটির ধার্য তারিখ রয়েছে। আসামি জামিনের আবেদনও করেননি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম এগোবে না।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শরিফ ইবনে আলম জানান, তদন্ত শেষ হয়েছে। আমরা চার্জশিট প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছি এবং সাক্ষীদের স্মারকলিপিও দাখিল করেছি। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে চার্জশিট আদালতে পাঠানো হবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) জমা দেওয়ার আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হয়। কয়েকদিনের দিনের মধ্যেই আমরা প্রতিবেদন জমা দিতে পারব।”

তদন্তে এতদিন সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে জবাবদিহি করতে বাধ্য কিনা উলটো জানতে চান এবং বলেন,আমি কতদূর কাজ করেছি বা করিনি, তা আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন। আমি তাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। আপনার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য কি না, সেটাই আগে বলুন।

এবিষয়ে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানকে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও যোগাযোগ সম্ভব হয়নি।

পুলিশ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ঝাড়ফুঁকের সূত্রে সুমাইয়ার পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয় মোবারক হোসেনের। ঘটনার আগে প্রায় এক মাস ধরে তিনি নিয়মিত ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, সুমাইয়ার ওপর ঝাড়ফুঁক করার সময় তাকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি দেখে ফেলায় প্রথমে সুমাইয়ার মা তাহমিনা বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে সুমাইয়াকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর বাসা থেকে চারটি মোবাইল ফোন ও একটি ল্যাপটপ নিয়ে পালিয়ে যান তিনি।

অভিযুক্ত মো. মোবারক হোসেন (২৯) কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের মৃত আবদুল জলিলের ছেলে। তিনি কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন। পেশায় ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজির কাজের পাশাপাশি বাবুস সালাম জামে মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত