শব্দের অত্যাচার নিঃশব্দ ক্ষতি

আপডেট : ১০ জুন ২০২৬, ০৭:০২ এএম

রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এর চারপাশের প্রধান সড়কগুলোকে ‘নীরব এলাকা’ বা হর্নমুক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। উদ্দেশ্য নিঃসন্দেহে ভালো উদ্যোগ। শব্দদূষণে জর্জরিত এই মেগাসিটিকে অন্তত কিছুটা স্বস্তি দেওয়া। তবে ঢাকার রাস্তায় যারা নিয়মিত যাতায়াত করেন, তারা জানেন এই শহরের ট্রাফিক জ্যাম যতটা না দৃশ্যমান তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রুতিগোচর। সিগন্যালে গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, চাকার এক ইঞ্চি নড়ার উপায় নেই, অথচ চারপাশ থেকে তীব্র হর্নের আওয়াজে কান পাতা দায়। এই যে স্থবিরতার মধ্যেও অবিরাম শব্দ  তৈরি করার এক অদ্ভুত প্রতিযোগিতা, তা কেবল আইনের অভাব নয় বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক জট, সাংস্কৃতিক অনীহা এবং কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা। কেবল সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বা জরিমানার ভয় দেখিয়ে ঢাকার চিরচেনা এই ‘হর্ন সংস্কৃতির’ অবসান ঘটানো কতটা বাস্তবসম্মত, তা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

আমাদের দেশের গাড়িচালকদের হর্ন বাজানোর প্রবণতা নিছক কোনো যান্ত্রিক প্রয়োজন নয়, এটি একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক আচরণ। আমাদের দেশের চালকদের একাংশের কাছে হর্ন হলো এক ধরনের ‘কণ্ঠস্বর’ বা আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তীব্র যানজট, অপরিকল্পিত রাস্তা এবং দীর্ঘ প্রতীক্ষা চালকদের মধ্যে যে অবদমিত ক্ষোভ, হতাশা ও তীব্র মানসিক চাপ তৈরি করে, হর্ন বাজানো মূলত তারই এক ধরনের অবচেতন বহিঃপ্রকাশ। সিগন্যালে দাঁড়িয়ে হর্ন দেওয়া কোনো যৌক্তিক আচরণ নয়, এটি আসলে ভেতরের চরম বিরক্তি প্রকাশের একটি যান্ত্রিক উপায়। আবার অনেক চালকের মধ্যে এক ধরনের ‘ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব’ কাজ করে; ভারী বা দামি গাড়ির চালকরা হর্ন বাজিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করতে চান, যা মূলত পথচারী বা অপেক্ষাকৃত ছোট যানবাহনকে ভয় দেখানোর একটি কৌশল।

আমাদের সামাজিক সংস্কৃতিতেই আইন মানার প্রতি এক ধরনের যৌথ অনীহা বা উদাসীনতা লক্ষ করা যায়। উন্নত বিশ্বে হর্ন বাজানোকে অত্যন্ত অশোভন এবং এক ধরনের ‘আগ্রাসন’ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু আমাদের দেশে হর্ন বাজানোকে মনে করা হয় গাড়ি চালানোর একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় অংশ। এমনকি অনেক চালক মনে করেন, হর্ন না বাজালে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। রাস্তা পারাপারের সময় পথচারীদের জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার না করে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া এবং চালকদের তাদের সতর্ক করতে সজোরে হর্ন দেওয়া এই দুইয়ে মিলে একটি দুষ্টচক্র তৈরি হয়েছে। আইন থাকা সত্ত্বেও তা অমান্য করার মধ্যে এক ধরনের বীরত্ব খোঁজার যে সামাজিক ব্যাধি আমাদের মধ্যে আছে, হর্নের যথেচ্ছ ব্যবহার তারই একটি প্রতিচ্ছবি। সামাজিকভাবে আমরা শব্দদূষণকে এখনো বড় কোনো অপরাধ বা স্বাস্থ্যঝুঁকি হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পারিনি, যা এই সাংস্কৃতিক অনীহাকে আরও টিকিয়ে রাখছে। শব্দের অত্যাচার নিঃশব্দ ক্ষতি বাড়াচ্ছে ক্রমাগত।

সরকারের এই নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হলো রাতারাতি অভ্যাস পরিবর্তনের অলীক প্রত্যাশা। শুধু জরিমানা বা শাস্তির ভয় দেখিয়ে অনেকের দীর্ঘদিনের মজ্জাগত আচরণ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এখানে ট্রাফিক পুলিশ এবং প্রশাসনের সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট। প্রথমত, ঢাকার রাস্তায় যানবাহনের তুলনায় ট্রাফিক পুলিশের সংখ্যা অত্যন্ত অপ্রতুল। প্রতিনিয়ত ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ এবং ভিভিআইপি মুভমেন্ট সামলাতে গিয়ে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা এমনিতেই হিমশিম খান। তার ওপর কে, কখন, কেন অপ্রয়োজনে হর্ন বাজাল তা সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করা এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া অত্যন্ত দুরূহ কাজ। আধুনিক প্রযুক্তির নজরদারি যেমন ‘নয়েজ ডিটেক্টর ক্যামেরা’ বা স্বয়ংক্রিয় ফাইন সিস্টেমের অনুপস্থিতিতে কেবল মানুষের চোখ আর কানের ওপর ভরসা করে এই বিশাল সড়কে হর্নমুক্ত জোন কার্যকর করা প্রায় অসম্ভব। ফলে আইনটি কাগজে-কলমে কঠোর হলেও প্রয়োগের ক্ষেত্রে তা কতটা সফলতা বয়ে আনবে এ প্রশ্ন থেকেই যায়।

তাহলে এই বৃত্ত থেকে বের হওয়ার পথ কী? ঢাকাকে প্রকৃত অর্থেই হর্নমুক্ত করতে হলে একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ প্রয়োজন, যা শুরু হতে হবে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন দিয়ে। কেবল ভয় দেখিয়ে নয়, চালকদের বোঝাতে হবে যে, এই শব্দদূষণ তাদের নিজেদের শ্রবণশক্তি এবং মানসিক স্বাস্থ্যেরও চরম ক্ষতি করছে। এর জন্য গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং পরিবহন টার্মিনালগুলোতে ব্যাপক ও আকর্ষণীয় সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। ‘হর্ন না বাজানোই দক্ষতার লক্ষণ’ এই বার্তাটি চালকদের মগজে ঢুকিয়ে দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (যখন কোনো চালককে লাইসেন্স প্রদান করবে, তখন কেবল গাড়ি চালানোর দক্ষতার পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে একটি মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা এবং আচরণগত প্রশিক্ষণের পরিকল্পিত ব্যবস্থা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের অংশ হিসেবে পর্যায়ক্রমে পুরো ঢাকাকে নীরব এলাকায় রূপান্তর করতে হবে। বিমানবন্দর সড়ক দিয়ে শুরু হওয়া এই পাইলট প্রজেক্টের সাফল্য ও ব্যর্থতা মূল্যায়ন করে পরবর্তী এক বছরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল এলাকা, দুই বছরে আবাসিক এলাকা এবং পাঁচ বছরের মধ্যে বাণিজ্যিক এলাকাগুলোকে হর্নমুক্ত অঞ্চল ঘোষণা করতে হবে। তবে এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা চাই।

একটি আধুনিক নগরীর অন্যতম প্রধান শর্ত হলো, তার শান্ত ও বাসযোগ্য পরিবেশ। ঢাকা বিমানবন্দর এলাকাকে হর্নমুক্ত করার সরকারি সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় সূচনা। তবে এই সূচনাকে সফল পরিণতিতে নিয়ে যেতে হলে প্রয়োজন আইনের কঠোরতার সঙ্গে মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক সংস্কারের এক অভূতপূর্ব সমন্বয়। আমরা আশা করি, শব্দের এই রাজত্ব ভেঙে ঢাকা একদিন সত্যিই একটি শান্ত, সুশৃঙ্খল এবং মর্যাদাপূর্ণ মেগাসিটিতে রূপান্তরিত হবে। স্বচ্ছ সুশাসন আর নাগরিক সচেতনতাই হোক সেই শান্ত ঢাকার মূল ভিত্তি।

লেখক : সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

[email protected]  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত