অপরাধীকে কোনো ছাড় নয়যুক্তরাষ্ট্রের ৩০তম প্রেসিডেন্ট ক্যালভিন কুলিজ বলেছিলেন, ‘মানুষের জীবনের নিরাপত্তা রক্ষার চেয়ে বড় কোনো কিছুই নেই।’ আধুনিক বিশ্ব সমাজে জননিরাপত্তা মানবাধিকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে গণ্য। ৯ জুন দেশ রূপান্তরের একাধিক প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, সংঘাত-সহিংসতার পাশাপাশি বাড়ছে অপহরণসহ বহুমাত্রিক অপরাধ প্রবণতা। আমরা দেখছি, সংবাদমাধ্যমে খুন-খারাবি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বহুবিধ সমাজবিরোধী কর্মকাণ্ডের মর্মস্পর্শী সংবাদ উঠে আসছে। আমরা জানি, যেকোনো স্থিতিশীল সমাজের অন্যতম শর্ত জননিরাপত্তা। ৮ জুন রাজধানীর মৌচাক এলাকায় একই রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী এক নেতার হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন আরেক নেতা। বিএনপির দুটি অঙ্গসংগঠনের এই দুই নেতার মরণঘাতী সংঘাতের অন্তর্নিহিত কারণ স্পষ্ট নয়।
আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৭ জুন রাজধানীর মতিঝিল ব্যাংক পাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ২৪ ঘণ্টা অতিক্রান্ত হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা কাউকে আটক করতে পারেনি। আরও গুরুতর বিষয় হলো বখাটে, প্রভাবশালী অপরাধী এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বলবানদের ছত্রছায়ায় থাকা দুষ্কর্মকারীরা অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগী অনেকেই লোকলজ্জার ভয়ে আইনানুগ প্রতিবিধানের জন্য অভিযোগই করেন না! ‘লজ্জা’র আড়ালে নির্ভার অপরাধী শিরোনামে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনের গর্ভে যা উঠে এসেছে তাতে প্রতীয়মান হয়, ভুক্তভোগীদের ‘লোকলজ্জা’ অপরাধীদের অপরাধ করে নিষ্কৃতি পাওয়ার মোক্ষম অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এর অপছায়া শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত। আবার অনেক ভুক্তভোগী
থানা-পুলিশ বিড়ম্বনার ভয়েও প্রতিবিধানের পথে হাঁটেন না। এর পাশাপাশি বিলম্বিত বিচার কিংবা বিচার প্রক্রিয়ার স্তরে স্তরে জিইয়ে থাকা নানারকম প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করছে নিরাপত্তাহীনতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট। দেখা যাচ্ছে, বহুমাত্রিক জটিলতার বৃত্তাবদ্ধ হয়ে রয়েছে জননিরাপত্তার মতো জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ৮ জুন জাতীয় সংসদে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা টিআইবির একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫ খুন ও ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটার পাশাপাশি আরও অনেক অপরাধমূলক ঘটনা ঘটেছে। আমরা জানি, বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনার। আমরা বিশ্বাস করি, সরকার তাদের প্রত্যয়ে দৃঢ় প্রত্যয়ী থেকে নিñিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষমতার পরিচয় দেবে। একই সঙ্গে আমরা এও মনে করি, ‘লজ্জা’র মতো অনাকাক্সিক্ষত ভীতিকর মানসিকতা ভুক্তভোগীকে নিজের, পরিবারের ও সমাজের বৃহৎ স্বার্থে ত্যাগ করতেই হবে। সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাইকে বিশেষ করে পুলিশকে সময়ক্ষেপণ না করে পালন করতে হবে যথাযথ ভূমিকা।
আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে শুধু সামাজিক অস্থিরতাই প্রত্যক্ষ কারণ নয়, এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো বিষয়গুলোও সম্পৃক্ত থাকে। ইতিপূর্বে সংবাদমাধ্যমেই উঠে এসেছিল, রাজনৈতিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে। আমরা এও দেখেছি, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো গুরুতর অপরাধপ্রবণতা কীভাবে বেড়েছিল। চাঞ্চল্যকর কোনো ঘটনা ঘটলে সংবাদমাধ্যম মুখর হয়ে ওঠে, সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সমালোচনা হয়, প্রশাসনের কারও কারও গাফিলতির চিত্রও উঠে আসে কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে নানা মহল থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের দায়িত্বশীলরা নড়েচড়ে বসেন বটে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর কোনো সুফল দৃশ্যমান হচ্ছে না।
আমরা আশা করব, কোনো অভিযোগই তুড়ি মেরে উড়িয়ে না দিয়ে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে এর উৎস সন্ধান করে যথাযথ প্রতিবিধান নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সব পক্ষের দায়িত। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বলা যায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কিংবা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ। অপরাধী যেই হোক তার প্রতি কোনো অনুকম্পা দেখানো যাবে না।