বাজেট বাস্তবায়নে দূরদর্শিতা দক্ষতা ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন

আপডেট : ১৪ জুন ২০২৬, ০৭:২৭ এএম

দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি (এফবিসিসিআই) প্রস্তাবিত ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে। সংগঠনটি মনে করে, বাজেটের আকার বড় হলেও বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। প্রয়োজন দূরদর্শিতা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা।

গতকাল শনিবার এফবিসিসিআই প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের ওপর পর্যবেক্ষণ শীর্ষক এক বিবৃতিতে এ দাবি করেছে। তবে- অর্থবিল এবং বাজেট সম্পর্কিত আয়কর, মূসক ও শুল্ক প্রজ্ঞাপনগুলো সংগঠনটির পক্ষ থেকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট-বিষয়ে এফবিসিসিআই তাদের সদস্য সংগঠন থেকে মতামত চেয়েছে। যার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর এফবিসিসিআই বাজেট পরবর্তী সুপারিশ করবে।

বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরূকরণের বাস্তবতার মাঝেও একটি যৌক্তিক, বাস্তবায়নযোগ্য ও শিল্প-বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রণয়নে সরকার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সরকারের সঙ্গে আমরাও আত্মবিশ্বাসী যে, সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন, নিরাপদ ও শোভন কর্মসংস্থান, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র নিশ্চিতকরণে প্রস্তাবিত বাজেট একটি নীতি পরিকল্পনা হিসেবে ভূমিকা রাখবে।’

প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ঘোষণা করায় অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সর্বোপরি ন্যায্যতাকে মূল বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

এফবিসিসিআই মনে করে, নির্বাচনী ইশতেহার এবং সরকারের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার আলোকে বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান, ব্যবসার পরিবেশ, আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রভৃতি খাতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টায় বাজেটে থ্রিআর কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। এর আওতায় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ ও বেসরকারি খাতের উন্নয়ন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে বলে সংগঠনটি আশা করছে।

বিবৃতিতে এফবিসিসিআই বলেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য সরকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে যা বিগত অর্থবছরের তুলনায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা (১৮ দশমিক ৭ শতাংশ) বেশি। বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কর্মসৃজন সৃষ্টি, বিভিন্ন স্তরের জনসাধারণ বিশেষ করে নিম্ন আয়ের সুবিধাবঞ্চিত জনগণকে সুবিধা প্রদান এবং সর্বোপরি এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে যেতে এ বাজেটের আকার অবাস্তব নয়। তবে দেশের ইতিহাসের এই সর্বোচ্চ বাজেট বাস্তবায়নে সরকারকে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ৭ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থনীতিতে টেকসই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনসাধারণের জীবনযাত্রায় স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে এই লক্ষমাত্রা অর্জিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।

রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা : প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা- যা জিডিপির ১০ দশমিক ২ শতাংশ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাতের লক্ষ্যমাত্রা ৯১ হাজার কোটি টাকা। এ বিশাল রাজস্ব আদায় সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যলেঞ্জ। এমনিতেই বর্তমানে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকসহ রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়া বিশ্বব্যপী বিরাজমান কঠিন পরিস্থিতির কারণে ভীষণ চাপের মুখে। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি-ব্যবসা-বিনিয়োগবান্ধব রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার জরুরি বলে আমরা মনে করি।

বাজেট ঘাটতি : ঘাটতি সম্পর্কে এফবিসিসিআইয়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা যা জিডিপির ৩.৬ শতাংশ। ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা নিতে হবে এবং বৈদেশিক উৎস হতে নিতে হবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। যদিও ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছর থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা হ্রাস করা হয়েছে তবুও ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণগ্রহণের ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কেননা, ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের ঋণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। এতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বাজেট ঘাটতি মেটাতে স্থানীয় ব্যাংক ব্যবস্থার পরিবর্তে যথাসম্ভব সুলভ সুদে ও সতর্কতার সঙ্গে বৈদেশিক উৎস হতে অর্থায়নের জন্য নজর দেওয়া যেতে পারে।

বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দক্ষতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং তদারকির মান ক্রমাগতভাবে উন্নয়নের জন্য সুস্পষ্ট দিক-নির্দেশনা ও পরিকল্পনা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়াও বাজেট বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি খাতের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করার জন্য এফবিসিসিআই আহ্বান জানিয়েছে।

সুদের দায় মেটানো : অভ্যন্তরীণ সুদ পরিশোধ বাবদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক সুদ পরিশোধ বাবদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকাসহ সরকারকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হবে। এই সুদের অর্থ পরিশোধের জন্য অর্থ সংস্থান সরকারের জন্য একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ।

বাজেট বাস্তবায়নে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কম কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশি^ক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ঘোষিত সংস্কার কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়নে বাজেটের সাফল্য নির্ধারণ করবে।

১২ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান : বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক জোন কার্যকর করা; রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও নতুন বাজার অনুসন্ধান; আইটি এবং ইলেকট্রনিক্স খাতে মানবসম্পদ উন্নয়ন; প্রশাসনিক জটিলতা ও কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস হ্রাসকরণ; ক্যাপিটাল মার্কেট শক্তিশালী ও বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণ; এডিপি বাস্তবায়নে গুণগত মান ও জবাদিহি নিশ্চিতকরণ; সুদের হার হ্রাস, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ; অপ্রয়োজনীয় ও অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ; নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ; লজিস্টিক ও সাপ্লাই চেইন নিশ্চিতকরণ; মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলসংক্রান্ত আইনি কাঠামো গঠন; এবং সুনীল অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপান্তর করা প্রভৃতি।

বর্তমান বৈশি^ক ও অভ্যন্তরীণ বহুমুখী চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে যথাযথভাবে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে সংগঠনটির পক্ষ থেকে ১২টি বিষয়ে বিশেষ জোর দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড : সামাজিক সুরক্ষা ও নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিশ্চিতের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও প্রান্তিক কৃষকদের সহায়তায় ‘কৃষক কার্ড’ প্রদান কার্যক্রম সামাজিক নিরাপত্তা সুসংহত করতে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বাজেটে ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে সিনিয়র সিটিজেনদের জন্য ট্রেনে ভ্রমণ সম্পূর্ণ ফ্রি এবং মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়েছে। জুলাই যোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় উপকারভোগীদের সংখ্যা ও সুবিধার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। তবে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে যাতে এ সুবিধা যথাযথভাবে পৌঁছায় সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

কাস্টমস আইন : বৈশি^ক বাণিজ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং স্বল্পোন্নত দেশ হতে উত্তরণের পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা অটুট রাখার লক্ষ্যে বাজেটে বেশকিছু দিক-নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে। এরমধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি, অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যচুক্তি, ইকোনমিক পার্টনারশিপ চুক্তির ন্যায় অংশীদারত্ব এবং সহযোগিতাচুক্তি সম্পাদনের কার্যক্রমের কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন দেশের ন্যায় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল স্থাপনের সুবিধার্থে কাস্টমস আইনে প্রয়োজনীয় বিধান অন্তর্ভুক্তিকরণের প্রস্তাব করা হয়েছে যা অত্যন্ত ইতিবাচক।

টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা : পরিবেশবান্ধব ও টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের পাশাপাশি ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেসঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বৃদ্ধির উদ্যোগকে আমরা সাধুবাদ জানাই। এ ছাড়াও ক্রিয়েটিভ অর্থনীতিভিত্তিক পণ্য চিহ্নিতকরণ ও ডিজাইন উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এবং দেশজুড়ে আঞ্চলিক সৃজনশীল হাব গড়ে তুলতে ১০ বছরের বিনিয়োগ ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে যা অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক।

ঋণপ্রবাহ সহজীকরণ : বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সহজীকরণে ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘স্টিমুলাস প্যাকেজ ২০২৬’ ঘোষণা করায় সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এ প্যাকেজ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। এ ছাড়াও পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় এসএমই খাতের বিকাশে ২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে যা এ খাতের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি এবং নারী উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

করভিত্তি সম্প্রসারণ : প্রস্তাবিত বাজেটে করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর অব্যাহতি ধীরে ধীরে হ্রাস করা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সম্পূর্ণ অটোমেশন মাধ্যমে কর প্রদান পদ্ধতি সহজীকরণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে যা এফবিসিসিআই-এর প্রস্তাবেরই ইতিবাচক প্রতিফলন। এ জন্য সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে এফবিসিসিআই।

বেসরকারি ও বিদেশি বিনিয়োগ : বৃদ্ধি ও ব্যবসা সহজীকরণের জন্য মুসক রিটার্ন অনলাইনে বাধ্যতামূলককরণ, ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মূসক রিটার্ন দাখিল, অনলাইনে আয়কর রিটার্ন দাখিল, অনলাইনে আয়কর ফেরত প্রদানের ব্যবস্থা, অনলাইনভিত্তিক সিঙ্গেল উইন্ডো বাধ্যতামূলক করা, বিভিন্ন অঞ্চলে প্লাগ অ্যান্ড প্লে শিল্প সুবিধা প্রদান, অনলাইনে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ট্যাক্স রেসিডেন্সি সার্টিফিকেট প্রদান ইত্যাদি ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়াও অটোমেটেড পদ্ধতিতে অডিট নির্বাচনের জন্য ঝুঁকি ভিত্তিক নির্ধারণ কৌশল, অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড এবং ই-রিটার্ন সিস্টেমের মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন এবং কর দায় কমানোর জন্য পারকুইজিট, স্যাম্পল ও প্রচার বাবদ খরচ অনুমোদনের সীমা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপে এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাবনা ইতিবাচকভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

করমুক্ত আয়ের সীমা : মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করা হয়েছে এবং পরবর্তী বছরগুলোয় ক্রমান্বয়ে করমুক্ত আয়ের সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান মূল্যস্ফীতিকে মাথায় রেখে ৫ শতাংশ সø্যাব বহাল থাকলে প্রান্তিক করদাতাদের করভার লাঘব হতো। সর্বোচ্চ করহার ৩৫ শতাংশের স্থলে ২৫ শতাং করার প্রস্তাব করেছে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনটি।

করপোরেট করের হার ৫ বছর মেয়াদি করার জন্য ধন্যবাদ। তবে অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে কমালে ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

উৎসে কর ও শুল্ক : দেশ অবশেষে একটি সুন্দর কাঠামোগত সংস্কারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির শ্লথ গতির কারণে বিক্রয়ের ওপর বিদ্যমান ন্যূনতম কর ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হলে ব্যবসায়ীদের করভার কমত।

বিবৃতিতে আয়কর রিটার্ন প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কোম্পানির আয়কর রিটার্ন সাধারণ পদ্ধতিতে প্রদানের ব্যবস্থা স্বস্তিদায়ক তবে ধারা ৭৩এ দিয়ে সত্যায়ন করার বিধান অপ্রাসঙ্গিক, যেহেতু কোম্পানির আয়কর রিটার্ন অনলাইনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এটি করা হলে কোম্পানির ব্যবসায়িক খরচ বৃদ্ধি পাবে।

জীবন-যাত্রার ব্যয় ও উৎপাদন খরচ কমাতে বাজেটে বেশকিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। যা এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাব বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্থানীয় শিল্পের প্রসার ও বিনিয়োগ আকর্ষণে আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও রেগুলেটরি শুল্কের পুনর্বিন্যাস ও যৌক্তিকীকরণের পাশাপাশি বাজেটে বেশকিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে যা শিল্পায়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে কম্পিউটার ও কম্পিউটারের যন্ত্রাংশ, সেমিকন্ডাক্টর বা চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং খাতের উপকরণ, জাহাজ ও ড্রেজার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল, শিশু খাদ্যশিল্পের কাঁচামাল, ওষুধ শিল্পের কতিপয় মৌলিক কাঁচামাল, পোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের উপকরণ, সার উৎপাদনের মূল কাঁচামাল জিংক অ্যাশ আমদানি, ইটিপি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক প্রভৃতি খাতে শুল্ক রেয়াতিসংক্রান্ত সুবিধার মেয়াদ বর্ধিত করা হয়েছে যা এসব খাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

সব ধরনের ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল (ইভি) এর রেজিস্ট্রেশনের জন্য অগ্রিম আয়কর ২ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ক্যাপাসিটি ভিত্তিতে বিভিন্ন হারে (২৫ হাজার, ৫০ হাজার, ৭৫ হাজার ও ১ লাখ টাকা) নির্ধারণ করা হয়েছে। ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক এবং ইলেকট্রিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে আরোপিত ৫ শতাংশ উৎসে কর হার সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এ ছাড়াও ইলেকট্রিক গাড়ি ও ই-বাইক-এর যন্ত্রাংশ উৎপাদনের ক্ষেত্রে রেয়াতি শুল্ক-কর সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপ পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিতকল্পে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করি।

ল্যাপটপ, ডেস্কটপ কম্পিউটার, সার্ভার, কম্পিউটার প্রিন্টার ও কম্পিউটার মনিটর আমদানির ক্ষেত্রে সমুদয় আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট প্রত্যাহার করার পাশাপাশি এসএসডি আমদানির ক্ষেত্রে ৫% আমদানি শুল্ক ব্যতীত সব শুল্ক প্রত্যাহার করার হয়েছে। দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ও বিকাশ এবং দক্ষ আইটি জনশক্তি সৃষ্টিতে এটি সরকারের একটি অনন্য প্রয়াস।

ক্ষুদ্র ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে ফ্লাট রেটে সীমিত পরিমাণে সুনির্দিষ্ট টার্নওভার কর প্রদান করা হয়েছে। এতে কর পরিশোধ সহজতর হবে বলে আমরা মনে করি। ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক স্থিতির ওপর আবগারী শুল্ক অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে যা ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য সহায়ক হবে। তাছাড়া স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পর্যায়ে ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতির পাশাপাশি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের সেবা আমদানি ও স্থান ও স্থাপনা ভাড়া গ্রহণের ক্ষেত্রে ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছি। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের প্রদত্ত সেবার ওপর আরোপিত ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি এ খাতকে বিকশিত হতে সহায়তা করবে। এ ছাড়া স্টার্টআপদের জন্য আয়কর ও মূসকের সমন্বিত বিধান প্রণয়ন এ সেক্টরকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে বলে মনে করছে এফবিসিসিআই।

সুদসংক্রান্ত মামলা : পাশাপাশি ১৯৯১ সালের আওতাধীন এবং ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সুদসংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে আগামী ৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশ সুদ দিয়ে মামলা নিষ্পন্ন করার উদ্যোগকে সংগঠনটি স্বাগত জানিয়েছে।

সংগঠনটি দাবি করেছে, এফবিসিসিআইয়ের প্রস্তাবনার আলোকে আয়কর, শুল্ক ও ভ্যাট আপিল দায়ের প্রক্রিয়া সহজীকরণের লক্ষ্যে আপিল, আপিল ট্রাইব্যুনাল ও হাইকোর্টে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে কর পরিশোধের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ হ্রাস করা হয়েছে। পাশাপাশি কর কর্মকর্তাদের ডিসক্রিশনারি পাওয়ার বিলোপ করার প্রস্তাব করা হয়েছে যা অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়।

স্বর্ণ আমদানি : বন্ডেড ওয়্যার হাউস পদ্ধতির আওতায় স্বর্ণ আমদানি ও তা হতে প্রস্তুতকৃত স্বর্ণালংকার রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালনা পদ্ধতি বিধিমালা ২০২৬ জারি করা হয়েছে। এতে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দেশীয় স্বর্ণ প্রস্তুতকারকরা দক্ষ কারিগর হিসেবে এগিয়ে আসবে। তাছাড়া স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে হ্রাস করে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে যা অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। পাশাপাশি জুয়েলারি সেবার বিপরীতে মূসকের হার ৫ শতাংশের পরিবর্তে সুনির্দিষ্ট কর হিসেবে ভরিপ্রতি ২৫ হাজার নির্ধারণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে যা প্রশংসার দাবি রাখে।

ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মেরূকরণের বাস্তবতার মাঝেও একটি যৌক্তিক, বাস্তবায়নযোগ্য ও শিল্প-বিনিয়োগবান্ধব বাজেট প্রণয়নে সরকার জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে। সরকারের সঙ্গে আমরাও আত্মবিশ্বাসী যে, সব ক্ষেত্রে উন্নয়ন, নিরাপদ ও শোভন কর্মসংস্থান, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র নিশ্চিতকরণে প্রস্তাবিত বাজেট একটি নীতি পরিকল্পনা হিসেবে ভূমিকা রাখবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত