বিশ্বকাপে গোল করে তিউনিসিয়ার কাছে ক্ষমা চাইলেন ইয়াসিন

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ১১:০৪ এএম

মেক্সিকোর মনটেরি স্টেডিয়ামে সুইডেন-তিউনিসিয়া ম্যাচের তখন মাত্র ৭ মিনিট। তিউনিসিয়ার ডিফেন্সের একটি দুর্বল ক্লিয়ারেন্স থেকে বল পেয়ে যান ২২ বছর বয়সী সুইডিশ মিডফিল্ডার ইয়াসিন আয়ারি। ২০ গজ দূর থেকে নেওয়া তার এক দুর্দান্ত ভলি সরাসরি আছড়ে পড়ে তিউনিসিয়ার জালে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের প্রথম ম্যাচেই এমন এক নান্দনিক গোল! যেকোনো তরুণ ফুটবলারের জন্য এটি এক স্বপ্নের মুহূর্ত। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন উল্লাস, সতীর্থরা তাকে জড়িয়ে ধরতে ছুটে আসছেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে মাঠের মাঝে স্থবির দাঁড়িয়ে রইলেন ব্রাইটনের এই তরুণ তারকা। কোনো উল্লাস নেই, নেই কোনো আস্ফালন। উল্টো দুই হাত তুলে তিউনিসিয়ার দর্শকদের কাছে এক নীরব ক্ষমা চাইলেন তিনি।

কারণ, গোলটি তিনি করেছেন সুইডেনের হয়ে, কিন্তু যার জালে বল জড়িয়েছেন—সেটি তার বাবার জন্মভূমি, তার নিজের শিকড়।

বিশ্বকাপে প্রথম গোল ইয়াসিনের

ইয়াসিন আয়ারির জন্ম সুইডেনের সোলনা শহরে হলেও, তার ধমনীতে বইছে তিউনিসিয়ান ও মরক্কান রক্ত। তার বাবা আজ্জুজ আয়ারি একজন তিউনিসিয়ান। ২০২১ সালের দিকে তিউনিসিয়া ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন যখন ইয়াসিনকে তাদের জাতীয় দলে খেলার প্রস্তাব দেয়, তরুণ ইয়াসিন তখন তিউনিসিয়ার হয়ে মাঠ কাঁপাতে প্রস্তুতই ছিলেন।

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে এক পরম শিক্ষকের মতো পাশে দাঁড়িয়েছিলেন তার বাবা আজ্জুজ। তিনি ছেলেকে মনে করিয়ে দেন এক চরম সত্য ও কৃতজ্ঞতার পাঠ। বাবা আজ্জুজ বলেছিলেন, "তিউনিসিয়া তোমার শিকড় হতে পারে, কিন্তু সুইডেন আমাদের পরিবারকে আপন করে নিয়েছে। এই দেশ আমাদের আশ্রয় দিয়েছে, সুযোগ দিয়েছে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ গড়তে সাহায্য করেছে। এই দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা এবং কিছু ফিরিয়ে দেওয়া তোমার কর্তব্য।"

বাবার সেই দূরদর্শী ও নীতিবান সিদ্ধান্ত ইয়াসিনের মনে গভীর রেখাপাত করে। নিজের জন্মভূমি ও বাবার দেওয়া শিক্ষার প্রতি সম্মান জানিয়ে ইয়াসিন শেষ পর্যন্ত সুইডেনের জার্সি গায়ে জড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ম্যাচের শুরুতে প্রথম গোলটি করে তিউনিসিয়ার প্রতি নিজের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার জায়গা থেকে ইয়াসিন উদযাপন থেকে বিরত থাকলেও, পেশাদারিত্বে কোনো কমতি রাখেননি। ম্যাচের একদম শেষ মুহূর্তে (৯১ মিনিটে) তিনি আরও একটি চমৎকার গোল করে সুইডেনের ৫-১ ব্যবধানের বিশাল জয় নিশ্চিত করেন। এবার অবশ্য দলের জয় নিশ্চিত হওয়ায় সতীর্থদের সাথে কিছুটা আনন্দ ভাগ করে নেন তিনি।

ম্যাচ শুরুর আগে তিউনিসিয়ার কোচ সাব্রি লামুশিও ইয়াসিনের এই সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, "সে তার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তার প্রতি আমার পূর্ণ সম্মান আছে। সে একজন অসাধারণ খেলোয়াড়।"

মাঠের লড়াইয়ে সুইডেন জিতলেও, দিনশেষে মনটেরি স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে জয় হলো এক বাবার দেওয়া শিক্ষার, এক তরুণের সততার এবং নিজের শিকড় ও কর্মভূমির প্রতি নিখাদ আনুগত্যের। ইয়াসিন আয়ারি প্রমাণ করলেন—ফুটবল শুধু গোল আর জয়ের খেলা নয়, এটি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও মানবীয় মূল্যবোধের এক অনন্য মঞ্চ।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত