কিলিং মিশনে দুর্ধর্ষ ৭ সন্ত্রাসী পাঁচজনের পরিচয় মিলেছে

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০৩:১৩ এএম

চট্টগ্রামের রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের ব্যস্ততম চৌমুহনীবাজারে গতশনিবার দুপুরে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে (৪৫) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার মিশনে অংশ নিয়েছিল সাত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী। এর মধ্যে অস্ত্র হাতে থাকা পাঁচজনকে শনাক্ত করা হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করলেও তাদের ধরতে পারেনি। তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয়ও প্রকাশ করেনি পুলিশ।

চৌমুহনীবাজারে থাকা একটি সিসি ক্যামেরায় হত্যাকা-ে অংশ নেওয়া সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের তৎপরতার দৃশ্য ধরা পড়েছে। ঘটনার পর ভিডিও ফুটেজটি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিও ফুটেজ দেখে স্থানীয় সূত্রে অস্ত্রধারী পাঁচজনের মধ্যে চারজনের নাম ও পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তারা হলেন দিদারুল আলম, মো. ইলিয়াছ ওরফে ধামা ইলিয়াছ, আবছার ও মো. ইউছুফ। এ ছাড়া হত্যাকারীদের সঙ্গে সন্ত্রাসীদের একটি ব্যাকআপ টিমও ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ।

এদিকে, ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে গতকাল রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় জানাজা শেষে মাসুদুলের লাশ রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বেতাগী ইউনিয়নের গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয়। মাসুদুল খুনের ঘটনায় গতকাল রাত ৮টায় এই প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত রাউজান থানায় কোনো মামলা করা হয়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, কিলিং মিশনে শটগান হাতে থাকা (গোলাপি রঙের শার্ট পরিহিত) সন্ত্রাসীর নাম মোহাম্মদ ইলিয়াছ প্রকাশ ধামা ইলিয়াছ, পিস্তল হাতে থাকা (মাথায় ক্যাপ ও জলপাই রঙের টি-শার্ট পরিহিত) ছিলেন মো. ইউছুপ ও দিদারুল আলম (কালো জিন্স প্যান্ট ও জলপাই রঙের টি-শার্ট পরিহিত) এবং শটগান হাতে ছিলেন কালো টি-শার্ট পরা আবছার।

পুলিশ ও স্থানীয় সুত্রের ভাষ্য, তিনটি পিস্তল ও দুটি শটগান হাতে থাকা পাঁচ অস্ত্রধারী ছাড়াও মাসুদুল হত্যার মিশনে ব্যাকআপ টিমে ছিল মো. পারভেজ ও মো. আইয়ুব নামের স্থানীয় আরও দুই ‘সন্ত্রাসী’। অস্ত্রধারী পাঁচজনসহ মাসুদুল হত্যার মিশনে অংশ নেওয়া সাতজনই বিদেশে পলাতক দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী রায়হান বাহিনীর ক্যাডার।

স্থানীয় সুত্রে পিস্তল হাতে থাকা তিনজন, শটগান হাতে দুজন এবং ব্যাকআপ টিমে থাকা দুজনের গ্রামের বাড়ির ঠিকানা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে শটগান হাতে থাকা ধামা ইলিয়াছ ও আবছারের বাড়ি উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নে। পিস্তল হাতে থাকা মো. ইউছুপের বাড়ি রাউজান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডে। পিস্তল হাতে থাকা দিদারুল আলমের বাড়ি নগরের পাঁচলাইশ থানা এলাকায়। ব্যাকআপ টিমে থাকা মো. পারভেজের বাড়ি রাউজান উপজেলার গশ্চি ইউনিয়নের নোয়াহাট এলাকায় এবং মো. আইয়ুবের বাড়ি রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডে। 

পুলিশ ও স্থানীয় সুত্রের ভাষ্য, ধামা ইলিয়াছ দুর্ধর্ষ প্রকৃতির সন্ত্রাসী। তার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগর ও রাউজান থানায় একাধিক হত্যা মামলা আছে। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ঈশান ভট্টের হাটে স্ত্রী-কন্যার সামনে সেলিম নামের এক যুবদলকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। খুনের ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার আসামি এই ধামা ইলিয়াছ। আর তাদের দলনেতা ‘সন্ত্রাসী’ রায়হান দক্ষিণ-পূর্ব রাউজানের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের মৃত বদিউল আলমের  ছেলে।

গত শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে মাসুদুল হক চৌধুরীকে একদল অস্ত্রধারী প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। তিনি রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। রাঙ্গুনিয়ার সংসদ সদস্য বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হুম্মাম কাদের চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন স্থানীয় রাজনীতিতে। তার বাড়ি রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়নে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, গুলিবর্ষণের মুখে মাসুদুল দৌড়ে পাহাড়তলী চৌমুহনী বাজারের একটি ওষুধের দোকানের সামনে এসে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এ সময় তিন অস্ত্রধারী পেছন থেকে এসে লুটিয়ে পড়া মাসুদুলকে আবারও গুলি করেন। ২০ সেকেন্ড পর মুখোশ পরা অস্ত্রধারী এসে আবার মাসুদুলকে গুলি করে দ্রুত চলে যান। মৃত্যু নিশ্চিত করে কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে অস্ত্রধারীরা একটি সিএনজি অটোরিকশায় উঠে চলে যান।

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (রাঙ্গুনিয়া সার্কেল) মোহাম্মদ  বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘মাসুদুল খুনে অস্ত্র হাতে পাঁচজনকে দেখা গেছে। তবে কিলিং মিশনে আরও বেশি থাকতে পারে। পাঁচজনের পরিচয় নিশ্চিত হয়েছি। তদন্তের স্বার্থে তাদের পরিচয় প্রকাশ সম্ভব নয়। তবে তারা প্রত্যেকে রায়হান বাহিনীর দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। রায়হানকে অবশ্য ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি।’

মাসুদুল টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন বলে মন্তব্য করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বেলায়েত  হোসেন বলেন, ‘নিহত ব্যক্তি বালু উত্তোলনের ব্যবসা করতেন। পাশাপাশি রাজনীতিও করতেন। প্রাথমিক তদন্তে বালু ব্যবসার বিরোধ থেকে হত্যাকান্ড ঘটতে পারে। রাজনৈতিক  কোনো বিরোধের তথ্য মিলেনি। ঘটনার তদন্ত চলছে।’

নিহতের পরিবারের সদস্যরা জানান, মাসুদুল রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার বড় ভাই মুহাম্মদ পিয়ারুল হক চৌধুরী স্বপন ওই ইউনিয়নের সাবেক  চেয়ারম্যান। পরিবারের অভিযোগ, এলাকায় জনপ্রিয় হওয়ায় মাসুদুলকে নির্বাচনের মাঠ থেকে সরিয়ে দিতে খুন করা হয়েছে। মাসুদুল রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক পদে ছিলেন। মাসুদুল খুনের ঘটনায় তার এক প্রতিবেশী জড়িত থাকতে পারে বলে স্থানীয় সূত্রের ধারণা।

পুলিশ জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২৫টি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকা- সংঘটিত হয়েছে রাজনৈতিক বিরোধ থেকে। একই সময়ে শতাধিক গোলাগুলি ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে গুলিবিদ্ধসহ আহত হয়েছেন সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত