প্রত্যাশার চাপে ব্রাজিল

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:০৮ এএম

ব্রাজিল ১৭-১ হাইতি! স্কোরলাইনটা শুনতে কাল্পনিক বা অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে। বিশ^কাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়টি যেখানে ১০-১ ব্যবধানের (১৯৮২ সালে এল সালভাদরের বিপক্ষে হাঙ্গেরির জয়), সেখানে মরক্কোর বিপক্ষে ধাক্কা খাওয়া কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলের কাছ থেকে হাইতির বিপক্ষে এমন কিছু আশা করাটা বাড়াবাড়ি। কিন্তু ফুটবল রোমান্টিকরা তো সংখ্যার হিসাব ভালোবাসেন। ব্রাজিল ১৭-১ না হোক, অন্তত সাত-আট গোলের একটা ধুমধাড়াক্কা জয় তো পেতেই পারে!

ক্যারিবিয়ান দ্বীপদেশ হাইতির বিপক্ষে সেই অভ্যাসটা তাদের আছে। রেকর্ড বলছে, ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকায় এই হাইতিকেই ৭-১ গোলে উড়িয়ে দিয়েছিল ব্রাজিল। এর আগে ২০০৪ সালের এক প্রীতি ম্যাচে তাদের জালে গোল উৎসব হয়েছিল ৬-০ ব্যবধানে। আরেক ম্যাচে ৪-০। (তাই সব মিলিয়ে ব্রাজিল ১৭-১ হাইতি) তিন ম্যাচের দুটিতেই ‘হ্যাটট্রিক’ শব্দটা জড়িয়ে আছে। ২০০৪ সালে হ্যাটট্রিক করেছিলেন রোনালদিনহো, আর ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা ম্যাচ সেই কীর্তি পুনরাবৃত্তি করেন ফিলিপে কুতিনহো।

কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের বর্তমান প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। নিউ জার্সিতে মরক্কোর বিপক্ষে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করে আসর শুরু করেছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। প্রথমার্ধে রীতিমতো কোণঠাসা হয়ে থাকা ব্রাজিল ইসমায়েল সাইবারির গোলে পিছিয়ে পড়েছিল। পরে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গোলে কোনোমতে হার এড়ায় তারা। ম্যাচটিতে যেখানে মরক্কো ব্রাজিলের পোস্টে ১৪টি শট নেয়, সেখানে ব্রাজিল নিতে পেরেছে মাত্র ১২টি। গত ২৩টি বিশ্বকাপ ম্যাচের ইতিহাসে এই প্রথম প্রতিপক্ষের চেয়ে কম শট নেওয়ার এক বিব্রতকর রেকর্ডের মুখোমুখি হয়েছে সেলেসাওরা।

বিশ্বমঞ্চের এই মহোৎসবে আর্জেন্টিনার হয়ে লিওনেল মেসি ইতিমধ্যেই হ্যাটট্রিক তুলে নিয়ে নিজের জাত চিনিয়েছেন। মেসির এই হ্যাটট্রিক স্বাভাবিকভাবেই তপ্ত উনুনে ঘি ঢেলেছে। সেলেসাও ভক্তদের মনে এখন একটাই তীব্র আকাক্সক্ষা আর্জেন্টিনা পারলে ব্রাজিল কেন নয়? কিন্তু ব্রাজিলের এই দলে কুতিনহো বা রোনালদিনহোর মতো হ্যাটট্রিক করার সেই ‘আসল লোকটা’ কোথায়? কার্লো আনচেলত্তির আক্রমণভাগে সেই খুনে মেজাজটাই যে উধাও।

মরক্কোর বিপক্ষে যেখানে একটি গোল পেতেই ব্রাজিলকে ঘাম ঝরাতে হয়েছে, সেখানে মেসি ও আর্জেন্টিনার এই দাপট আনচেলত্তির শিষ্যদের ওপর বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করবে নিশ্চিত। এখন দেখার বিষয়, শনিবার সকালে ফিলাডেলফিয়ার মাঠে সমর্থক আর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের এই ‘হ্যাটট্রিক’ চ্যালেঞ্জের জবাব ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডরা কীভাবে দেন!

মরক্কো ম্যাচের পর ইতালিয়ান ট্যাকটিশিয়ান কার্লো আনচেলত্তির শুরুর একাদশ নিয়ে ব্রাজিলের ভেতরে-বাইরে সমালোচনার ঝড় বইছে। বিশেষ করে প্রথমার্ধে রাইট-ব্যাক ইবানেজ এবং স্ট্রাইকার ইগো চিয়াগোকে খেলানোর সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয়েছে। মাঝমাঠে কাসেমিরো ও লুকাস পাকেতাও ছিলেন পুরোপুরি ছায়া হয়ে। অবশ্য দ্বিতীয়ার্ধে হলুদ কার্ড দেখা কাসেমিরো ও ইবানেজকে তুলে নিয়ে ফাবিনিয়ো এবং দানিলোকে মাঠে নামালে ব্রাজিলের খেলায় কিছুটা গতি ফেরে। দানিলোর কৌশলী রক্ষণ এবং মাথেউস কুইয়া ও লুইজ হেনরিকের উপস্থিতিতে ব্রাজিল আক্রমণ সামাল দিতে পারলেও জয়সূচক গোলের দেখা পায়নি।

হাইতির বিপক্ষে পরের ম্যাচে কি একাদশে বড় পরিবর্তন আসবে? একাদশের রদবদল নিয়ে ব্রাজিলের অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার দানিলো কিছুটা কৌশলী ও রসাত্মক উত্তর দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘কোচেরা কিছুটা পাগলাটে হন। মাঝেমধ্যে তারা এমন দল সাজান এবং এমন কিছু সিদ্ধান্ত নেন, যার যৌক্তিক কোনো ব্যাখ্যা কেউ খুঁজে পায় না। প্রতিপক্ষ অনুযায়ী কৌশল সবসময় পরিবর্তন করা হয়। আগামী ম্যাচের জন্য আমাদের প্রায় ৮০ শতাংশ দল চূড়ান্ত হয়ে গেছে, বাকি তিন-চারজন এখনো অনিশ্চয়তায় আছে।’

ব্রাজিল ভক্তদের জন্য সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা তাদের পোস্টার বয় নেইমার জুনিয়রকে নিয়ে। ডান পায়ের কাফ ইনজুরির কারণে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকা ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড বুধবার নিউ জার্সিতে দলের সঙ্গে অনুশীলনে যোগ দিয়েছেন। প্রথম ১৫ মিনিট গণমাধ্যমের সামনে তিনি বুট পরে হালকা বল পাসিং ও ফিজিক্যাল ড্রিল করলেও, হাইতির বিপক্ষে ফিলাডেলফিয়ার ম্যাচে তার খেলা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা রয়েছে। তবে ব্রাজিল চাইছে অল্প সময়ের জন্য হলেও তাকে মাঠে নামাতে।

সর্বশেষ ৩টি মুখোমুখি লড়াইয়ের প্রতিটিতেই জিতেছে ব্রাজিল। বিশ্বকাপের মঞ্চে কনকাকাফ অঞ্চলের দলগুলোর বিপক্ষে ব্রাজিলের রেকর্ড দুর্দান্ত ৯ ম্যাচের ৮টিতেই জয়। তবে হাইতিকে একদম হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। ১৯৭৪ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে আসা ক্যারিবীয় দলটি তাদের প্রথম ম্যাচে স্কটল্যান্ডের কাছে ১-০ গোলে হারলেও দুর্দান্ত লড়াই করেছে এবং স্কটিশদের বক্সে ২২ বার বল স্পর্শ করেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত