শত ফলের সমাহার

আপডেট : ১৯ জুন ২০২৬, ০৬:১৪ এএম

রাজধানীর খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) চত্বরে ঢুকতেই চোখে পড়বে দেশি-বিদেশি নানা ফলের সমাহার। কোথাও সাজানো রয়েছে আম, কাঁঠাল, লিচু ও জাম। আবার কোথাও দেখা মিলছে এমন সব ফলের যেগুলোর নামই অনেকের কাছে অজানা। স্টলে স্টলে এমন চেনা-অচেনা শতাধিক ফল প্রদর্শনী নিয়ে শুরু হয়েছে জাতীয় ফল মেলা। এই মেলায় শুধু ফলই নয়, রয়েছে ফল দিয়ে তৈরি নানা পদের খাবারও।

গতকাল বৃহস্পতিবার এই মেলার উদ্বোধন করেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ। মেলা চলবে আগামীকাল শনিবার পর্যন্ত। অনুষ্ঠানে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মে. আব্দুর রহিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এবারের মেলার প্রতিপাদ্য হলো ‘করবো মোরা ফল চাষ, সংরক্ষণ করবো বারো মাস’।

মেলা প্রাঙ্গণে সরেজমিনে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের স্টলের সামনে সবচেয়ে বেশি ভিড় লক্ষ করা গেছে। কারণ এখানেই একসঙ্গে দেখা মিলছে অর্ধশতাধিক বিলুপ্তপ্রায় ও অপ্রচলিত ফলের। কাউফল, করমচা, ডেউয়া, আঁশফল, গাব, যজ্ঞডুমুর, চাম্বুল, আতা, চালতা, অরবরই, বিলিম্বি, শরিফা, সাতকরা, তৈকর, ডেফল, লুকলুকি, বৈচি ও মুনিয়ার মতো ফল যেন দর্শনার্থীদের ফিরিয়ে নিচ্ছিল শৈশবের স্মৃতিতে। স্টলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সাভারের রাজালাখ হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. জামিউল ইসলাম বলেন, ‘প্রচলিত ও অপ্রচলিত দুই ধরনের ফলই প্রদর্শনীতে রাখা হয়েছে। অধিকাংশ ফল দেশের বিভিন্ন হর্টিকালচার সেন্টারে উৎপাদিত। দর্শনার্থীদের কাছ থেকে এসব ফল নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।’

কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১৩০ ধরনের অপ্রচলিত ফল রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ ধরনের ফল বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবে জন্মে এবং সীমিত পরিসরে চাষ হয়। এসব ফল সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণে ২০২০ সালে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তিন বছর মেয়াদি একটি কর্মসূচি গ্রহণ করে। প্রায় আড়াই কোটি টাকার এই কর্মসূচির ফলে বিলুপ্তপ্রায় অনেক ফল আবারও চাষের আওতায় এসেছে।

মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, দেশে ফল উৎপাদনে বিপ্লব ঘটেছে। একসময় যেসব ফল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হতো, এখন সেগুলোর অধিকাংশ দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে।

জাতীয় ফল মেলার সবচেয়ে আলোচিত আকর্ষণগুলোর একটি কাঁঠালভিত্তিক খাদ্যপণ্য। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের স্টলে দেখা যায়, কাঁঠালের কোয়া দিয়ে তৈরি পেস্ট্রি কেক, কাবাব, পাকোড়া, নকশি পিঠা, চিপস, রুটি, সাসলিক, হালুয়া থেকে শুরু করে বিচির বরফি পর্যন্ত নানা পণ্য।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের প্রতিনিধি আল আমিন সরকার বলেন, কাঁঠালের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা হয়েছে। এর ফলে কাঁঠালভিত্তিক পণ্য উৎপাদনকারী উদ্যোক্তার সংখ্যা বেড়েছে এবং বাজারেও এসব পণ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে।

গাজীপুরের উদ্যোক্তা চুমকী জানান, তাদের এলাকায় প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। তিনি কাঁঠাল দিয়ে ২২ রকমের পণ্য তৈরি করছেন। বর্তমানে কাঁঠালের কাশ্মীরি আচার, চিপস ও কাবাব অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে এবং ক্রেতাদের কাছ থেকে ভালো সাড়া মিলছে।

পুরো মেলার কেন্দ্রবিন্দু আম। ল্যাংড়া, আম্রপালি, নাগ ফজলি, বারি-৪, হাঁড়িভাঙা ও সূর্যপুরির মতো জনপ্রিয় দেশি জাতের পাশাপাশি প্রদর্শিত হচ্ছিল থাই কাটিমন, হানিভিউ, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, মিয়াজাকি, আপেল ম্যাঙ্গো এবং কিং অব চাকাপাতের মতো বিদেশি ও উন্নত জাতের আম। দেওয়ান অ্যাগ্রো ফার্মের স্টলে ছিল ৯ ধরনের আম।

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) স্টলেও রয়েছে নানা জাতের আম, আনারস, ড্রাগন ফল ও সফেদা। সেখানে গরান ফল, লতা ফল ও পশুর ফলের মতো কম পরিচিত ফলও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।

ফলের পাশাপাশি মেলায় বিভিন্ন স্টলে নানা রকম জুস বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি মাশরুমের কেক, চিপস, মিষ্টি, নাড়ু ও পিঠার মতো পণ্যও দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করছে। ‘টেস্টি মাশরুম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মেহেদি জানান, তুলনামূলক কম দামের কারণে মাশরুমভিত্তিক পণ্যে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, সবার কাছে দেশি ফলের পরিচিতি বাড়ানো এ মেলার উদ্দেশ্য। আম, কাঁঠাল, পেয়ারাসহ প্রচুর ফল আমরা বিদেশে পাঠাচ্ছি। রপ্তানি বাড়লে কৃষকরা উপকৃত হবেন। এবার মেলায় ৭৮টি স্টল স্থান পেয়েছে। জাতীয় ফল মেলা শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; বরং এটি ফল চাষ, পুষ্টি, অর্থনীতি ও কৃষিনির্ভর সমাজের মধ্যে মেলবন্ধন তৈরি করছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত